এজেন্ডা বাস্তবায়নে অনড় অবস্থানে প্রধান দুই দল

0
187
Print Friendly, PDF & Email

রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। নিজ নিজ এজেন্ডা বাস্তবায়নে অনড় অবস্থানে প্রধান দুই দল। সর্বদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। অন্যদিকে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে চূড়ান্ত আন্দোলনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট।দেশজুড়ে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা

কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। দু’পক্ষের এ অনমনীয় মনোভাবে উৎকণ্ঠিত শান্তিপ্রিয় দেশবাসী। একের পর এক টানা হরতাল, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাসহ সারাদেশে ব্যাপক ধরপাকড়ে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। এতে আরও বাড়ছে মানুষের উৎকণ্ঠা।

শিগগির সংলাপের মাধ্যমে দু’পক্ষ সমঝোতায় না এলে সহিংসতা আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা তাদের। সবার মনেই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে একই প্রশ্ন_ চলমান সহিংসতার অবসান হবে কবে? বিবদমান দু’পক্ষ সমঝোতায় আসবে কি-না? নাকি এভাবেই একের পর প্রাণ হারাবে নিরীহ মানুষ?

সমকালের পক্ষ থেকে গতকাল বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে আলাপকালে উঠে এসেছে এ ‘কঠিন’ প্রশ্নগুলো। একের পর এক হরতাল, রাজপথে সহিংসতা এবং গণগ্রেফতারে উদ্বিগ্ন মানুষ সহসা সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা চান। এ জন্য সরকার ও বিরোধী দলকে ‘নমনীয়’ হওয়া উচিত বলেও মনে করছেন সাধারণ মানুষ। দেশ, গণতন্ত্র ও জনগণের স্বার্থে উভয় পক্ষকে ‘ছাড়’ দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে সমঝোতার পথে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন সবাই।

দীর্ঘদিন ধরেই নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দুই মেরুতে অবস্থান করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তবে নির্বাচনের সময় এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দু’পক্ষের এ মতপার্থক্য রাজপথে সহিংসতায় রূপ নেয়। বিএনপির পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানানো হয়, নির্দলীয় সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবে না। দাবি আদায়ে রাজপথে আন্দোলনের পথ বেছে নেয় তারা। এর অংশ হিসেবে পরপর দুই সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা করে মোট ১২০ ঘণ্টার হরতাল দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাদের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি সংলাপেরও আহ্বান জানানো হয়।

অন্যদিকে, সংলাপের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও বিরোধী দল সাড়া না দিয়ে রাজপথে সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ করছে সরকার পক্ষ। দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৌড়ঝাঁপ সুফল না দেওয়ায় সর্বশেষ দেশের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ উদ্যোগী হন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেন তারা। মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপের ব্যাপারে নিঃশর্ত আগ্রহের কথা জানান বিরোধীদলীয় নেতা। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতাকে টেলিফোনে দেওয়া দাওয়াত এখনও বহাল আছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। উভয় নেত্রী সংলাপের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করলেও নতুন করে এ বিষয়ে কেউই উদ্যোগী হননি।

এ পরিস্থিতির মধ্যে শুক্রবার ৭২ ঘণ্টার হরতাল ঘোষণা করে ১৮ দলীয় জোট। ওই রাতেই বিএনপির পাঁচ কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। পাশাপাশি সারাদেশে ধরপাকড়ও শুরু হয়ে যায়। বিএনপি চেয়ারপারসনের অফিস এবং বাসভবনের সামনে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৮ দল হরতাল ৭২ ঘণ্টা থেকে বাড়িয়ে ৮৪ ঘণ্টার হরতালের ডাক দেয়।টানা হরতালে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ও আহত হওয়া ছাড়াও চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন নিরীহ সাধারণ মানুষ। হরতালে ঝুঁকি নিয়েই বের হতে হচ্ছে ভীতসন্ত্রস্ত কর্মজীবী মানুষকে।

ইতিমধ্যে পিকেটারদের হামলায় অগি্নদগ্ধ হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। অগি্নদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন অনেকে। শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির শেষ নেই। বারবার পেছাচ্ছে জেএসসি এবং জেডিসিসহ অন্যান্য পরীক্ষা। বছরের শেষ দিকে অন্যান্য শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। রাজনৈতিক সহিংসতার কারণে অভিভাবকদেরও এ নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত নেই।

বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এজেএম শফিউল আলম ভঁূইয়া বলেন, দুই দল যদি বর্তমান অবস্থানে থাকে তাহলে দেশ আরও সংকটের মুখে পড়বে।

আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের ‘সর্বদলীয় সরকার’ এবং ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ প্রস্তাবের মাঝামাঝি কিছু একটা করা যেতে পারে। বর্তমান সংকট সমাধানের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সদিচ্ছা থাকলে রাজনীতির যে কোনো পরিস্থিতিতে সমাধান বের করে আনা সম্ভব। এক্ষেত্রেও তা হতে পারে। শুধু ক্ষমতায় যাওয়া নয়, দেশের কথা বিবেচনায় আনার জন্য তিনি সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানান।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিম সমকালকে বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন না হওয়ার কোনো কারণ নেই। রাজনৈতিক কর্মসূচি অহিংস হলে সেই কর্মসূচি এবং আন্দোলন একসঙ্গে চলতে পারে। ব্রিটিশ এবং পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধেও এমন আন্দোলন হয়েছে। তবে সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে জণগনের জানমালের ক্ষতি হলে তা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। সে জন্য যে কাউকে আটক করা যেতে পারে।

জনগণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বোঝে না, তারা শান্তিপূর্ণভাবে বাঁচতে চায়। সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোমলমতি লাখ লাখ শিক্ষার্থীর বিড়ম্বনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট এলিনা খান সমকালকে বলেন, দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কাম্য নয়। রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দুই নেত্রীকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের আরও নমনীয় হতে হবে। যদি তারা বসে আলোচনা করে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পেঁৗছতে পারেন সেটা জাতির জন্য ভালো। এতে মানুষ বাঁচবে। তিনি বলেন, হরতাল কারোই কাম্য নয়। হরতালে প্রাণহানি ঘটে, সম্পদ নষ্ট হয়। এটা থেকে আমরা পরিত্রাণ পেতে চাই।

বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি পরিচালক শ্যামল পাল সমকালকে বলেন, ক্ষমতার লড়াই করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দু’দলই দেশ ও জনগণকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিরোধী দলের সহিংস হরতাল কর্মসূচি যেমন সমর্থনযোগ্য নয়, তেমনি আওয়ামী লীগকে সংলাপের বিষয়ে আরও আন্তরিক হতে হবে। দেশের স্বার্থে বিরোধী দলকে হরতাল প্রত্যাহার করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি দল আবারও বিরোধী দলকে সংলাপে ডাকবে_ এমনটাই প্রত্যাশা করেন তিনি।

প্রকৌশলী আবু ফাতাহ মোহাম্মদ সোহেল বলেন, আমাদের রাজনীতিবিদরা একে অন্যকে বিশ্বাস করেন না। তাহলে আমরা তাদের বিশ্বাস করব কী করে? আমাদের জীবনকে অস্থির ও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়ার মতো গণতন্ত্র আমরা চাই না। আমার যে কোনো মূল্যে দেশে নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শান্তি চাই।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শুধু আমি নই, দেশের প্রতিটি মানুষ উদ্বিগ্নতার মাঝে দিন কাটাচ্ছে। হরতালের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা দল কখনও ৮৪ ঘণ্টার হরতাল দিতে পারে না। দেশের ক্ষতি করে, জনগণের ক্ষতি করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বিরোধী দলকে এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

আবার সরকারকেও নমনীয় হতে হবে। ধরপাকড়ের মাধ্যমে কোনো সমাধান আসবে না; বরং এটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাই সরকারকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

টানা হরতাল ও সংঘাতময় রাজনীতির কবলে পড়ে আবাসন খাত ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বলে আক্ষেপ করেছেন তমুদ্দুন প্রপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউল্লাহ আমিন। তিনি বলেন, ‘আবার ১/১১ আসছে_ সাধারণ মানুষ এ ভয়ে আছে। এ কারণেই টাকা থাকলেও কেউ তা বের করার ঝুঁকি নিচ্ছেন না।’ দুই দলের মধ্যে সমঝোতা ও কিংবা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হলে এ অচলাবস্থা কেটে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

মোবাইল ফোন আমদানিকারকরা হরতালের কারণে ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়েছেন বলে মনে করেন টকিও টেলিকম লিমিটেডের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহ মো. সাবি্বর সাদিক। তিনি সমকালকে বলেন, লাগাতার হরতাল চলতে থাকলে বিনিয়োগ আটকে থাকবে। এতে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে একমাত্র উপায় দুই দলের সমঝোতা ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর।স্কুলশিক্ষক মনির হোসেন বলেন, আমাদের রাজনীতিবিদরা দেশের চেয়ে ক্ষমতার প্রতি বেশি আগ্রহী। জনগণের কথা চিন্তা করলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমঝোতায় আসবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ইফতেখার আলম বলেন, দুই রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখী অবস্থানে এখন উৎকণ্ঠায় সারাদেশ। দু’পক্ষকে ছাড় দিতে হবে। দেশের জনগণের জন্য কাজ করতে হবে। সংবিধানে যা-ই থাকুক শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী রেখে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতার কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারই সর্বোত্তম পন্থা। শুধু টেলিফোন আলাপ নয়, দুই নেত্রীর মুখোমুখি আলোচনায় বসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

হরতালে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সিদ্ধেশ্বরীর বাসিন্দা গৃহিণী শামীমা আক্তার মিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বছরের শেষ দিকে এভাবে হরতাল দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এখন প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা হচ্ছে। হরতালে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, হরতালে যাদের জীবনহানি ঘটছে, যেসব মায়ের কোল খালি হচ্ছে; তাদের জীবন তো কেউ ফেরত দিতে পারবে না। আমি ধ্বংসের রাজনীতি চাই না।

মিরপুরের বাসিন্দা ব্যাংকার জাহানারা ইসলাম বলেন, টানা হরতাল এবং সহিংসতায় মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। রাস্তায় বেরোতে ভয় পাচ্ছে। জনগণ হরতাল ও লাশ আর চায় না। তাই জনগণের কথা ভেবে দুই নেত্রী একসঙ্গে বসে সমাধানের পথ বের করবেন বলে তিনি আশাবাদী।

শেয়ার করুন