চলনবিলাঞ্চলে ভেজাল বীজ উৎপাদনে প্রতারিত হচ্ছে কৃষক

0
112
Print Friendly, PDF & Email

আসন্ন ইরি বোরো মৌসুমকে সামনে রেখে নাটোরের সিংড়ায় যত্রতত্র ভাবে ভেজাল বীজ উৎপাদন করে বাজারজাত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খোলা বাজার থেকে ধান ক্রয় করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বীজের গুনগত মান যাচাই-বাছাই না করেই প্যাকেটিং করা হচ্ছে।

আর ওইসব বীজ দেশের প্রায় ২০টি জেলায় সরবরাহ করছে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে করে প্রতারণার শিকার হচ্ছে কৃষকরা। বেশি লাভের আশায় ভেজাল বীজ উৎপাদন করে অনেকেই রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হচ্ছে।

প্রয়োজনীয় তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগ সাজসে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের ম্যানেজ করে দীর্ঘ দিন ধরে তারা এসব বীজ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

আর কোনরুপ যাচাই বাচাই ছাড়াই ঢালাও ভাবে বীজ উৎপাদনের সার্টিফিকেট দেওয়ায় এধরণে প্রতারণার শিকার হতে হচ্ছে কৃষকদের।

সিংড়া কৃষি অফিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন জাতের বীজ উৎপাদন করছে। এগুলো হচ্ছে, গাজীপুর সীড লিমিটেড, স্কয়ার সীড কোম্পানী, কৃষক বন্ধু বীজ ভান্ডার, গ্রীন সুপার সীডস, লর্ডস ইন্টারন্যাশনাল সীডস, সরকার সীডস লিমিটেড, গোল্ডেন সীড, তালুকদার সীডস, শেখ সীড এবং ফুর্তি সীডস লিমিটেড। আর এসব প্রতিষ্ঠান বিআর-২৮, বিআর-২৯, বিআর-৫০ ধানসহ রোপা আমন জাতের বীজ উৎপাদন করে থাকে।

সরেজমিনে পৌরসভার নিংগইনে অবস্থিত বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গাজীপুর সীড লিমিটেড ও ফেরিঘাট সংলগ্ন আউকুড়ি মৌজায় স্কয়ার সীড কোম্পানীতে গিয়ে দেখা যায়, গ্রেডিং মেশিনের পরিবর্তে খোলা মাঠে হাত ফ্যান দিয়ে ধান উড়িয়ে কোন পরীক্ষা-নিরিক্ষা ছাড়াই ধানগুলো প্যাকেটিং করা হচ্ছে।

আদৌ ওইসব বীজ মান সম্পন্ন কিনা তা খতিয়ে দেখার কেউ নেই। আর খোলা ধান দিয়েই তৈরী করা হচ্ছে কথিত ভিক্তি বীজ। প্যাকেটিংয়ের গায়ে সরকার অনুমোদিত লিখে বীজ বাজার জাত করা হচ্ছে দেদ্দারচ্ছে।

আর ট্রুথফুল লেভেল সীট (টিএলএস) লাগিয়ে বীজের গুনাগুন শত ভাগ দেখানো হয়েছে। আসলে ওই বীজগুলো কত ভাগ অঙ্কুরোদম ক্ষমতা সম্পন্ন তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে না। মজার বিষয় হলো বাজারজাত করার জন্য সরকার অনুমোদিত একই নম্বরের একাধিক ট্যাক কার্ড লাগানো প্যাকেটও চোখে পড়ে। তাছাড়া স্কয়ার সীড কোম্পানীর মালিকের কোন জমি জমা নেই এবং রাজশাহী বীজ প্রত্যায়ন থেকে কোন সার্টিফিকেট না নিয়েও বাজার থেকে খোলা ধান কিনে গোপনে বীজ প্যাকেট করছে বলে এলাকাবাসীরা অভিযোগ করেন।

চলনবিলাঞ্চলের সাতপুকুরিয়া গ্রামের কৃষক আবু তাহের টগর, ডাহিয়া গ্রামের কামাল হোসেন জানান, গত বছর গাজীপুর সীডস থেকে ধান বীজ কিনে প্রতারিত হয়েছেন তারা। এতে করে তাদের অনেক টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে।

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও চলনবিলের কৃষকের নেতা মিজানুর রহমান মিজান বলেন, প্রতি বছরই ভেজাল বীজ কিনে অনেক কৃষকই প্রতারিত হচ্ছে। আর ওইসব প্রতারিত কৃষকদের মামলা করার জন্য পরামর্শও দিয়েছি। কিন্তু কৃষকরা বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস পায় না। কারণ যারা ভেজাল বীজ উৎপাদন করছে, তাদের পিছন থেকে কিছু রাঘব বোয়ালরা সহায়তা করে থাকে। আর বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৩ থেকে ৪টনের সার্টিফিকেশন নিয়ে হাজার হাজার টন বীজ উৎপাদন করে সারা উত্তরবঙ্গ বীজ সাপ্লাই করছে। তিনি আরও জানান নিংগইনে একটি পুরাতন “সিনেমা হল” এধরনের বীজ উৎপাদন হচ্ছে বলে উদাহরণ দেন। আর এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গাজীপুর সীড ও স্কয়ার সীডসহ অন্যান্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খোলা বাজার থেকে কৃষকদের কাছে ধান কিনে গুদামজাত করে রাখে। পরে তা বীজ হিসাবে বিক্রি করে। তবে নিয়ম রয়েছে বীজ করার জন্য, যে ক্ষেতের ধান ব্যবহার করা হবে, তা ওই কৃষকের জমিতে নেটিং পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। কারণ নেটিং না করলে, এক ধানের শুক্রানু আরেক ধানে মিলিত হয়ে শংকর জাতের ধান উৎপন্ন হয়। এতে করে ওইসব ক্ষেতের ধান বীজ হিসাবে গণ্য হয় না। কিন্তু সিংড়ার বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব খামারের ধান বলে চালিয়ে দিচ্ছে। অথচ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কারো কারো কোন জমিজমা নেই যাদের রয়েছে ৫থেকে ৭বিঘা জমি। আর প্রতি মৌসুমে হাজার মেট্রিক টন বীজ উৎপাদন ও বিপনন করছেন তারা।

গাজীপুর সীড লিমিটেডের স্বত্বাধিকার আমিনুল ইসলাম (আল আমিন) জানান, দেশের  উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের প্রায় ২০টি জেলায় বিভিন্ন জাতের ধান বীজ সরবরাহ করে থাকে। তার বীজের ব্যাপক সুনাম রয়েছে। আর স্কয়ার সীড কোম্পানীর স্বত্বাধিকার বিদ্যুৎ বীজ প্রত্যায়নের অনুমতি পাননি স্বীকার করে জানান, তিনার জমিজমা না থাকলেও অন্যের কাছ থেকে ধান কিনে তিনি বীজ তৈরী করে থাকেন। আর বীজ প্যাকেটে টিএলএস শিট ফটোকপি সবাই ব্যবহার করে বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন।

রাজশাহী বীজ প্রত্যায়ন অফিসার আহমেদ শাফি জানান, বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বীজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই তাদের প্রত্যায়ন পত্র দেয়া হয়েছে। তবে বীজ উৎপাদনের জন্য কয়েকটি শর্ত মানা না হলে বীজ যে কোন সময় নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর বাজার থেকে ধান কিনে বীজ তৈরী করা একটি অনৈতিক কাজ। তবে কৃষকের কাছে গ্রহণ যোগ্য বীজ হতে হবে। এছাড়া স্কয়ার সীড কোম্পানীকে বীজ উৎপাদনের জন্য তিনি কোন সার্টিফিকেট দেন নাই বলে জানান। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয় জনবল না থাকার কারণে বীজ তদারকি করা সম্ভব হচ্ছে না। আর এ কারণেই অনেকেই ভেজাল বীজ উৎপাদন করছে বলে তিনি স্বীকার করেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব ও কৃষি অফিসার সুব্রত কুমার সরকার বলেন, বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদারকির করার এখতিয়ার আমাদের নেই। আমরা শুধুমাত্র তাদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে থাকি। তবে আড়ালে কেউ ভেজাল বীজ উৎপাদন করে থাকতে পারে। তিনি আরো বলেন, অত্র উপজেলায় বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঠিক সংখ্যা তিনার জানা নেই। কারণ যারা বীজ উৎপাদন করছে তারা কৃষি অফিসের সাথে কোন যোগাযোগ রাখেই না বললেই চলে।

শেয়ার করুন