বাংলাদেশে কেন কমপক্ষে ৬ মাসের সেনা সমর্থিত সরকার চায় যুক্তরাষ্ট্র

0
94
Print Friendly, PDF & Email

সংঘাত আসলে আবার একদিক থেকে আমেরিকার কাম্য। তবে সেটা অবশ্যই সীমিত আকারে যদি ঘটে। যেমন সংঘাত যেন আনুমানিক দুদিনের বেশি না গড়ায়, মোটকথা তা যেন নিয়ন্ত্রণে ও সীমিত থাকে। তবে অবশ্যই ঐ দুদিনে ভাল রক্তারক্তি প্রচুর হতে হবে। নইলে ব্যারাক ছেড়ে সেনাবাহিনী বাইরে বের করে আনার যুক্তিকে ন্যায্য প্রমাণ করা যাবে না। ওদিকে আবার যদি একে নিয়ন্ত্রণে ও সীমিত পর্যায়ে রাখা না যায় তবে আন্দোলন রেডিকেল মুড নিবে; গণভ্যুত্থানের দিকে মোড় নিয়ে নিতে পারে।

প্রসঙ্গ একঃ আমেরিকা ভারতের কথা শুনল না

ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে স্থানীয় মিডিয়ার জন্য একটা প্রেস রিলিজ পাঠানো হয়েছে ০৯ নভেম্বর সন্ধ্যায়। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের ওয়েবসাইটে ইংরাজীর সাথে বাংলাতেও বিবৃতিটি দেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি নিউজপোর্টালে খবরটি ছাপা হয়েছে, প্রিন্ট পত্রিকাতেও এসেছে। প্রথম আলোর ১০ নভেম্বর প্রিন্ট কিম্বা অনলাইন সংস্করণেও তাদের নিজেদের করা বাংলা অনুবাদ দেয়া আছে। আমি সেটাই এখানে ব্যবহার করব। ওর কিছু অংশ এরকমঃ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র “গত কয়েক দিনের ঘটনাবলি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পথ খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা দুই দলকে সহিংসতা এড়িয়ে চলতে বলছি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সহিংসতার স্থান নেই এবং তা গ্রহণযোগ্যও নয়।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অবশ্যই এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ থাকতে হবে যেখানে সব দল অবাধে ও শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ করতে পারে। সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নির্বাচনের দিনক্ষণ খুব দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। তাই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সমাধানের পথ খুঁজে নিতে প্রধান দলগুলোকে অবশ্যই ইতিবাচক আলোচনায় যুক্ত হওয়া উচিত”।

সাদা চোখে এই বিবৃতি তাৎপর্যহীন রুটিন কূটনৈতিক বক্তব্য মনে হতে পারে। তবে বাংলাদেশের ঘটমান রাজনীতির দিক থেকে এর তাৎপর্য বেশ গভীর। শুধু কুটনৈতিক বক্তব্য হিসাবে নয়, এটা প্রকাশ্য বা পাবলিক স্টেটমেন্ট হবার কারণে। এই বিবৃতি কেন্দ্র করে আমাদের কিছু নিরীক্ষণ এখানে পেশ করছি।

গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশ বিষয়ে আমেরিকা ও ভারতের মতভিন্নতা বিভিন্ন খবর ও বিশ্লেষণে চারদিকে ছেয়ে আছে। এটা মনে করার কারণ নাই, বাংলাদেশের রাজনীতির গতিমুখ একমাত্র দিল্লী কিম্বা ওয়াশিংটন ঠিক করবে। পরাশক্তি যতই চেষ্টা করুক তারা কখনই সবকিছুর নির্ধারক নয়। এটা অসম্ভব।

আমাদের ভাগ্য বিদেশীরা ঠিক করে দেয় এই প্রপাগাণ্ডা তারাই করে যারা চায় না অথবা আগেই হাল ছেড়ে দিতে চায় কিছু না করে যে, জনগণ তাদের নিজেদের সামষ্টিক স্বার্থের জায়গা থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় হোক।

এই ধরনের প্রপাগাণ্ডা রাজনীতিতে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষার জায়গা থেকে সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকাকে ম্লান করে দেওয়া বা নিরুৎসাহিত করবারই প্রচেষ্টা। রাজনীতির বর্তমান অভিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনও বাংলাদেশের জনগণই নির্ধারক হবে। তবে জনগণকে সঠিক তথ্য ও সম্ভাব্য বিশ্লেষণ ধরিয়ে দেওয়া এখনকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার কুটনৈতিক সম্পাদক ইন্দ্রাণী বাগচীর ৩০ অক্টোবরের রিপোর্ট, পরবর্তিতে তা নিয়ে একই পত্রিকায় সুবীর ভৌমিকের ১ নভেম্বরের কলামের কথা মার্কিন বিবৃতিটি বিশ্লেষণের আগে স্মরণ করা যেতে পারে।

ইন্দ্রাণী বাগচী তাঁর লেখার শিরোনামেই বাংলাদেশ সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণের প্রশ্নে মার্কিন ও ভারতের মতভিন্নতার কথা বলেছেন । (India, US at odd over Bangladesh policy – ইন্ডিয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নীতিতে দুই মেরুতে)।

সুবীর ভৌমিক বলছেন, বাংলাদেশ এক সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে আছে, ভারতকে তাদের বন্ধুপ্রতিম সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্য যা কিছু করার দরকার সব করতে হবে। এরপর রয়েছে বীণা সিক্রির বিবিসিতে সাক্ষাৎকার।

র এছাড়া গত পুরা সপ্তাহ ধরে রয়েছে প্রথম আলোর এই বিষয়ে প্রায় প্রতিদিনের রিপোর্ট আর মিজানুর রহমান খানের নিয়মিত কলাম – এভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশ নীতির প্রশ্নে দিল্লী ওয়াশিংটনের টানাপড়েনের খবর।

খবরটা মিডিয়াতে তাতিয়ে ওঠা ও দীর্ঘায়িত হবার মুল কারণ হাসিনাকে ক্ষমতার রাখবার জন্য ভারতীয় খায়েস ও প্রচেষ্টা – তা নয়। বরং দিল্লীর আশংকা যে, মতভিন্নতার ফলে ভারতের খায়েসকে উপেক্ষা করে আমেরিকা বাংলাদেশে নিজেদের স্বাধীন পদক্ষেপ নিয়ে ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমের মধ্যে ভারতপন্থীদের দাপট অজানা কিছু নয়। তারা এর বিপদ ভালই বুঝে। তারা এতদিন মার্কিন ছাতার আড়ালে দিল্লীর স্বার্থ রক্ষা করে চলত। সেই ছাতা সরে গেলে স্বাধীন ভাবে দিল্লীর স্বার্থ ও এজেন্সি রক্ষা করে চলা বাংলাদেশে তাদের জন্য কঠিনই হবে। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের আওয়ামি সংশ্লিষ্টতাকেও তারা “অসাম্প্রদায়িক”, “লিবারেল” রাজনীতির দোহাই দিয়ে ঢেকেঢুকে রাখতে পারত, সেটাও কঠিন হয়ে যেতে পারে ভেবে ব্যাপারটাকে এ কয়দিন মোটামুটি তাতিয়েই রেখেছে।

আমেরিকা ও ভারতের বাংলাদেশ বিষয়ক মতভিন্নতা চলছে কূটনৈতিক ভাষায়। আমেরিকান অবস্থানের প্রকাশিত ভাষার সুরটা হচ্ছে, সবাইকে নিয়ে (ইনক্লুসিভ) মুক্ত, সুষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। বিপরীতে ভারতীয় অবস্থানের ভাষা হলো, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হতে হবে। উভয়ের মতভিন্নতা এই দুই ধরণের কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহারের লড়াই হিসাবেও পর্যালোচনা করা যায়।

ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে দেওয়া আমেরিকার বিবৃতিটির দিকে তাকালে আমরা দেখব, তারা কুটনৈতিক ভাষা বদল করে নাই, “সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন” লেখে নাই। বরং “সংবিধান” শব্দটাই নাই। ফলে দিল্লীর সঙ্গে অন্তত মতভিন্নতার মূল পয়েন্টই তারা বজায় রেখেছে। এটা তাৎপর্যপূর্ণ।

আমরা বলতে পারি গত মাসের ২৩ অক্টোবর তারিখে মজিনার ভারত সফরের পর থেকে শুরু করে এই বিবৃতি দেবার সময় অবধি – অর্থাৎ ১৮ দিন পরেও আমেরিকা তার অবস্থান বদলায় নি। কূটনৈতিক ভাষার মধ্যে বাহ্যিক কিছু আমরা দেখছিনা যাতে তাদের অবস্থান বদল হয়েছে বলে শনাক্ত করা যায়। প্রকারান্তরে এই বিবৃতির এই মানেই আমরা করতে পারি যে ভারতের অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও নাকচ করে চলেছে।

এই নাকচ করার অর্থ অবশ্য আবার দুটো অবস্থানের একটি হতে পারে। এক, হয়তো এটা শুধু আমেরিকার বক্তব্য নয়, ভারতের ইচ্ছাও এর মধ্যে ইনক্লুডেড বা অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ হতে পারে যে এটাই বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই দেশেরই কমন অবস্থান। যদি তাই হয় ভারত কি তার শক্ত অবস্থান ছেড়ে দিচ্ছে? হাসিনার আচরণ দেখে তা মনে হয় না।

দুই, এটা আমেরিকার নিজের শক্ত অবস্থান, যেখানে ভারতের অবস্থান সম্পুর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নীতির প্রশ্নে দিল্লীর ওপর ঠিক আগের মতো নির্ভরশীল হতে চায় না। দিল্লীর বাইরে নিজের স্বাধীন নীতি অনুসরণ করতে চায়। শুধু তাই নয়। এই মতভিন্নতা পাবলিকলি স্পষ্টও করতে চায়।

প্রসঙ্গ দুইঃ কর্তৃত্ত্ব নিজের হাতে নেবার উদ্যোগ আমেরিকার

ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের দেওয়া বিবৃতি যদি ওয়াশিংটনের নতুন নীতির প্রতিফলন হয় তাহলে এর আরও অর্থ হলো, হাসিনার পঞ্চদশ সংশোধনীর কন্সটিটিউশন অনুযায়ী নির্বাচনের পক্ষে আমেরিকা নাই। অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে নির্বাচন করার বিষয়টার সুরাহা হবার আগে, নির্বাচন আপাতত স্থগিত বা বাতিলের পক্ষে আমেরিকা।

নির্বাচন বাতিল বা স্থগিত করা এবং পরবর্তিতে নির্বাচন কোন মেকানিজমে হবে তার কোন ইশারা বিবৃতিতে নাই। তবে এর ইঙ্গিতপুর্ণ জবাব পাওয়া যেতে পারে ০৯ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটার একুশে টিভিতে, এরশাদের এক বিরল সাক্ষাৎকারে।

ওখানে এরশাদ বলেছেন একটা আর্মিব্যাকড সিভিল সরকার নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনা করতে পারে। অর্থাৎ তিনি এক এগারোর সেনা সমর্থিত ধরণের সুশীল-সামরিক সরকারের কথাই বলছেন। সেইসাথে তিনি এও বলেছেন যে যদি করতে হয় তবে সেই সিদ্ধান্তও কনস্টিটিউশনে অনুমোদিত করিয়ে নিতে হবে।

ওদিকে লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিষ্টের রিপোর্টের শেষ প্যারাটাও এরকমই ইঙ্গিতপুর্ণ – ‘Sheikh Hasina has no interest in alienating it’। সেনা সমর্থিত সুশীল সরকার আসবার সম্ভাবনা থাকলেও তাদের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে দূরে সরিয়ে দেবার কোন আগ্রহ শেখ হাসিনার নাই।

শেয়ার করুন