আন্দোলনের একাকী এক কাণ্ডারী!

0
60
Print Friendly, PDF & Email

রিজভী, এই নামেই তাকে সবাই চেনে। পুরো নাম রুহুল কবির আহমেদ রিজভী। বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব, দপ্তরেরও মুল দায়িত্বে তিনি। আন্দোলনের এক উজ্জল প্রতীক হয়ে আছেন দলে। সবার প্রেরণা হয়ে থাকা রিজভী এই দলের জন্যই আজ পঙ্গুত্ব বয়ে বেড়াচ্ছেন।

শাণিত বাক্য আর ইতিহাসের নানা পাঠ থেকে রাজনীতির শিক্ষণীয় বক্তব্য যার মূল অস্ত্র। নিজের প্রজ্ঞা তুলে ধরেছেন ১/১১’র আজব সরকারের সময়। প্রয়াত মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছায়া উপদেষ্টা ছিলেন তিনি।

দুজনে মিলে চেয়ারপারসনের অনুপস্থিতি আর দলেরই নানা চক্রান্তের জালে থাকা বিএনপিকে আগলে রেখেছিলেন। বিশ্বস্ততা আর কর্মদক্ষতা দিয়ে দেলোয়ারের কাছের হয়েছিলেন, এ নিয়ে দলে ও বাইরে এক ধরনের শক্ত প্রচার ছিল দেলোয়ার-রিজভী গং।

সারাক্ষণ নিট অ্যান্ড ক্লিন থাকা রিজভীর চেহারাতেও নেমে এসেছে ক্লান্তির ছাপ। নির্ঘুম চোখই বলে দেয় তিনি এখন একাকী, চরম একাকী একজন। একটু বাড়িয়ে বললে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পর এখনকার বিএনপির একমাত্র কাণ্ডারী!

দলীয় যেকোনো বিষয়ে এখন সাংবাদিক থেকে শুরু করে তৃণমূল নেতাকর্মীরা চেয়ে থাকছেন রিজভীর দিকে। তিনি কখন চেয়ারপারসনের বার্তা পৌঁছে দিবেন, তার জন্য। দিচ্ছেনও তা-ই। তৃতীয় দফা টানা ৮৪ ঘণ্টার হরতালে সকাল থেকে নয়াপল্টন কার্যালয়ে থেকে তথ্য দিয়ে গেছেন সারা দেশের হরতাল চিত্রের।

বিএনপির দুঃসময়ে পুলিশের কড়া নজরদারি গলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে খেতাব পেয়েছেন ‘জেমস বন্ড’। অথচ অন্য সময়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকে রিজভী নিজেই বসার জায়গা পান না অন্যদের ভিড়ে।

সংবাদ সম্মেলন বিকেল ৪টায়। কিন্তু দলের একান্ত বাধ্যগত নেতাকর্মীরা (তাদের দাবি) দুপুরেই হাজির হয়ে আসন দখল করা সারা। প্রত্যক্ষ উদ্দেশ্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরো কাছে ভিড়ে পদ-পদবি হাতিয়ে নেয়া।

মিট দ্য প্রেসে আসা বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য, অঙ্গ সংগঠনের সহ-সভাপতি, দপ্তর সম্পাদক, সদস্য বা অমুক নেতার পরিচিত ওইসব নেতাদের অন্য সময়ে ভাবখানা এমন- তাদের ছাড়া হবে না সংবাদ সম্মেলন। মির্জা ফখরুল বা রিজভীও তারা পাশে না থাকলে কথা বলতে ভয় পান।

বিভিন্ন সময়ে ওইসব নেতাদের ভিড়ে সংবাদ সম্মেলনে আসা গণমাধ্যমকর্মীদের নির্দিষ্ট আসন পাওয়া সোনার হরিণ হয়ে ওঠে। বিষয়টি বেশ কয়েকবার এসব নেতাকর্মীদের দলের শীর্ষ নেতারা অবহিত করলেও খুব একটা ফল দেয়নি।

জানা গেছে, সংবাদ সম্মেলনে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে থাকলে টিভিতে তা দেখানো হয়। যার অন্যতম উদ্দেশ্য- নিজ এলাকায় ক্ষমতার প্রভাব দেখানো। এভাবে এলাকায় প্রচার করে বেড়ান শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার হট-কানেকশন। আর সুবিধা দেয়ার নামে হাতিয়ে নেন নিজের আখের।

গত ৮ নভেম্বর বিএনপির নেতৃত্বধীন ১৮ দলীয় জোট নির্দলীয় সরকারের দাবিতে তৃতীয় দফা ৮৪ ঘণ্টা হরতাল ডাকে। ওইদিনই রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁর সামনে থেকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিন সদস্যকে আটক করে ডিবি পুলিশ।

এর কয়েক ঘণ্টার মাথায় বিএনপি চেয়ারপারসনের বাসভবনের সামনে থেকে গ্রেপ্তার হন চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুল আউয়াল মিন্টু ও বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস। এরপর গ্রেপ্তার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে বিএনপি শিবিরে। আত্মগোপনে চলে যান দলের বিভিন্ন সারির নেতারা।

গ্রেপ্তার আতঙ্কে বিএনপির অধিকাংশ স্থায়ী কমিটি সদস্য, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সহ-সভাপতি, যুগ্ম-মহাসচিব ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা নিজের মুঠোফোন পর্যন্ত বন্ধ রেখেছেন। তবে সব প্রতিকূলতা মাড়িয়ে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মধ্যরাতের এক দুঃসাহসিক অভিযানে প্রেসক্লাব থেকে অবস্থান নিয়েছেন নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

রবিবার থেকে শুরু হওয়া ১৮ দলীয় জোটের টানা ৮৪ ঘণ্টার হরতালে তাই রিজভী ছাড়া অন্য নেতাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। এবারের হরতালে বিশেষত্ব হচ্ছে- রিজভী ছাড়া বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় নেতাকর্মী শূন্য। তাই হরতালের সার্বিক চিত্র কিছুক্ষণ পরপর রিজভীই জানাচ্ছেন। গ্রেপ্তার আতঙ্কে কোনো নেতাই আসছেন না দলীয় কার্যালয়ে।

সাম্প্রতিক হরতালগুলোতে বিএনপি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব কেন্দ্রীয় কার্যালয়গুলোতে থাকলেও তিনি এখন আত্মগোপনে। দলের অন্য নেতারাও মুখে কুলুপ এটেছেন। দলের চেয়ারপারসনকে ঘিরে রেখেছে পুলিশ-র্যা ব। তাই রুহুল কবির রিজভীকেই এখন ধরতে হয়েছে বিএনপির হাল।

দিনভর দলের পক্ষে একের পর এক বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছেন রিজভী। প্রতিবাদ জানাচ্ছেন সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের। চেয়ারপারসন ও মহাসচিবের নিন্দা থেকে নানা দিবসের বিবৃতি তার মাধ্যমেই পৌঁছে যাচ্ছে গণমাধ্যমে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়া এই রিজভী আহমেদই এখন বিএনপির মূল ভরসা।

শেয়ার করুন