তারিখবিহীন পদত্যাগপত্র : ২১ নভেম্বরের মধ্যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সর্বদলীয় সরকার

0
82
Print Friendly, PDF & Email

নির্বাচনকালীন ‘সর্বদলীয়’ সরকার গঠনের লক্ষ্যে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নিজ নিজ পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ‘তারিখবিহীন’ পদত্যাগপত্র তুলে দেন মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা। তবে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারের মন্ত্রিসভায় যারা সদস্য হবেন, শুধু তাদের পদত্যাগ কার্যকর হবে না। যেদিন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হবে, ওই দিনই পদত্যাগপত্র গৃহীত হবে বলে জানা গেছে।

আগামী ২১ নভেম্বরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠিত হতে পারে। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা পদত্যাগপত্র জমা দিলেও মন্ত্রী পদমর্যাদায় নিযুক্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা এখনও পদত্যাগপত্র জমা দেননি। কিংবা তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতিও দেওয়া হয়নি। এছাড়াও সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র দেওয়াতে মহাজোট সরকারের মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়া হচ্ছে না বরং পুনর্গঠিত করা হচ্ছে। আর সেই পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিসভার সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

নির্বাচনকালীন ‘সর্বদলীয়’ সরকার গঠনের লক্ষ্যে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থিত সব মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন বলে বৈঠক শেষে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন। তিনি অবশ্য বলেন, প্রধানমন্ত্রী যতক্ষণ না পদত্যাগপত্র গ্রহণ করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত মন্ত্রীরা দাফতরিক ও নির্বাহী দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানকও পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রীরা পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার পরই সেটি স্বাভাবিকভাবে কার্যকর হয়।

ভূমিপ্রতিমন্ত্রী এডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার বলেছেন, সর্বদলীয় সরকারের স্বার্থে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। তবে প্রধানমন্ত্রী যতক্ষণ পর্যন্ত পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে যাব। অবশ্য কয়েকজন মন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমান মন্ত্রীদের মধ্যে যারা নির্বাচনকালীন সরকারে থাকবেন, তাদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হবে না। অন্যদের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

একাধিক মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, পদত্যাগপত্রে তারা কেউ তারিখ উল্লেখ করেননি। মন্ত্রিসভার গত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই মন্ত্রীদের তারিখবিহীন পদত্যাগপত্র দিতে বলেছিলেন। আর সোমবার বৈঠকের শুরুতেই মন্ত্রিসভার সদস্যরা একে একে পদত্যাগপত্র দেওয়ার পর শেখ হাসিনা তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। মন্ত্রীরা আরো জানান, মনোনয়ন ফরম কিনে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে নির্বাচনী কাজে নেমে পড়তে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়া নিয়ে ইয়াফেস ওসমান মন্ত্রিসভার বৈঠকে নিজের লেখা একটি কবিতা আবৃত্তি করেন বলেও মন্ত্রিসভার একজন সদস্য জানান।

এর আগে ৪ নভেম্বরের মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকার গঠনের লক্ষ্যে মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার অনুরোধ করেন। তখন বলা হয়, এক সপ্তাহের মধ্যে যেন সবাই পদত্যাগপত্র জমা দেন। এর পর থেকে পদত্যাগপত্র জমা পড়তে শুরু করে। প্রথমে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম পদত্যাগপত্র জমা দেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত রোববার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, ইতোমধ্যে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। গতকালের আগে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে বেশ কয়েকজন পদত্যাগপত্র জমা দেন বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগ প্রসঙ্গে সংবিধানের ৫৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী ব্যতীত অন্য যেকোনো মন্ত্রীর পদ শূন্য হইবে, ‘‘যদি (ক) তিনি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন।’’

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। সেখান থেকে পদত্যাগপত্র মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পৌঁছানোর পরই এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হবে।

মন্ত্রিসভার বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করলে তবেই তা কার্যকর হবে। এখন তিনি পদত্যাগপত্র জমা নিয়েছেন মাত্র। আর পদত্যাগপত্রে কেউ তারিখ উল্লেখ করেননি। যখন থেকে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ গ্রহণ করবেন তখনই পদত্যাগপত্রে তারিখ বসিয়ে নিবেন। প্রধানমন্ত্রী যতদিন পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করবেন, ততদিন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা স্বপদে থেকে কাজ করে যাবেন। বৈঠক সূত্রে আরও জানা গেছে, নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে যেসব মন্ত্রীকে রাখা হবে তাদের পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করবেন না। অন্যদের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করবে।

সূত্র আরো জানায়, পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ চাইলেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। এ সময় সর্বদলীয় সরকারে ঠাঁই পাওয়ার উদ্দেশ্যেই মূলত প্রধানমন্ত্রীর পা ছুঁয়ে সালাম করে তার আশীর্বাদ প্রত্যাশা করেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা। প্রধানমন্ত্রীও এ সময় কারো কারো মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করেন।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে অগ্রিম পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। তিনি জানান, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা পদত্যাগপত্র জমা দিলেও নির্বাচনকালীন ‘সর্বদলীয়’ সরকার হওয়ার আগ পর্যন্ত দাফতরিক কাজ করে যাবেন; নির্বাহী ক্ষমতাও প্রয়োগ করতে পারবেন।

তবে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন ‘সর্বদলীয়’ সরকার কবে গঠিত হবে সে ব্যাপারে বৈঠকে স্পষ্ট করেননি প্রধানমন্ত্রী বলেও জানান তিনি। তথ্যমন্ত্রী আরো বলেন, সংলাপের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমরা আশা করছি- বিরোধী দলকে অন্তর্ভুক্ত করেই সর্বদলীয় সরকার গঠিত হবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করা হয়নি। তার খাবার এবং পানীয়ও বন্ধ করা হয়নি।

সোমবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা সাংবাদিকদের জানান, বর্তমান কাঠামোয় মন্ত্রিসভার এটাই শেষ বৈঠক। পদত্যাগপত্রগুলোর মধ্যে কিছু রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। আর কিছু রেখে দেওয়া হবে। তারা পুনর্গঠিত মন্ত্রিসভায় যুক্ত হবেন। এছাড়া ওই মন্ত্রিসভায় নতুনদের যুক্ত করা হবে। প্রজ্ঞাপন জারির পরই মন্ত্রীদের পদত্যাগ আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচিত হবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, সংবিধানে সর্বদলীয়, একদলীয় বা অন্তর্বর্তী সরকার বলে কোনো কথা নেই। প্রধানমন্ত্রী সর্বদলীয় মন্ত্রিসভার কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি এই মন্ত্রিসভার সংখ্যার ব্যাপারে কিছু বলেননি। তবে ওই মন্ত্রিসভার আকার ছোট হবে।

নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপি ও তাদের শরিকদের আপত্তির মধ্যেই সর্বদলীয় সরকার গঠনের এই প্রক্রিয়া শুরু করল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। গত ১৮ অক্টোবর জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের এই প্রস্তাব দেন এবং বিরোধী দলকে তাতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তবে এর দুই দিন পর প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখান করে সাবেক উপদেষ্টাদের নিয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নতুন প্রস্তাব দেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। ওই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার দাবিতে দুই দফায় ছয় দিন হরতাল করার পর রোববার থেকে আরো চার দিনের হরতাল করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী টেলিফোন করে বিরোধীদলীয় নেতাকে হরতাল প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়ে গণভবনে আমন্ত্রণ জানালেও খালেদা জিয়া তাতে সাড়া দেননি। প্রধানমন্ত্রী বরাবরই বলে আসছেন, অনির্বাচিত কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচন তিনি সমর্থন করবেন না। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর মধ্য থেকেই সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা হবে, যার অধীনে হবে দশম সংসদ নির্বাচন। সংবিধান অনুযায়ী আগামী ২৪ জানুয়ারির মধ্যে এই নির্বাচন হতে হবে।

শেয়ার করুন