প্রশ্নের মুখে মন্ত্রিসভা

0
80
Print Friendly, PDF & Email

সাংবিধানিক দিক থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার অস্তিত্ব আজ থেকে বড় প্রশ্নের মুখে পড়ল। কারণ, সংবিধান অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করামাত্রই তা কার্যকর হওয়ার কথা। এটা গ্রহণ করা বা নাকচ করার কোনো সুযোগ সংবিধানে রাখা হয়নি।

মন্ত্রিসভার সদস্যরা গতকাল সোমবার একযোগে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, সর্বদলীয় সরকার গঠনের পথ সুগম করতে তাঁরা এ পদক্ষেপ নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে রাষ্ট্রপতির কাছে না পাঠানো পর্যন্ত তাঁরা দাপ্তরিক ও নির্বাহী দায়িত্ব পালন করে যাবেন।

আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ অবশ্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পদত্যাগ করিনি। শুধু পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছি। রাষ্ট্রপতির কাছেও দিইনি। তাই এটা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না।’ কিন্তু সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের এক দফার ‘ক’ উপদফায় বলা আছে, ‘কোনো মন্ত্রীর পদ শূন্য হবে, যদি তিনি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন।’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ মাহমুদুল ইসলাম ভারত ও পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া দুটি রায়ের বরাতে তাঁর কনস্টিটিউশনাল ল অব বাংলাদেশ বইয়ে লিখেছেন, ‘সংসদ সদস্যসহ সকল সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তিগণের পদত্যাগ করার একতরফা অধিকার রয়েছে। এই পদত্যাগের কার্যকারিতা কোনো কর্তৃপক্ষের গ্রহণ করার উপর নির্ভরশীল নয়।’ [মল্লিক ব্রাদার্স, তৃতীয় সংস্করণ, ২০১২, পৃষ্ঠা-৪৭৭]

আইনবিদ শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, কোনো মন্ত্রী যখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেবেন, তখনই তাঁর পদ শূন্য হবে। পদত্যাগীদের পদ এখন শূন্য বলেই মনে করেন তিনি।

এর আগে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ ও রেলপথমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত পৃথক ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র পেশ করেন। সোহেল তাজ রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই পদত্যাগপত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু তা-ও গ্রহণ করা হয়নি।

এবার দেখা যাচ্ছে, মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র পেশ করার সাংবিধানিক জটিলতা সম্পর্কে মন্ত্রিসভা বিভাগ কিছুটা সতর্কতার পরিচয় দিয়েছে। তারা একটি খসড়াও মন্ত্রীদের কাছে পৌঁছে দেয় বলে জানা গেছে। এতে শর্ত সাপেক্ষে পদত্যাগপত্র প্রস্তুত করার চেষ্টা চোখে পড়ে। তাঁরা সর্বদলীয় সরকারের জন্য পদত্যাগের ‘অভিপ্রায়’ ব্যক্ত করলেও এর শিরোনামে পদত্যাগপত্র স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। সংবিধান বা প্রচলিত আইন ও রীতি-রেওয়াজের কোথাও মন্ত্রীদের শর্ত সাপেক্ষে পদত্যাগের সুযোগ রাখা হয়নি।

সংসদ থেকে গণপদত্যাগের পর মন্ত্রিসভা থেকেও গণপদত্যাগের নজির সৃষ্টি করল আওয়ামী লীগ। সংসদীয় রীতি-রেওয়াজের দিক থেকে এটি একটি বিরল ও অভাবনীয় ঘটনা। সংসদ সদস্যদের গণপদত্যাগ তৎকালীন স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী গ্রহণ করেননি।

সর্বদলীয় সরকার গঠনে মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র পাইকারি হারে জমা নেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এতে সংবিধান ও বিশ্বের অন্যান্য গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠিত রীতি-রেওয়াজের সঙ্গেও কোনো মিল নেই। সর্বদলীয় সরকার কত তারিখের মধ্যে ঘোষণা করা হবে, তার কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা নেই। অথচ পদত্যাগপত্র জমা নেওয়া হলো।

মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা না-করার বিষয়ে প্রথম আলোর কাছে একটি দালিলিক প্রমাণ রয়েছে। বাহাত্তরে গণপরিষদে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মন্ত্রীদের সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়ে বিতর্ক দেখা গিয়েছিল। বাহাত্তরের ৪ নভেম্বর চূড়ান্তভাবে সংবিধান গৃহীত হওয়ার আগে মুদ্রিত খসড়া সংবিধান থেকে দেখা যায়, মন্ত্রীদের প্রধানমন্ত্রীর অধীন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সে কারণে দুটি বিধান করা হয়েছিল। প্রথমত, লেখা হয়েছিল মন্ত্রিসভা প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহি করবে। দ্বিতীয়ত, মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা না-করা প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির ওপর নির্ভর করবে। পরে এই বিধান বাতিল করা হয়। এর অর্থ হলো, পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা না-করা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাধীন নয়। পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ামাত্রই তা কার্যকর হবে।

অথচ গতকাল জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, এটা প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকে কার্যকর হবে। ওবায়দুল কাদের তবু স্বীকার করেছেন, এতে নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে।

সংসদীয় রীতিনীতিতে অনেক সময় আইনের আক্ষরিক ব্যাখ্যার চেয়েও রাজনৈতিক নৈতিকতা ও বৈধতার প্রশ্নকেও বড় করে দেখা হয়। অপ্রয়োজনে মন্ত্রীদের গণপদ-ত্যাগের কোনো নৈতিকতা নেই।

সংসদীয় রীতি অনুযায়ী সাধারণত প্রধানমন্ত্রী তাঁর কোনো অবাঞ্ছিত সহকর্মীকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ জানিয়ে থাকেন এবং সেই সহকর্মী পদচ্যুতির কলঙ্ক এড়াতে তাৎক্ষণিক পদত্যাগ করেন। বাংলাদেশে এর কোনোটিই ঘটেনি। গতকাল কেবল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছা পূরণ করা হয়েছে।

মন্ত্রীসহ সব সাংবিধানিক পদধারীদের জন্য একই যুক্তি প্রযোজ্য। কারও পদত্যাগপত্রই গ্রহণ করা বা না করার ওপর নির্ভর করে না। কারণ, তাঁরা কারও অধীন নন। এটা পরিহাসমূলক যে, বাহাত্তরে সংবিধানপ্রণেতারা সুচিন্তিতভাবে যে বিধান বিলোপ করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী সেটাই এখন বাস্তবে অনুশীলন করে চলেছেন।

ব্রিটিশ রীতি মেনে মন্ত্রীদের বিষয়ে ভারতের সংবিধানে যে বিধান রাখা হয়, তা থেকে বাংলাদেশ ১৯৭২ সালেই ফিরে আসে। ভারতের সংবিধানের ৭৫(২) অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘মন্ত্রীরা রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা পর্যন্ত তাঁদের পদে বহাল থাকবেন।’ কিন্তু ব্রিটেন, ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য গণতন্ত্র থেকে ছিটকে বেরিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দিকে তাকিয়ে সংবিধান লেখা হয়েছিল। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে সব নির্বাহী ক্ষমতা রাখা হয়। মন্ত্রীদের অনুগত রাখতে বিশেষ সাংবিধানিক রক্ষাকবচ সৃষ্টি করা হয়। মন্ত্রীদের পদত্যাগ বা বরখাস্ত করার বিষয়ে বাংলাদেশ সংবিধানে তাই বিস্তারিত বিধান রাখা হয়েছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্র অনুশীলনরত অন্যান্য গণতন্ত্রে দেখা যায় না।

বাংলাদেশ সংবিধান শুধু একটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে কোনো মন্ত্রীর নিয়োগের অবসান ঘটাতে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেওয়ার অধিকার দিয়েছে। সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের ২ দফায় বলা আছে, প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় কোনো মন্ত্রীকে পদত্যাগ করার জন্য অনুরোধ করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ওই অনুরোধ পালনে ব্যর্থ হলে প্রধানমন্ত্রী তখন রাষ্ট্রপতিকে উক্ত মন্ত্রীর নিয়োগ বাতিলের পরামর্শ দিতে পারবেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, সব মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে যথাযথভাবে সাড়া দিতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁরা কেউ সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত অনুরোধ পালনে ব্যর্থ হননি। সুতরাং, মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদের ২ দফার শর্ত পূরণ করেছে বলে গণ্য হবে। এই পদত্যাগপত্র ৫৮ অনুচ্ছেদের এক দফার ‘ক’ উপদফার শর্ত পূরণ করেছে বলে গণ্য হবে না।

কয়েকজন মন্ত্রী গতকাল বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠেয় কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন থেকে ফিরে এসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু অবস্থা যদি এটাই হয় যে, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি। কিন্তু সেই অবস্থায় সংসদ ভেঙে গেল। তখন ওই পদত্যাগপত্রগুলো আর কার্যকর হবে না। সে হিসেবে গতকালের পদত্যাগপত্রগুলো ২৪ জানুয়ারি মধ্যরাতে আপনাআপনি মূল্যহীন কাগজে পরিণত হবে। ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারির পর প্রধানমন্ত্রী চাইলে রাষ্ট্রপতিকে কারও নিয়োগ বাতিলের পরামর্শ দিতে পারবেন। রাষ্ট্রপতিকে তখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে পৃথকভাবে নির্দেশ দিতে হবে।

শেয়ার করুন