বিভ্রান্তিতে হাবুডুবু ইসির

0
65
Print Friendly, PDF & Email

বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য অস্বীকার সিইসির
* সেনা মোতায়েনের ঘোষণায় এক কমিশনারের আপত্তি
* তফসিল সম্পর্কে দুই মত
* দল নিবন্ধনেও মতানৈক্য

সমন্বয়হীনতা ও মতানৈক্যের সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ, নির্বাচনে সেনা মোতায়েন, তফসিল ঘোষণা, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন- এ ধরনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনারদের কাছ থেকে বিভ্রান্তিকর তথ্য মিলছে। এসব বিষয়ে কমিশনাররা একেকজন একেক কথা বলছেন।

গত মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) জাবেদ আলী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, নির্বাচন নিয়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তি পর্যায়ে যোগাযোগ হচ্ছে এবং তাতে ইতিবাচক সাড়া মিলছে। কিন্তু গতকাল বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কোনো যোগাযোগ নেই। এ ছাড়া আইনগতভাবে সক্রিয় যোগাযোগ করা আমাদের উচিতও নয়।

নির্বাচনে সেনা নিয়োগ নিয়েও গতকাল নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বৈঠকে এ ধরনের সমন্বয়হীনতা ও মতানৈক্যের ঘটনা প্রকাশ পায়। এ ছাড়া বহুল আলোচিত নতুন রাজনৈতিক দল বিএনএফের পর ‘বাংলাদেশ গণঅধিকার দল’-এর নিবন্ধন দেওয়া নিয়েও সব নির্বাচন কমিশনার একমত হতে পারেননি। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনাররা আগে ধারণা দিয়েছিলেন, নভেম্বরের শেষ সপ্তাহেই দশম জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হবে। কিন্তু এখন এ বিষয়টি নিয়েও দ্বিমত দেখা দিয়েছে। কয়েকজন কমিশনার আইনগত জটিলতার আশঙ্কা দেখিয়ে ডিসেম্বরের ১ অথবা ২ তারিখে তফসিল ঘোষণা এবং ১৬ অথবা ১৮ জানুয়ারি ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণের পক্ষে।

প্রসঙ্গত, গত ৪ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ সাংবাদিকদের জানান, আসন্ন দশম সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ পরিস্থিতিতে এলিট ফোর্স হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে সেনাবাহিনী চাইবে নির্বাচন কমিশন। এরপর গত ৬ নভেম্বর সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ জানান, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের প্রতিটি জাতীয় নির্বাচন সেনাবাহিনীর সহায়তায় অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তাই এবারের জাতীয় নির্বাচনও সেনাবাহিনীর সহায়তায় অনুষ্ঠিত হবে।

কিন্তু গতকাল ইসির বৈঠকে একজন নির্বাচন কমিশনার সেনা নিয়োগ বিষয়ে এ ধরনের আগাম ঘোষণা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি অন্য কমিশনারদের এই তথ্য স্মরণ করিয়ে দেন, ইসির বৈঠকে এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এ ছাড়া ওই কমিশনার তাঁর সহকর্মীদের এই যুক্তি উত্থাপন করে সতর্ক করার চেষ্টা করেন যে, নির্বাচনে সেনা মোতায়েন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক পক্ষের দাবি। অন্য পক্ষটি এ দাবির বিপক্ষে। এ অবস্থায় কমিশনের এখনই পক্ষপাতমূলক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। একজন নির্বাচন কমিশনারসহ বৈঠকে উপস্থিত ইসি সচিবালয়ের একাধিক কর্মকর্তা এই মতানৈক্যের তথ্য কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন।

কমিশন সূত্র জানায়, নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন সম্ভব হলে তা হবে স্বল্প সময়ের জন্য। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর যখন আইনশৃঙ্খলা নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, বিজিবি, আনসার, কোস্টগার্ড- এসব বাহিনীর প্রধান ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠকে হবে, তখন তাদের মতামত নিয়ে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। সূত্র আরো জানায়, নির্বাচন কমিশনারদের বেশির ভাগই নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের পক্ষে। তাঁদের ধারণা, একই দিনে সারা দেশের ৩০০ আসনের প্রায় ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সেনা মোতায়েনের বিকল্প নেই।

এদিকে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনপ্রত্যাশী ‘জিয়ার আদর্শের অনুসারী’ দাবিদার বহুল আলোচিত নতুন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) এবং বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট ছাড়া আরো সাতটি দলের মাঠ পর্যায়ের অফিস ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পর্কে তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। এ সাতটি দল হচ্ছে- বাংলাদেশ নিউ সংসদ লীগ (বিএনএসএল), বাংলাদেশ গণসেবা আন্দোলন (বিজিএ), বাংলাদেশ আঞ্জুমানে আল ইসলাহ, বাংলাদেশ পিপলস্ লীগ, বাংলাদেশ গণঅধিকার দল, বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএলডিসি) ও বাংলাদেশ গণশক্তি দল। কিন্তু বিএনএফ যে সুবিধা নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে পেয়েছে তা বাকি ছয়টি দলের ভাগ্যে জোটেনি। এসব দলের মধ্যে চারটি সম্পর্কে তদন্ত প্রতিবেদন বিএনএফের প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনের তুলনায় অনেক ইতিবাচক হলেও তাদের আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে। দলগুলো তদন্তের সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুনঃতদন্তের আবেদন জানালেও তা অগ্রাহ্য করা হয়েছে।

কমিশন সচিবালয় সূত্র জানায়, আলোচিত চারটি দলের মধ্যে বাংলাদেশ গণঅধিকার দল সম্পর্কে তদন্তে ১৯টি জেলায় এবং ৯৭টি উপজেলায় অফিস এবং কমিটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বিএনএসএল, পিপলস লীগ এবং বিজিএ-এর ১৫টির কাছাকাছি জেলা ও ৮০-এর ওপরে উপজেলা অফিস ও কমিটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। অন্যদিকে নিবন্ধনের শর্ত পূরণের জন্য প্রয়োজন ২১টি জেলা ও ১০০টি উপজেলায় অফিস ও কমিটি। দলগুলো নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত আবেদনে জানায়, তাদের প্রয়োজনীয় সংখ্যার বেশি জেলা ও উপজেলায় অফিস ও কমিটি আছে। কিন্তু সঠিকভাবে তদন্ত না করে নির্বাচন কর্মকর্তারা মনগড়া প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। এ অবস্থায় তারা পুনঃতদন্তের আবেদন জানায়। এই আবেদন বিবেচনার ক্ষেত্রেও নির্বাচন কমিশনাররা একমত হতে পারেননি। গত ২৪ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ বাংলাদেশ গণঅধিকার দলসংক্রান্ত ফাইলে এই মতামত জানান যে দলটির আবেদন বিবেচনা করা যেতে পারে। কিন্তু অন্য কমিশনাররা ওই আবেদন নাকচ করে দেন।

এর বিপরীত ঘটনা ঘটে বিএনএফের ক্ষেত্রে। প্রথম তদন্তে বিএনএফের মাত্র ১৫টি জেলা এবং ৩২টি উপজেলায় অফিসের সন্ধান মেলে। দ্বিতীয় তদন্তেও নেতিবাচক তথ্য মেলে। অতঃপর বিএনএফকে অফিস ও কমিটি সাজানোর আরো সুযোগ দিয়ে তৃতীয় দফা তদন্তের ব্যবস্থা করা হয়।

তবে বিএনএফ নিয়েও নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতানৈক্যের ঘটনা ঘটে। নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ প্রথমে বিএনএফ সম্পর্কে পুনঃতদন্তের বিপক্ষে মত দেন। পরে এ কমিশনারের আপত্তির কারণেই নিবন্ধনের প্রক্রিয়া হিসেবে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই বিএনএফকে গমের শীষ প্রতীকের চাহিদা থেকে সরে এসে টেলিভিশন প্রতীক নেওয়ার এবং ‘ধানগাছ’ লোগো পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়।

এদিকে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে এ ধরনের সমন্বয়হীনতা ও মতানৈক্য সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘এ ধরনের ঘটানাগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত। তবে এগুলো যে ঘটবে সে আশঙ্কা আমাদের আগে থেকেই ছিল। নির্বাচন কমিশনারদের সংখ্যা একটি বড় সমস্যা। তবে তাঁদের উচিত হবে, যতদূর সম্ভব নিজেদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। তা না হলে বিভ্রান্তি আরো বাড়বে।’

বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে উদ্যোগ নেবে না ইসি : নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে কমিশনের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে গতকাল সিইসি বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য অস্বীকার করে আরো বলেন, ‘বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে না। কারণ আমরা এই প্রক্রিয়ায় জড়াতে চাই না। তবে কেউ ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে যোগাযোগ করলে করতে পারে। সেটা ভিন্ন কথা।’

গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় নির্বাচনের বিকল্প নেই উল্লেখ করে কাজী রকিবউদ্দীন বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোতে অনেক অভিজ্ঞ লোক রয়েছেন। তাঁরা জনগণের নার্ভ বোঝেন, তাই আমরা সমঝোতার জন্য সরাসরি কোনো উদ্যোগ নিইনি। আমাদের দায়িত্ব রেফারিং করা। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন করবে। নির্বাচনে তাদের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ঠিক রাখা আমাদের কাজ। তাই তাদের সমঝোতার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের জড়ানো উচিত হবে না। তবে আদর্শিক মতানৈক্য থাকলেও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় প্রধান দলগুলো একমত হবে বলে কমিশন আশা প্রকাশ করে।’

এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আচরণবিধির যে খসড়া নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছিল, তা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানান সিইসি।

নভেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করা হবে কি না- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, যথেষ্ট সময় হাতে রেখেই তফসিল ঘোষণা করা হবে। তবে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের সঙ্গে তফসিল ঘোষণার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে এ সমন্বয়হীনতা বা মতপার্থক্য সম্পর্কে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন স্বাধীন। তাদের কাজের জবাব তারাই ভালো দিতে পারবে। এ বিষয়ে আমাদের কোনো প্রশ্ন নেই।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেন, ‘আমরা বরাবরই বলে আসছি, এ নির্বাচন কমিশন অনেক ক্ষেত্রেই বিতর্কিত। তাঁরা অতীতেও এমন সব বক্তব্য রেখেছেন, যা তাঁদের বলা উচিত না। নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু নির্বাচন কমিশনারদের আচরণে মনে হয় তাঁরা নির্বাহী বিভাগের মুখাপেক্ষী। এই নির্বাচন কমিশন যদি একপক্ষীয় নির্বাচনের উদ্যোগ নেয় তাহলে তারা ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।’

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এরশাদের মুখপাত্র কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, যাদের ওপর জাতীয় নির্বাচনের দায়িত্ব তাদের কাছ থেকে এমন মতপার্থক্য আশা করা যায় না। তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে বিভিন্ন দলের মতভেদ আমরা দেখেছি। এখন মনে হয় নির্বাচন কমিশনেও এবার আমাদের বিরোধ দেখতে হবে। সব কমিশনার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আমরা আশা করি।’ তিনি বলেন, এ নির্বাচন কমিশন যে কতটা অযোগ্য, তা তাদের বিভিন্নমুখী বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়।

শেয়ার করুন