গভীর সংকটের পথে দেশ

0
47
Print Friendly, PDF & Email

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা বিষয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। রাজধানীসহ কোন কোন এলাকায় বিলি করা হচ্ছে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে এমন লিফলেট। গতকাল সাভারের আমিনবাজার থেকে সাধারণ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আফজাল হোসেন টেলিফোনে দৈনিক ইনকিলাবকে জানান, দুপুরের দিকে তার দোকান ও আশপাশের মার্কেটে কম্পিউটারে কম্পোজ করা একটি লিফলেট বিলি করা হয়, যাতে বাংলাদেশে বিদেশি খুনি ও এজেন্টরা সক্রিয় হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়। দেশে নৈরাজ্য ও অশান্তির সুযোগে এরা রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, সংগঠক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে বলে দাবি করা হয়। বাংলাদেশে আধিপত্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে যাদের অন্তরায় মনে করা হয়, তাদের দমন-পীড়ন, জেল জুলুম, হামলা-মামলার মাধ্যমে কোনঠাসা করার কৌশল ব্যর্থ হলে এই অপশক্তি সরাসরি দাঙ্গা ও নৈরাজ্যের সুযোগ নিয়ে হত্যা ও নির্মূলের খেলায় মেতে উঠতে পারে। রাজনৈতিক সংঘাত জিইয়ে রেখে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়ার পেছনে আধিপত্যবাদের একটি সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য রয়েছে। লিফলেটটির কপি সংগ্রহের চেষ্টা করেও সফল হওয়া যায়নি। এসব যারা পেয়েছেন তাদের কেউই অন্য কাউকে সেটি দিতে বা নিজের কাছে রয়েছে বলে স্বীকার করতে চাইছেন না।
দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি ও গুঞ্জন-অপপ্রচার নিয়ে কথা হয় বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী অধ্যপক ড. একেএম মাহফুজুল হকের সাথে। তিনি গভীর উদ্বেগের সাথে বলেন, ব্যাপক জনবহুল ও ভৌগলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশে ইচ্ছাকৃতভাবে সংঘাতময় পরিস্থিতি জিইয়ে রাখা খুবই বিপজ্জনক একটি ব্যাপার। রাজনীতিকদের হঠকারিতায় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চুরমার হয়ে যাচ্ছে। শাসক দলের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার অফুরন্ত স্পৃহা, সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের বিকাশ ও জাতিকে বিভক্ত করে স্থায়ী সংঘাত, এমনকি গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়ার প্রয়াস দেশের জন্য খুব বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। জাতীয় দাবিকে উপেক্ষা করে সংবিধানের দোহাই দিয়ে একতরফা নির্বাচন জাতিকে কত ভয়ংকর পরিণতি ও অতল অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে তা ভাবতেও শংকা জাগে। বিরোধী দলকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেয়ার এ চেষ্টা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে খাপ খায় না। এ ধরনের কাজ কোনদিন সুফল বয়ে আনে না। শাসক দলকে এ ধরনের কর্মকা-ের জন্য চড়া মাশুল দিতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতার সাথে যে আচরণ করা হচ্ছে, তা জনগণ মেনে নেবে বলে মনে করার কোন কারণ নেই। গণতন্ত্র ও জননিরাপত্তা বিপন্ন হওয়ার আশংকা থেকে জনগণ মুক্ত না হলে শাসক দলও নিরাপদ থাকতে পারবেন না। তাদের আগামী দিনগুলো হবে কণ্টকময়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক মন্ত্রী ও সক্রিয় রাজনীতিবিদ বলেন, আওয়ামী লীগের নেতা, মন্ত্রী ও সমর্থকদের সাথে আমার প্রতিনিয়ত কথাবার্তা হয়। তাদের ভেতর দু’ধরনের আতংক। একদিকে দলের যে রাজনীতি, এতে নেত্রীর সিদ্ধান্ত বা নির্দেশের বাইরে যাওয়ার তো পথ নেই-ই, এমনকি গঠনমূলক কোন পরামর্শ দেয়ার পরিবেশও বর্তমানে নেই। নেত্রীর চিন্তার বাইরে কথা বলবে বা চিন্তা করবে এমন লোকের স্থান আওয়ামী লীগে নেই। অথচ বঙ্গবন্ধু দলটিকে নেতাকর্মী নির্ভর উদারনৈতিক সংগঠন হিসেবেই রেখে গিয়েছিলেন। জেনে শুনেই ক্ষতিকর অনেক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতাদের মেনে নিতে হচ্ছে, যার পরিণাম ভয়ংকর হতে বাধ্য। দ্বিতীয় ভয় হচ্ছে পরিস্থিতির।
কোন কারণে নেত্রী ব্যর্থ হলে কিংবা সরকারের নিয়ন্ত্রণ হাত থেকে ফসকে গেলে আওয়ামী লীগের উপর নানামুখি বিপর্যয় নেমে আসা স্বাভাবিক। ভিআইপি নেতাদের ছাড়া দেশের সাধারণ নেতাকর্মীদের এসব বিপর্যয় থেকে বাঁচা খুবই কষ্টসাধ্য। নেত্রী ও তার আত্মীয়-স্বজন এসএসএফ নিরাপত্তা পান, তাদের বিদেশে নিরাপদ আশ্রয় রয়েছে। বড় বড় নেতা মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদেরও বাঁচার পথ খোলা আছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ নেতাকর্মীদের দেশে থেকেই সব বিপদ মোকাবেলা করতে হবে। হটকারিতা, নির্যাতন, জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতি ও অপরিণামদর্শী অতিকথনের প্রতিক্রিয়ার নিরীহ শিকার হবে সাধারণ আওয়ামী লীগাররা।
মহাজোটের অন্যতম নেতা ডা. এসএম শফিকের মতে, এককেন্দ্রিক সরকারের নেতারা বর্তমানে মোটেও স্বাভাবিক নন। তারা গণতন্ত্রের কথা মুখে বললেও দল ও জোটে গণতন্ত্র চর্চা করতে পারেননি। নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারা সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র চর্চা করতে চাইছেন। আন্দোলন, গণঅসন্তোষ ও আত্মসমালোচনার চাপে তারা এখন অস্থিরচিত্ত। এ অবস্থার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে মন্ত্রীদের এলোমেলো বক্তব্যে। প্রধানমন্ত্রী তার জেদ নিয়ে দৃঢ় স্বরে কথা বললেও মাঝে মধ্যেই খেই হারিয়ে ফেলছেন। তিনি মানুষের দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে না পেরে, বলে ফেলেছেন, প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, জনগণের শান্তি চাই- ধরনের কথা। কিন্তু শান্তির জন্য তিনি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ তৈরিতে রাজি হচ্ছেন না। অন্যদিকে সকল মন্ত্রী পদত্যাগ করেও যথারীতি দায়িত্ব পালন ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পেরে তারা উল্টাপাল্টা কথা বলছেন। আমরা নাগরিকরা কিন্তু খুবই চিন্তিত। একমাত্র প্রধানমন্ত্রী ছাড়া এখন দেশে বৈধ সরকার বলতে কিছু নেই। সংবিধান অমান্য করে চলছে গোঁজামিলের সরকার। এ ধরনরে দুর্বল নাজুক মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে নানা গুজব। আমরা মহাজোটে আছি বলে এক রকম ভাবি কিন্তু জনগণের ভাবনা সম্পর্কে খবর রাখি এবং ক্ষমতার ভাগ কিংবা হালুয়া-রুটি পাইনি বলে স্বাভাবিক অবস্থাটি এখনো অন্তরে ধরে রেখেছি। আমরা সরকারের অসাহয়ত্ব দুর্বলতা, প্রধানমন্ত্রীর পরনির্ভরশীলতা ও দুঃসাহসিকতার রহস্য ভাল ভাবেই বুঝতে পারছি। ঢাকার সামাজিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনের চেনামুখ, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও বাসদ নেতা কাজী শাহাবুদ্দীন বলেন, দেশের নানা অঞ্চলে এমন সব গুজব ছড়ানো হচ্ছে, যা আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি স্বরূপ। রংপুর, রাজশাহী ও বগুড়া থেকে আমার কাছে খবর এসেছে যে, বর্তমান সরকার দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বহাল করতে ব্যর্থ হলে এবং একতরফা নির্বাচন করে পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে দেশ পরিচালনায় সফল না হলে তারা দেশকে ভারতের হাতে তুলে দেবে।
মন্ত্রিসভা সংবিধান বিরোধী পন্থায় নামমাত্র টিকে থাকলেও বর্তমানে দেশ কেবল প্রধানমন্ত্রীর উপর নির্ভরশীল। তিনি গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সহায়তায় টিকে আছেন। সরকার তার মেয়াদ শেষ করলে দেশে সাংবিধানিক সংকট চরম আকার ধারণ করবে। নির্বাচন যথারীতি না হলে রাষ্ট্র ও সরকার আটকে পড়বে এক অনিশ্চয়তার পাঁকচক্রে। তখন বিদেশি হস্তক্ষেপ, এজেন্ট ও খুনিচক্রের কর্মকা- ইত্যাদির গুজব দেশকে করতে পারে চরম অস্থিতিশীল। বহিঃশক্তির আগ্রাসনের ভীতিও ছড়াতে পারে ব্যাপক অস্থিরতা। এসব দিক বিবেচনা করেই প্রধানমন্ত্রীকে ঠা-ামাথায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাঁর কাছে দেশ ও জাতির প্রত্যাশা অনেক। একগুঁয়ে রাজনীতির মুহূর্তের ভুলের মাশুল জাতিকে যেন গভীর অন্ধকারে ঠেলে না দেয়। দেশ ও জাতির চলমান উদ্বেগজনক সময় দীর্ঘয়িত না করে দ্রুত সমাধানের পথ পাইয়ে দেয়ার দায়িত্ব এখন তারই। নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ ও নতুনরূপে সংশোধিত সংবিধান তাকে এ দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি এ গুরু দায়িত্ব পালন করে জাতিকে স্বস্তির দিকে নিয়ে যাবেন বলে আমরা এখনো আশাবাদি।

শেয়ার করুন