পাল্টাপাল্টি কৌশলের ফাঁদে আটকা সংলাপ

0
49
Print Friendly, PDF & Email

পরস্পরকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে পাল্টাপাল্টি কৌশলের কারণেই সংলাপ বারবার আটকে যাচ্ছে। ভেতরে বেশ কয়েকবার বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংলাপ প্রশ্নে তৎপরতা চলেছে। অন্তত দু’বার এ নিয়ে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতির কথাও শোনা গেছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে কে লাভবান হবে, এরকম প্রশ্ন সামনে চলে আসায় শেষ পর্যন্ত সংলাপ প্রশ্নে কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সর্বশেষ গত তিন দিন ধরে সংলাপ নিয়ে সরকারের মধ্যে কাজ করছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী। যে কোনো সময় একটা উদ্যোগ বা ফোন সরকারি দল থেকে যাবে অনানুষ্ঠানিক এমন ‘বার্তা’ বিরোধী দলের কাছে গেছে। এ ধরনের সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে বিরোধী দলও হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কিছুটা দেরি করে। কিন্তু শনিবার সকাল পর্যন্ত কোনো ইঙ্গিত না আসায় বিএনপি তিন দিনের হরতাল ঘোষণা করেছে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, সময় আরও একদিন (আজ) রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণের ফলোআপ হিসেবে রোববারও সরকারি দলের পক্ষ থেকে বিরোধী দলের কাছে ফোন যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর ফোনের মতোই শেষ মুহূর্তের ফোনকে সরকারের কৌশল বলে বিবেচনা করবে বিএনপি। ওই অবস্থায় তারা হরতাল প্রত্যাহার নাও করতে পারে। দলটির নেতাদের মতে, জেএসসি পরীক্ষার জন্য হরতাল বন্ধের কথা বলেও সরকার রাজনীতির কৌশল করছে। তাই পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তির কথা প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু বিরোধী দলের পেছনে ফেরার পথ নেই। জনগণের ভোগান্তির কথা চিন্তা করলেও সরকারেরই খোলামন নিয়ে সংলাপে এগিয়ে আসা উচিত বলে দলটির নেতারা মনে করেন।
এর আগে আরও দু’দফা সংলাপের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। সরকারি দলের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার আভাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে ফোন করেন ২৬ অক্টোবর। ওইদিন সন্ধ্যা ৬টায় ফোন করে খালেদা জিয়াকে তিনি নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু তার একদিন আগেই ২৫ অক্টোবরের জনসভা থেকে তিনদিনের হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল। যে কারণে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের পরও ঘোষিত হরতাল প্রত্যাহার করা হয়নি। বিএনপির অভিযোগ, বিরোধী দলকে বিপাকে ফেলতে সরকার ওই কৌশল নিয়েছে। আন্তরিকতা থাকলে হরতালের আগেই ফোন করা যেত বলে অভিযোগ তোলেন খালেদা জিয়া । এরপর দুই নেত্রীর টেলিফোন সংলাপ জনসমক্ষে প্রকাশ করা নিয়েও অভিযোগ তোলে বিএনপি। বলা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বিবেচনায় রেখেই ওই ফোন করেন প্রধানমন্ত্রী। আর এ কারণেই তিনি সতর্কতার সঙ্গে কথা বলেন এবং সংলাপটি রেকর্ড করে তা প্রকাশ করা হয়। এর উদ্দেশ্যই ছিল খালেদা জিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা। কিন্তু সরকারের জন্য তা বুমেরাং হয়েছে। ফলে সৎ উদ্দেশ্য ও আন্তরিকতার সঙ্গে সরকারি দল সংলাপ চাইছে একথা বিএনপি এখন আর বিশ্বাস করতে চাইছে না। সবটাই সরকারের কৌশল বলে তারা মনে করছে। এজন্যই চাপে রাখার পাল্টা কৌশল হিসেবে বিএনপিও কর্মসূচি অব্যাহত রাখছে।
সূত্র মতে, এবারও কূটনীতিকদের পরামর্শে মহাসচিব পর্যায়ে সংলাপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য দুই দলেরই তৎপরতার কথা জানা যায়। এমন আভাস পেয়ে বিএনপিও উদ্যোগের জন্য অপেক্ষা করে। যে কারণে ৩০ অক্টোবর বুধবার ১৮ দলীয় জোটের বৈঠকে কর্মসূচি চূড়ান্ত করেও অপেক্ষা করে বিএনপি। কিন্তু আশ্বস্ত হতে না পারায় শেষ পর্যন্ত শনিবার ওই কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর আগে গত মে মাসে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের মধ্যে আলাপের সূত্র ধরে গওহর রিজভীর বাসায় অপেক্ষা করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ড. আবদুল মঈন খান ও ড. ওসমান ফারুক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেত না পাওয়ায় রওনা দিয়েও শেষ পর্যন্ত সৈয়দ আশরাফ পথ থেকে ফিরে যান।
বিএনপি নেতারা বলেন, ওই ঘটনার পর থেকেই তারা ধরে নিয়েছেন, শীর্ষ নেত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া সরকারের অন্য কারও কথার কোনো তাৎপর্য নেই। অথরিটিও নেই। তাদের মতে, খালেদা জিয়ার নির্দেশ ছাড়া অন্য কারও অথরিটি বিএনপিতেও নেই। তাই খালেদা জিয়ার কথা ছাড়া এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত হতেও রাজি নন।
প্রবীণ রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মতে, হরতালের রাজনীতির কারণেই সংলাপ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের প্রধান নির্বাহী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এখন বিএনপির নিজ উদ্যোগে সংলাপে যোগ দেয়া উচিত।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বাইরে নানা গুঞ্জন থাকলেও বাস্তবে সংলাপ প্রশ্নে সরকার আন্তরিক নয়। তাই তারা একেক সময় একেক কৌশল নিয়ে সংলাপ সংলাপ ভাব করছে। উদ্দেশ্য হল কালক্ষেপণ করে বিরোধী দলকে বিপাকে ফেলা। এ জন্য তাদেরই প্রমাণ করতে হবে যে, সত্যিকার অর্থে তারা সংলাপ চান।

শেয়ার করুন