আদালতে গিয়ে নির্বাচনের যোগ্য হচ্ছেন ঋণখেলাপিরা!

0
103
Print Friendly, PDF & Email

দশম জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিকল্প পদ্ধতিতে ব্যাংকের খেলাপির খাতা থেকে মুক্ত হচ্ছেন ঋণখেলাপিরা। আর এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতেই বেছে নিয়েছে তারা।

পাওনা আদায় করার জন্য ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে মামলা করে ব্যাংকগুলো। আর খেলাপিরা উচ্চ আদালতে রিট করে ঋণখেলাপির তালিকা থেকে সাময়িকভাবে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন।

ব্যাংকারদের যোগসাজশে একই ব্যাংকের অন্য শাখা কিংবা অন্য ব্যাংক থেকে ভুয়া ঋণ নিয়ে আগের ঋণ শোধ করছেন। আবার ডাউন পেমেন্ট না দিয়েই বিশেষ বিবেচনায় ঋণ নবায়ন করার পাশাপাশি খেলাপিরা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হচ্ছেন। তারা আদালতে রিট করে ঋণখেলাপির তালিকা থেকে নিজেদের নাম স্থগিত করিয়ে নিচ্ছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর পাওনা আদায় এবং মামলাসংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ পর্যন্ত ৫৬ হাজার ৯৪৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা করেছে বিভিন্ন ব্যাংক। ৯ লাখ ৭২ হাজার ৪৮৭টি মামলা হয়েছে ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার ব্যক্তির বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ শতাধিক বড় খেলাপি উচ্চ আদালতে রিট করে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। এ অব্যাহতির সুবাদে তারা ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ নিয়মাচারকে পাশ কাটিয়ে অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেয়ার সুযোগ নিচ্ছেন। শত শত কোটি টাকার ঋণ পরিশোধের দায় থেকেও তারা নিজেদের মুক্ত রাখতে সক্ষম হচ্ছেন। পাশাপাশি আগামী জাতীয় নির্বাচনেও অংশ নিতে কেউ কেউ প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে ওই সূত্র জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

বিচারকাজে ধীরগতির কারণে এ ধরনের মামলার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। আর মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ায় ব্যাংকের পুঞ্জীভূত খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও বারবার তাগিদ দেয়া হলেও খুব একটা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ম. মাহফুজুর রহমান বাংলামেইলকে বলেন, অর্থঋণ আদালত ও ঋণসংক্রান্ত অন্যান্য আদালতে বিচারকাজে ধীরগতি রয়েছে। এ জন্য মামলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ব্যাংকের টাকা পরিশোধে ধীরগতি আনতেই অনেকে ইচ্ছে করে আদালতের আশ্রয় নেন। এ ক্ষেত্রে অর্থ আদালতের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকিং খাতেরও কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকলে এসব অর্থ আদায় করা হয়তো সম্ভব হতো।

তিনি জানান, এ অবস্থায় খেলাপিদের আটকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন বিকল্প চিন্তা করছে, কিন্তু এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তবে অচিরেই একটা সময় উপযোগী সিদ্ধান্তে আসতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এসব ক্ষেত্রে পরস্পরের যোগসাজশে কাজ করছেন ব্যাংকের অসাধু কর্মকর্তা ও খেলাপি ঋণগ্রহীতারা। মাঝে থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন আমানতকারী ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা।

ব্যাংকিংখাত থেকে খেলাপি ঋণ দূর করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৩ সালে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে। খেলাপি ঋণ আদায় বাড়াতে এবং নতুন করে কেউ ঋণখেলাপি না হন সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক দু’টি পদ্ধতি গ্রহণ করে।

এ দু’টি পদক্ষেপ ছিল আইনগত পদক্ষেপ এবং পদ্ধতিগত পদক্ষেপ। আইনগত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইন-১৯৯৩-এর সংশোধনী করে। সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭ ধারা মোতাবেক কোনো ঋণখেলাপিকে নতুন করে ঋণ দেয়া যাবে না। একই সঙ্গে তারা কোনো জাতীয় নির্বাচনেও অংশ নিতে পারবেন না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোন ব্যাংক থেকে কী পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, ঋণ নিয়ে ঠিক মতো পরিশোধ করা হয়েছে কি না, বা গ্রাহক খেলাপি কি না তার তথ্য মজুদ করে রাখে। ব্যাংকগুলো সিআইবি থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্য মোতাবেক গ্রাহক যদি ঋণখেলাপি হয়ে থাকে তা হলে তাকে ঋণ দেয়া থেকে বিরত থাকে।

অন্য দিকে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২-এর মতে জাতীয় নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনে কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। সম্ভাব্য প্রার্থী ঋণখেলাপি কি না তা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে তথ্য চাওয়া হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করে থাকে। এ কারণে নির্বাচনের সময় সম্ভাব্য প্রার্থী ঋণখেলাপি হলে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করে থাকেন। অনেকে একটি নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ ডাউন পেমেন্ট (মোট ঋণের ১৫ শতাংশ) দিয়ে ঋণ নবায়ন করে।

ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকার ওপরে ঋণ গ্রহণ করেছেন এমন গ্রাহকের ঋণতথ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সাধারণত প্রতি মাসে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে এক কোটি টাকা বা এর ওপরে ঋণগ্রহীতাদের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি সংগ্রহ করে। আর ৫০ হাজার টাকা থেকে এক কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণগ্রহীতাদের তথ্য প্রতি তিন মাস অন্তর সংগ্রহ করা হয়।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে এ রকম ২০ লাখ ঋণগ্রহিতার তথ্য মজুদ রয়েছে। আগে ব্যাংকগুলো ঋণতথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আসতো। এখন সিআইবি অনলাইন হওয়ায় ব্যাংক ঘরে বসেই ঋণখেলাপির তথ্য যাচাই-বাছাই করেন।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বড় ঋণখেলাপিরা এখন উচ্চ আদালতে রিট করে ঋণখেলাপির তালিকা থেকে সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিতাদেশ নিচ্ছেন। এর ফলে ব্যাংকের ঋণ আদায় বাড়ছে না। আবার ওই একই ব্যক্তি অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিচ্ছেন। এতে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। এমন অভিযোগও রয়েছে, ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের উচ্চ আদালতে যেতে প্ররোচিত করছেন।

এ সূত্র জানিয়েছে, ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে ঋণ সমন্বয় করা হচ্ছে অহরহ। যে ব্যাংকেই তদন্ত করা হচ্ছে ওই ব্যাংকেই এমন অভিযোগের প্রমাণ পাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনের পর সতর্ক করে দিয়েছে। কিন্তু এখন উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রাহকরা উচ্চ আদালতে গিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক উদ্বেগ প্রকাশ করে খেলাপিদের আটকাতে বিকল্প পদ্ধতি বের করার উদ্যোগ নিচ্ছে। উচ্চ আদালতে রিট করে ঋণখেলাপির তালিকা থেকে সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিতাদেশ নিলেও তার জন্য এ সময়ের মধ্যে অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা না নিতে পারেন সে পদ্ধতি খোঁজা হচ্ছে।

শেয়ার করুন