মন্ত্রীরাই অবাক মন্ত্রিসভা বৈঠকের চিঠি পেয়ে

0
70
Print Friendly, PDF & Email

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদ শূন্য কি না- এই নিয়ে সাংবিধানিক বিতর্কের মধ্যে আগামী রবিবার মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্য দিয়ে সর্বদলীয় সরকার গঠন, মন্ত্রীদের পদত্যাগ আর বিরোধী দলের আন্দোলনের ইস্যু জিইয়ে রাখল সরকার। সর্বদলীয় সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকলে মন্ত্রীদের পদত্যাগ বিতর্কের অবসান ঘটত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। রবিবারের মন্ত্রিসভার বৈঠকের চিঠি পেয়ে মন্ত্রীরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। অনেক মন্ত্রী টেলিভিশনের স্ক্রল দেখে মন্ত্রীসভার বৈঠকের খবর জেনেছেন। একজন মন্ত্রী গতকাল রাতে জানিয়েছেন, মন্ত্রীদের পদত্যাগের চলমান বিতর্ক নিয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া হবে এই বৈঠকে।
তবে আগামী রবিবারের আগেই সর্বদলীয় সরকারের মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে কি না তাও নিশ্চিত করতে পারেনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মন্ত্রীদের শপথ বাক্য পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত এ বিভাগটি সর্বদলীয় সরকার গঠনের নির্দেশনা না পেলেও যেকোনো সময় নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে আর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নির্ধারিত সময়ের বাইরেও দীর্ঘ সময় অফিসেই অবস্থান করছেন।
গতকাল বুধবার মহাজোট সরকারের মন্ত্রীদের দপ্তরে পরবর্তী মন্ত্রিসভা বৈঠকের এজেন্ডাসহ বিভিন্ন কাগজপত্রের ফোল্ডার পাঠানো হয়। বেশির ভাগ মন্ত্রী দপ্তরে না থাকলেও যাঁরা ছিলেন তাঁরা মন্ত্রিসভার বৈঠকের নোটিশ পেয়ে অবাক হয়ে যান। কারণ গত সোমবারের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীই আর মন্ত্রিসভার বৈঠক না হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। ওই বৈঠকের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীর হাতে পদত্যাগপত্র তুলে দিয়ে এক রকম বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন মন্ত্রীরা। সোমবারের বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিবও জানিয়েছিলেন, সম্ভবত এটাই বর্তমান ফরমেটে মন্ত্রিসভার শেষ বৈঠক। তখন থেকে ধারণা করা হচ্ছিল, মন্ত্রিসভার বর্তমান কাঠামোতে আর বৈঠক হবে না।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সর্বদলীয় সরকার গঠন করে মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকলে বিতর্ক এড়াতে পারতেন প্রধানমন্ত্রী। তা না করে মন্ত্রীদের পদত্যাগ বিতর্ককে জিইয়ে রাখা হলো। এসব ঘটনা প্রশাসনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রশাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী যদি তাঁর পুরনো পরিষদ নিয়ে বৈঠকই করবেন তাহলে এত তাড়াতাড়ি তাঁদের পদত্যাগপত্র নেওয়ার তো কোনো দরকার ছিল না। আর প্রায় সবাইই তো আওয়ামী লীগের মন্ত্রী। দরকার হলে তাঁদের ডেকেই কথা বলতে পারতেন তিনি।’
মন্ত্রিপরিষদসচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগামী রবিবার মন্ত্রিসভা বৈঠক আহ্বান করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্যদের কাছে এজেন্ডা পাঠানো হয়েছে। বর্তমান কাঠামোয় না আগামীর নতুন কাঠামোয় সেই বৈঠক হবে, তা প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করবে।’
আগামী সোমবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক বাংলাদেশ সফর করবেন। এ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকবেন বলে মন্ত্রিসভা বৈঠক এক দিন এগিয়ে আনা হয়েছে। সাধারণত সাপ্তাহিক এই বৈঠক হয় সোমবার। দীর্ঘদিন ধরে এ রেওয়াজ পালন করা হচ্ছে।
জনপ্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে গতকাল বুধবার ঘুরে দেখা গেছে, অনেক মন্ত্রী ছিলেন না। যাঁরা ছিলেন, তাঁরা নিজেদের নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। প্রত্যেক মন্ত্রীর দপ্তর একেকটি নির্বাচনী প্রচার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মন্ত্রীরা এলাকার নেতা-কর্মীদের নিয়ে শলাপরামর্শ করছেন। অনেক মন্ত্রী বিতর্ক এড়াতে সচিবালয়ে যাচ্ছেন না। আবার অনেক আমলাও পারতপক্ষে মন্ত্রীর রুমে যাচ্ছেন না।
বাণিজ্যমন্ত্রী জি এম কাদের পদত্যাগের পর গত দুই দিনে সচিবালয়ে যাচ্ছেন না। এ বিষয়ে খোঁজ করতে গেলে তাঁর দপ্তর থেকে জানানো হয় চোখের সমস্যার কারণে তিনি বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। তবে আগামীকাল (আজ) মন্ত্রীর একটি বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠান রয়েছে প্রেসক্লাবে। সেখানে তিনি আসবেন। সচিবালয়ে না যাওয়ার কারণ জানার জন্য বাণিজ্যমন্ত্রীর মোবাইল ফোনে চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু সারা দিনই তাঁর ফোনটি বন্ধ ছিল। জাতীয় পার্টি শুরু থেকেই বলে আসছে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে তারা যোগ দেবে না। আর জি এম কাদেরও বলেছেন, তাঁকে দলের সিদ্ধান্ত মানতে হবে।
গতকাল সচিবালয়ের ৪ নম্বর ভবনে এক মন্ত্রীর কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, তিনি প্রায় অর্ধশতাধিক ফাইল নিয়ে বসেছেন। তাঁর চারপাশে কর্মকর্তারা অবস্থান করছেন। এসব ফাইলে মন্ত্রী পেছনের তারিখে সই করেছেন। যেসব ফাইলে বর্তমান তারিখে স্বাক্ষর করতে হবে সেগুলোকে একপাশে সরিয়ে রাখছেন। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করে সেসব ফাইলে পরে তিনি স্বাক্ষর করবেন বলে কর্মকর্তারা জানান। আরেক মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখা যায়, মন্ত্রীর চারপাশে তাঁর নির্বাচনী এলাকার লোকজন। এক মন্ত্রীকে একাই দেখা গেল। ওই মন্ত্রীকে এড়িয়ে চলছেন তাঁর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। মন্ত্রী না ডাকলে তাঁরা আর ভেতরে যাবেন না বলে জানিয়েছেন। এসব কর্মকর্তা গত প্রায় পাঁচ বছর নিজেদের ক্ষমতাসীন দল সমর্থক কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রশাসনে দাপট দেখিয়েছেন। পদোন্নতিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিয়েছেন। এখন সরকারের শেষ সময়ে তাঁরা নিরপেক্ষ সাজার চেষ্টা করছেন।
এদিকে মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র এখনো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে রয়েছে। এসব পত্র কার্যকর করার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়নি। আইনমন্ত্রী গত মঙ্গলবার বলেছেন, ‘মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র আদতে পদত্যাগপত্র নয়, কেননা তা রাষ্ট্রপতি বরাবর দেওয়া হয়নি।’ এই অবস্থায় মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র কার্যকর হতে কোনো সমস্যা আছে কি না জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘না, এসব পদত্যাগপত্র কার্যকর হতে কোনো সমস্যা নেই। যদি মন্ত্রীরা পদত্যাগপত্রে তারিখ নাও দেন তাহলেও কোনো সমস্যা নেই। কারণ এসব পদত্যাগপত্রে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাক্ষর করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে নিশ্চয়ই তারিখ থাকবে। প্রধানমন্ত্রীর পর পদত্যাগপত্রগুলো যাবে রাষ্ট্রপতির কাছে। সেখানেও স্বাক্ষর থাকবে। কাজেই তারিখ থাকা বা না থাকা কোনো বিষয় নয়।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল বাকিরের পক্ষে অ্যাডভোকেট মো. ফারুক হোসেন মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে একটি উকিল নোটিশ পাঠান। মন্ত্রীরা পদত্যাগপত্র দেওয়ার পরও কেন তাঁদের পদ শূন্য ঘোষণা করা হচ্ছে না- তা জানতে চাওয়া হয় ওই নোটিশে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নোটিশের জবাব না দিলে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের বলেন, লিগ্যাল নোটিশ পেয়েছি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সাধারণত এ ধরনের উকিল নোটিশের জবাব দেওয়া হয় না। এ ক্ষেত্রেও দেওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। যদি প্রয়োজন হয় তখন দেখা যাবে।
এদিকে মন্ত্রীদের পদ এখন শূন্য জানিয়ে সচিবদের মন্ত্রীর পাঠানো ফাইলে স্বাক্ষর না করার জন্য বিএনপি আহ্বান জানিয়েছে। গতকাল দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী এ আহ্বান জানান। বিএনপি মন্ত্রীদের ওপর নজর রাখলেও মন্ত্রীদের এসব নিয়ে ভ্রুক্ষেপ নেই। তাঁদের বেশির ভাগের নজর নির্বাচনের দিকে। তবে কিছু প্রভাবশালী মন্ত্রী সর্বদলীয় সরকারের দিকে নজর রাখছেন। এ ধরনের একজন সিনিয়র মন্ত্রী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সর্বদলীয় সরকারে কারা মন্ত্রী হিসেবে থাকবেন তা একান্তই প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করে। প্রধানমন্ত্রী মহাজোটের শরিক দলের সঙ্গে কথা বলেছেন। অনেকে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে আওয়ামী লীগের কারা এ সরকারে থাকবেন তা নিয়ে সবার কৌতূহল থাকলেও তা একান্তই প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে। অবশ্য নীতি-নির্ধারণের সঙ্গে যারা জড়িত তাঁদের তো মন্ত্রিসভায় জায়গা দিতেই হবে। কারণ দেশ তো চালাতে হবে।
সর্বদলীয় সরকারে যোগদানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে কি না জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘না, কোনো কথা হয়নি। এসব প্রধানমন্ত্রীর বিষয়। সর্বদলীয় সরকারে কারা থাকবেন সেটা তিনিই ঠিক করবেন।’

শেয়ার করুন