নির্বাচনী ইশতেহার পূরণে ব্যর্থ আওয়ামী লীগ

0
62
Print Friendly, PDF & Email

মহাজোট সরকারের নেতৃত্বে থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জাতির সামনে যে ইশতেহার দিয়েছিল তা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০০৮ সালে ‘দিন বদলের সনদ’ নামে এই নির্বাচনী ইশতেহারে দলটি যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ক্ষমতার শেষে এসে তার সিংহভাগই অপূর্ণ রয়ে গেছে। তাই এ বিষয়টিকে বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।

জানা যায়, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিশাপমুক্ত উন্নত ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দিনবদলের নির্বাচনী ইশতেহার উপস্থাপন করে। ইশতেহারে দলটি আগামী ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উচ্চতম প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার অঙ্গীকার করে। এই স্বপ্নকে সামনে রেখে দলটি ‘ভিশন-২০২১’ বা রূপকল্প-২০২১’ ঘোষণা করে। এছাড়াও ইশতেহারে আরো যেসব অঙ্গীকার ও কর্মসূচি ঘোষণা করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কতগুলি এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।

আওয়ামী লীগের প্রথম অঙ্গীকার ছিল- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ এবং সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এলক্ষ্যে মজুতদারি ও মুনাফাখোরদের সিন্ডিকেট ভাঙা ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে বলে বলা হয়েছিল। বাস্তবিক পক্ষে এর কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে এর নজির সাম্প্রতিক পিঁয়াজের বাজার থেকেই বোঝা যায়।

বিনিয়োগ, জ্বালানি ও রফতানি সহায়তা এবং জনশক্তি রফতানি অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে। এই সময়ে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর অভ্যন্তরীণ সুযোগ-সুবিধার অভাবে শিল্পসহ অনান্য বিনিয়োগ ক্ষেত্রে চরম ব্যর্থতা দেখা গেছে। আর গত এক বছর ধরে একমাত্র মালয়েশিয়ায় সরকারিভাবে কিছু লোক পাঠানো ছাড়া জনশক্তি রফতানিতে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি সরকার।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। রাষ্ট্র ক্ষমতার পুরো সময় জুড়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর আযাচিত সরকারি হস্তক্ষেপ বিগত দিনগুলোর বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে এসেছে। যার ফলে শেয়ারবাজার, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক বা পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় খাতগুলো ধ্বংস করতে সরকার সমর্থিত রাঘব বোয়ালরা ভূমিকা পালন করেছে।

টেন্ডারবাজি, কালো টাকা ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে দলটির কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা তা পারেনি। ছাত্রলীগ-যুবলীগের দুর্দান্ত দাপটের কাছে সাধারণ ব্যবসায়ী বা সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা জিম্মি হয়ে দিন কাটিয়েছে। এর ফলে সাড়া দেশের বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অস্থিরতায় নিমজ্জিত ছিল।

বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির সমস্যা সমাধানে একটি জ্বালানি নীতিমালা গ্রহণ করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। এছাড়া ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস পৌছে দেওয়ার অঙ্গীকারও বাস্তবায়ন হয়নি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দেওয়া হলেও তা শুধু কাগজে কলমেই দেওয়া হয়েছে। বাস্তবে গত পাঁচ বছর ধরেই পুরো বিচার বিভাগকে দলীয়করণ ও আইন আদালতকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদকে অধিক কার্যকরী করার অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে তা করা হয়নি। পুরো মেয়াদ জুড়েই বিরোধী দলকে বিভিন্ন ইস্যুতে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে বিরোধী দল সংসদ থেকে দূরে থেকেছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সম্পদের হিসাব প্রতিবছর জনসম্মুখে প্রকাশ করার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত তা করা হয়নি।

দলীয়করণমুক্ত ও অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার করলেও তা করেনি আওয়ামী লীগ। প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে যোগ্য, মেধাবীদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। এছাড়া ভিন্ন মতাবলম্বী কর্মকর্তাদেরকে ওএসডি করাসহ নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে। সবক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যশীলদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বেকারত্বের হার কমানো, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ঘরে ঘরে চাকরি দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা পারেনি সরকার।

১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানো হবে বলা হলেও পরবর্তীতে তা অস্বীকার করা হয়েছে। প্রায় সরকারের পুরো মেয়াদ জুড়েই চালের বাজার অস্থির থাকতে দেখা গেছে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু, পুষ্টি, শিশু ও মাতৃমঙ্গল নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির অনুকূলে সরকারি হিসাবে নতুন পুরাতন মিলিয়ে মাত্র ১২ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু বা সংস্কার করা হয়েছে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্য প্রবাহ সুনিশ্চিত ও সংরক্ষণ, সব সাংবাদিক হত্যার সুষ্ঠু বিচারের ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে তা দেখতে পায়নি দেশের সাংবাদিক সমাজ। সাগর রুনির মতো অসংখ্য সাংবাদিককে হত্যা, নির্যাতন করা হয়েছে উল্লিখিত সময়ে। এছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করার নামে আমার দেশ, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভির মতো অসংখ্য গণমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সকল বিতর্কের উর্ধ্বে রাখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বর্তমান সরকারের ক্ষমতার শুরুতেই পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ সংগঠিত হয়েছে। যেখানে সেনাবাহিনীর বহু কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়েছে। বর্তমানে এই মামলাটির বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হলেও বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে দেশি বিদেশি বিভিন্ন মহলে সমালোচনা চলছে। এভাবে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকলেও তার সঠিক বাস্তবায়নে তেমন অগ্রগতি দেখাতে পারেনি আওয়ামী লীগ।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রাইমনিউজ.কম.বিডিকে বলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহার পূরণতো করেইনি, করেছে তার ঠিক উল্টোটা। তিনি বলেন, ইশতেহারে ট্রানজিট বা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের কোনো বিষয় উল্লেখ ছিল না। এছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের বিষয়ও ছিল না। অথচ ক্ষমতায় বসেই তারা বাকশাল কায়েমের উদ্দেশ্যে এসব বিতর্কিত কাজকর্ম করা নিয়ে অধিক ব্যস্ত ছিল।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু এবং তোফায়েল আহমেদের কাছে জানতে চাইলেও তারা কিছু বলতে চাননি। মোবাইল ফোনে প্রাইমনিউজ.কম.বিডিকে তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে থাকায় এ বিষয়ে পরে কথা বলবেন।
উৎসঃ   প্রাইমনিউজবিডি

শেয়ার করুন