ভারতের একপেশে সমর্থনে সরকার বেপরোয়া

0
75
Print Friendly, PDF & Email

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটকে মহাসঙ্কটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের একপেশে ভূমিকা। দেশটি তাদের নিজেদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের জন্য ‘জঙ্গি-জুজু’র ভয় দেখিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়িয়েছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত উপেক্ষা করে নির্দলীয় সরকারের বিরুদ্ধে ভারতীয় অবস্থান ক্ষমতাসীন মহাজোট নেতৃত্বকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লষকরা। এতে আন্দোলন দমনে নির্বিচারে হত্যা, নির্যাতনের পথ বেচে নিচ্ছে সরকার। পশ্চিমা দেশগুলো সব দলের অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে তাগিদ দিলেও ভারতের অবস্থান বিপরীত মেরুতে। তারা যেনতেনভাবে একটি প্রহসনের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারকে ফের ক্ষমতায় দেখতে চায়। পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের সব জাতীয় নির্বাচনে ভারতের পরোক্ষ প্রভাব থাকলেও অতীতে কখনোই এমন দলান্ধ ও নগ্ন একপেশে ভূমিকা নেয়নি দেশটি।
অবশ্য এ প্রেক্ষিতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও তাদের ভারতনীতি পুনর্মূল্যায়ন করতে শুরু করেছে। এর আগে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে ভারতবিরোধী কার্ড আর ব্যবহার না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছিলেন, ভারত কোনো বিশেষ দলের সঙ্গে নয়—দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়। ফলে সাম্প্রতিক অতীতে বিএনপিও ভারতের ব্যাপারে কিছুটা উদারনীতি গ্রহণ করে। কিন্তু নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের একচোখা নীতিতে বিএনপি নেতৃত্ব ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত। গতকাল বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেছেন, ভারতের রাজধানীতে বসে বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করা যাবে না। বাংলাদেশের ভাগ্য দেশের জনগণই নির্ধারণ করবে।
রাজনৈতিক বিশেল্গষক ড. পিয়াস করিম এ প্রসঙ্গে আমার দেশ-কে বলেন, আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদ্যমান রাজনৈতিক সঙ্কট উত্তরণে প্রধান অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে ভারতের একপেশে ভূমিকা। তারা দলবিশেষকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখে নিজের আধিপত্যবাদী মনোবাসনা পূরণ করতে চায়। ভারতের কায়েমি স্বার্থবাদী এ ভূমিকা বাংলাদেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মোকাবিলা করতে হবে বলে ড. পিয়াস করিম উল্লেখ করেন।
প্রসঙ্গত, বর্তমান সরকারের অবস্থানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওবামার কাছে দূতিয়ালি করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় মনমোহন সিং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামার কাছে তার উদ্বেগের কথা জানান। মনমোহন সিংয়ের ওই উদ্বেগের প্রেক্ষিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার পররাষ্ট্র কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের সঙ্গে পরামর্শ বাড়ানোর আদেশ দেন। তিনি এজন্য যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্র কর্মকর্তাদের নয়াদিল্লির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বলেছেন বলে ভারতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা পিটিআইকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন ছেপেছে ইকোনমিক টাইমস। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্টের রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনার সাম্প্রতিক নয়াদিল্লি সফরও ওই প্রক্রিয়ারই অংশ বলে গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।
ওবামার নির্দেশের পর বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সুসান রাইস ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেননের সঙ্গে আলোচনা করেন বলেও জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে জানিয়ে দিয়েছে, তারা বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায়। আর নির্বাচনের ফলাফল কী হবে তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মাথাব্যথা নেই।
বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা সভা করে বর্তমান সরকারের একগুঁয়ে অবস্থানকে সমর্থন করতেও দেখা যাচ্ছে দিল্লিকে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র আরও বিকশিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলে দিল্লিতে বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বলা হয়, অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে হলে ভারতের বিশালত্বকে ‘সুবিধাজনক’ দৃষ্টিতে দেখার পাশাপাশি বাংলাদেশকে ধর্মীয় মৌলবাদের মোকাবিলাও শক্তহাতে করতে হবে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যামশরণ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত দুই সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি ও পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী ওই আলোচনা সভায় বেশ খোলামেলাভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুরে সুর মেলান। তারা বলেন, বাংলাদেশ এখন যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে মৌলবাদের মোকাবিলাই তাদের রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা ঠিকমত করতে না পারলে কয়েক বছর ধরে উন্নয়নের যে ধারা অব্যাহত আছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার এ অঞ্চলও অশান্ত হয়ে উঠবে। দ্য সোসাইটি ফর পলিসি স্ট্যাডিজ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে আয়োজিত এ গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশ থেকেও কয়েকজন আওয়ামী বুদ্ধিজীবী যোগ দেন।
বীণা সিক্রি বেশ আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলেন দেশের ইসলামপন্থী দলগুলো সম্পর্কে। তিনি বলেন, জামায়াত ও হেফাজত বাংলাদেশে অস্থিরতা আনতে চাইছে, তারা জঙ্গি ইসলামি শাসন কায়েম করতে চায়। সেজন্য তারা মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখতে চায়। বিএনপির শাসনামলেও জামায়াত এ কাজই করেছে।
পিনাক রঞ্জন বলেন, বাংলাদেশের বিষয়ে ভারত কিছু করুক বা না করুক, সে দেশের রাজনৈতিক আবহে ভারত সবসময়ই একটা বড় ‘ফ্যাক্টর’। ভারত তার মনোভাবের পরিবর্তন ঘটিয়ে এ ফ্যাক্টরের চরিত্রও বদলে দিয়েছে। খালেদা জিয়া বার বার অপমান করা সত্ত্বেও তার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করেছেন। এ মনোভাবের ব্যাখ্যাতেই শ্যামশরণ বলেন, প্রতিবেশীদের উপেক্ষা করে যে বড় শক্তি হওয়া যায় না, ১৯৯০-এর পর ভারত তা বুঝেছে। সে কারণেই বাংলাদেশ আজ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় দোসর। ভারতের বিরুদ্ধে দাদাগিরির অভিযোগও আগের মতো আর ওঠে না।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কী করতে পারে, না পারে—তার ভবিষ্যদ্বাণীও করা হয়েছে দিল্লিতে। গোলটেবিল আলোচনায় বাংলাদেশের বিদ্যমান টালমাটাল অবস্থায় সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন ভারতীয় কূটনীতিকরা। পিনাক বলেন, এ প্রবণতা দূরীকরণে জাতিসংঘের অবদান প্রবল। তাদের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে বাংলাদেশী সেনাদের অংশগ্রহণের আগ্রহ এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত পাঁচ বছরে ভারতকে কতটা তুষ্ট করতে পেরেছেন, তার প্রমাণ মেলে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার শিনেধর বৃহস্পতিবারের বক্তব্যে। তিনি শেখ হাসিনাকে ‘ভারতের আপনজন’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, পাঁচ বছর শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ঢাকা যেভাবে ভারতকে সহযোগিতা করেছে, তার প্রতিদান দিতে দিল্লিও বদ্ধপরিকর। বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্তে জয়েন্ট রিট্রিট উদ্বোধনকালে ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্যে স্পষ্টতই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ভারতের একপেশে মনোভাব নগ্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ভারতীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘দু’দেশের বন্ধুত্বের কথা বলতে গেলে শেখ হাসিনাজির কথা বলতেই হয়, তিনি যেন এই বাংলারই মেয়ে। আমাদের অত্যন্ত আপনজন। ভারত নিশ্চয়ই তার প্রতিদান দেবে।’
এদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান দুই গুরুত্বপূর্ণ দেশ ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র চলমান সঙ্কট নিরসন প্রশ্নে বিপরীত মেরুতে অবস্থান নেয়ার খবর এখন পুরনো। মূলত সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনার ভারত সফরের পর এটা বেশ খোলাসা হয়ে যায়। ওই সফরের ফলাফল তথা ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে মজীনার আলাপচারিতা কূটনৈতিক অঙ্গনে এখন আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু। বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে অর্থাত্ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পক্ষে অবস্থানের কথা জানিয়েছে ভারত। শেখ হাসিনার অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি অংশ নেবে না—এটা জেনেও ভারত তাদের অবস্থান ব্যক্ত করেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাছ থেকে অনেক প্রাপ্তি এবং এ সরকারের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককেই গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশ এবং জাতিসংঘ সব দলের অংশগ্রহণমূলক একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে। তারা চায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার হুবহু না হলেও ভিন্নমাত্রিক নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন করতে।

শেয়ার করুন