নির্বাচন কমিশনারদের বিরোধ এখন চরমে

0
40
Print Friendly, PDF & Email

সংসদ নির্বাচনের আগ মুহূর্তে নির্বাচন কমিশনারদের বিরোধ এখন চরম আকার ধারণ করেছে। শুধু কমিশনাররাই নন, এমনকি ইসি কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছে মতদ্বৈধতা। নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে কোনো ইস্যুতেই একমত হতে পারছে না পাঁচ সদস্যের বর্তমান কমিশন। সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কমিশনাররা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। দিন দিন এ দূরত্ব আরও বেড়েই চলছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সবার দৃষ্টি যখন নির্বাচন কমিশনের দিকে, ঠিক তখনই সমন্বয়হীনতায় বেহাল অবস্থা চলছে কমিশনে। কমিশন বৈঠক বর্জনের ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার।

ইসি বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, গতকাল নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক বৈঠকেও সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন নিয়ে মতানৈক দেখা দেয় কমিশনারদের মধ্যে। সম্প্রতি নির্বাচনে সেনা মোতায়েন নিয়ে এক কমিশনার মিডিয়ায় কথা বলায় অন্য কমিশনাররা তার সমালোচনা করেন। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনারও সেনা মোতায়েন নিয়ে একই কথা বলেছেন। বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা বলেন, সেনা মোতায়েনের বিষয় নিয়ে কমিশনারদের মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে সেনা মোতায়েনকে ট্রামকার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এক কমিশনার আগেই সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দেওয়ায় অন্য কমিশনাররা তার সমালোচনা করেন। আর আগামী নির্বাচনে সেনা মোতায়েন হবে কিনা তা নিয়ে একেক জন একেক ধরনের কথা বলেন। এদিকে গত মঙ্গলবার এক কমিশনার বিএনপিকে নির্বাচনে আনার ব্যাপারে ব্যক্তিগত যোগাযোগের কথা বললেও গতকাল সিইসি বলেছেন অন্য কথা। সিইসি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের কোনো যোগাযোগ নেই। এ ছাড়া আইনগতভাবে সক্রিয় যোগাযোগ করা উচিতও নয়। একইভাবে সম্প্রতি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন কমিশনাররা। কেউ ‘বিএনএফ’ নামের একটি দলকে নিবন্ধন দেওয়ার জন্য ব্যক্তিগতভাবে কাজ করেন, আবার একাধিক কমিশনার দলটিকে নিবন্ধন দেওয়ার ব্যাপারে নানা শর্ত জুড়ে দেন। এ ছাড়া আরও সাত রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নিয়েও এখনো বিতর্ক চলছে কমিশনারদের মধ্যে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে ইসির কর্মকর্তাদেরও সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। সম্প্রতি ইসির নাম পরিবর্তন ও পদোন্নতি নিয়ে কর্মকর্তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। আর কমিশন বৈঠকে নিজ নিজ মতামতকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন কমিশনাররা। এতে করে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনেকটাই দূরত্বের সৃষ্টি হচ্ছে। আর কমিশন সচিবালয়ের কাজকর্মে নেমে আসছে এক ধরনের স্থবিরতা। এ ছাড়া দশম সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও ইসি সচিবালয়ের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনাররা চাচ্ছেন ডিসিদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিতে। অন্যদিকে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা চাচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের আঞ্চলিক অফিসার ও জেলা কর্মকর্তাদের রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হোক। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশন ও সচিবালয়ের মধ্যে অনেকটাই মৌন দ্বন্দ্ব চলছে। এমনকি রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের মধ্যে কথা কাটাকাটিও হয়েছে। সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি সংক্রান্ত ইসির এক আনুষ্ঠানিক বৈঠকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ নিয়ে নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে ইসি কর্মকর্তাদের কথা কাটাকাটি হয়। বৈঠকে একজন নির্বাচন কমিশনার ডিসিদের রিটার্নিং কর্মকর্তা নিয়োগ করার ঘোষণা দেওয়ায় ইসি কর্মকর্তারা তার পাল্টা প্রস্তাব দিয়ে বলেন, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদেরও রিটানির্ং অফিসার নিয়োগ দেওয়া হোক। এ নিয়েই শুরু হয় কথা কাটাকাটি। এমন সময় অপর একজন কমিশনার ঘোষণা দেন (বিতর্কিত ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন ১৯৯৬) ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আদলেই দশম সংসদ নির্বাচন হবে। তাই নির্বাচনের ফলাফল সংগ্রহ করা ইসির কর্মকর্তাদের দিয়ে সম্ভব নয়। এ জন্য ডিসিরাই যোগ্য। কমিশনারের এমন ঘোষণায় ইসির কর্মকর্তারা বলেন, সব সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইসির নিজস্ব কর্মকর্তারা যদি রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করতে পারেন তবে সংসদ নির্বাচনে পারবেন না কেন? তখন কমিশনার বলে উঠেন, সিটি নির্বাচন আর সংসদ নির্বাচন এক নয়। উত্তরে কর্মকর্তারা বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন সংসদ নির্বাচনের চেয়েও কঠিন। কেননা এক সিটিতে কয়েকটি সংসদীয় আসন থাকে। ইসি কর্মকর্তারা জানান, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিজস্ব কর্মকর্তাদেরও রাখার কথা ছিল। কিন্তু কমিশনাররা তা চাচ্ছেন না। এর আগেও নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ অনুষ্ঠান, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ এ ধরনের একাধিক জরুরি ইস্যুতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সঙ্গে নির্বাচন কমিশনারদের দ্বিমত হয়েছে। এ ছাড়া কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বিষয়েও কমিশন একমত হতে পারছে না বলে সচিবালয় সূত্র নিশ্চিত করেছে। এর আগেও মেহেরপুর জেলা নির্বাচন অফিসারকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মারধর করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধের সৃষ্টি হয় এবং ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে।

শেয়ার করুন