রাজনৈতিক অস্থিরতায় মুদ্রাপাচারকারীরা সক্রিয়!

0
31
Print Friendly, PDF & Email

রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও দেশের অনিশ্চিত গন্তব্যে অর্থনীতির সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের অপর্যাপ্ততা, ব্যাংকগুলোতে আর্থিক অনিয়ম ও ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদের হার থামিয়ে দিচ্ছে অর্থনীতির গতিপথ। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু, তারপরও অস্বাভাবিক হারে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হচ্ছে। এটি আসলে এলসি খোলা নাকি বিদেশে মুদ্রাপাচার, এনিয়ে সংশ্লিষ্টদের সংশয়ে ফেলে দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শুধু গত আগস্টেই প্রায় ৪৩ কোটি মার্কিন ডলারের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা (এলসি) হয়েছে। যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৩ শতাংশ বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, দেশে এখন বড় কোন বিনিয়োগের পরিবেশ নেই। এ পরিস্থিতিতে অস্বাভাবিক হারে মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানির আড়ালে বিদেশে মুদ্রা পাচার করা হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০০৫ সালের পর কোন একক মাসে কখন ৪০ কোটি ডলারের ওপরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র স্থাপন করা হয়নি। গত ২০১০ সালের আগস্টে মূলধনী যন্ত্রপাতি সর্বোচ্চ আমদানি হয়েছিল ৩৫ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের। চলতি বছরের শুরু থেকেই মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানির জন্য ঋণপত্র স্থাপন বেড়ে যাচ্ছে। গত এপ্রিলে ৪৪ কোটি প্রায় ৫৪ লাখ মার্কিন ডলারের পণ্য আমদানির জন্য ঋণপত্র স্থাপন করা হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২২০ শতাংশ বেশি। আর গত আগস্টে প্রায় ৪৩ কোটি ডলারের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র স্থাপন করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৫ কোটি ডলারের।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এটা অস্বাভাবিক। কারণ বিনিয়োগের পরিবেশ যখন স্বাভাবিক ছিল তখনও এক মাসে এ পরিমাণ পণ্য কখন আমদানি হয়নি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, বেশি ঋণপত্র খোলা হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে। গত মার্চে ১৯ ধরনের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রাংশই আমদানি হয়েছে ২৬ কোটি ৮৬ লাখ মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার দেড় শ’ কোটি টাকার। বিনিয়োগ মন্দার সময় মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়াকে অনেকেই সরকারের শেষ সময়ে বিদেশে মুদ্রা পাচারের কায়দা বলে সন্দেহ করছেন। তাদের মতে, যখন দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ ছিল তখনও এক মাসে এ পরিমাণ পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়নি।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রথমদিকে খুব বেশি গুরুত্ব না দিলেও বর্তমানে বিভিন্ন মহল থেকে আপত্তি উঠায় উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে এলসি খোলার বিষয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিবেশে কেউ বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে না। অনেকেই নতুন বিনিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নির্বাচনকালীন সরকার শেষে তারা বিনিয়োগে আসবে। সাধারণত মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির দায় পরিশোধের সময় পায় সর্বোচ্চ এক বছর। এর বেশি সময় হলেই বিনিয়োগ বোর্ড ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। অপর দিকে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল ছাড়া অন্য সব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বাকিতে এলসি খুলতে পারে না। এ ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়; কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে অনেকেই বাকিতে পণ্য এলসি খোলার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিচ্ছে।
এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানির এলসি বেড়েছে যথাক্রমে ১৬ দশমিক ৩২ শতাংশ ও ১৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ। একই সঙ্গে বেড়েছে পেট্রোলিয়াম ও খাদ্যপণ্যের আমদানিও। তবে এ সময়ে আমদানি পণ্যের সার্বিক ঋণপত্র (এলসি) খোলার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ। আর এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ, যা ৪৭ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থউপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, আমদানি পণ্যের এলসি খোলার পরিমাণ বৃদ্ধি ইতিবাচক। তবে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আমদানিকৃত পণ্যগুলো ব্যবহার হবে কিনা সে বিষয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। কারণ এখন আমদানি হওয়া পণ্যগুলো ব্যবহারের বদলে মজুদ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

তিনি বলেন, ডলারের বিনিময় হার কম হওয়াতে উদ্যোক্তারা আমদানিতে মনোনিবেশ করতে পারেন। এজন্য ভবিষ্যতে ডলারের দাম আরও বাড়তে পারে। এছাড়া রাজনৈতিক পরিবেশ ভালো হলে অনেকে বিনিয়োগ বাড়াতে পারেন। এজন্য আগেভাগে আমদানি করে মজুদ বাড়াচ্ছেন।

শেয়ার করুন