জামায়াতের নিবন্ধনের রায় প্রকাশ- বিচারপতি মোয়াজ্জামের ভিন্নমত

0
46
Print Friendly, PDF & Email

জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। ১৫৮ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের মতের ভিত্তিতে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষিত হয়েছে। তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন। তিনি রায়ে লিখেছেন, জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে করা রিট গ্রহণযোগ্য নয়। আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, দলটির নিবন্ধনের বিষয় নির্বাচন কমিশনকে নিষ্পত্তি করার নির্দেশনা দিয়ে রুল নিষ্পত্তি করলে ন্যায়বিচার হবে। এ জন্য যুক্তিযুক্ত দ্রুত সময়ে আইন অনুসারে জামায়াতের নিবন্ধন ইস্যু নিষ্পত্তি করতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের পক্ষে মূল রায়টি লেখেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক। তিনি তার রায়ে বলেন, জামায়াত এবং নির্বাচন কমিশন যুক্তি দেখিয়েছে, নিবন্ধনটি সাময়িক ছিল। কিন্তু সাময়িক নিবন্ধন দেয়া যায় বলে আমরা কোন বিধান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে পাইনি। নিবন্ধন সনদের সাময়িক নিবন্ধন বলে কোন বিষয় আমরা পাইনি। ২০০৮ সালের ৪ঠা নভেম্বর জামায়াতকে দেয়া নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং এর কোন কার্যকারিতা নেই। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের সঙ্গে একমত পোষণ করে নিজের কিছু মত দেন।
গত ১লা আগস্ট হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয় হাইকোর্ট। তবে দলটিকে সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সার্টিফিকেট দেয় হাইকোর্ট। এ সার্টিফিকেট পাওয়ায় জামায়াতকে এখন আর লিভ টু আপিল দায়ের করতে হবে না। আপিল বিভাগে সরাসরি আপিলের শুনানি হবে। সংবিধানের ১০৩ (২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘হাইকোর্ট বিভাগের রায়, ডিক্রি আদেশ বা দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের নিকট সেই ক্ষেত্রে অধিকার বলে আপিল করা যাইবে, যে ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগ-ক) এই মর্মে সার্টিফিকেট দান করিবেন যে, মামলাটির সহিত এই সংবিধান ব্যাখ্যার বিষয়ে আইনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত রহিয়াছে।’ তবে নিবন্ধন হারালেও রাজনীতি করার অধিকার হারায়নি জামায়াত। এ রায়ের পর নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি দেখে জামায়াতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে কমিশন। ওই রায় স্থগিত চেয়ে দলটির করা আবেদন আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতির আদালত খারিজ করে দিয়েছিল।
বিচারপতি এম মোয়াজ্জামের ভিন্নমত: বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন তার রায়ে রিট আবেদনকারীদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জামায়াতের নিবন্ধনের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান আইনি নয়, বরং আবেগপ্রবণ। একই সঙ্গে আবেদনকারীরা তাদের আবেদনে এটা উল্লেখ করেননি যে, আবেদনকারীদের মধ্যে ১, ২ এবং ১৪ নাম্বার একই ধরনের সাংবিধানিক অযোগ্যতা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গেই নিবন্ধনকরণ দৌড়ে অংশ নেয় এবং নিবন্ধন লাভ করে। তারা এটাও বলেননি যে, জামায়াতের মতোই যোগ্যতা নিয়ে খেলাফত আন্দোলনও নিবন্ধন লাভ করেছে। এতে প্রমাণ হয় আবেদনকারীরা পরিষ্কার হাতে আদালতে আসেননি এবং তার উদ্দেশ্য সৎ নয়। রায়ে বলা হয়েছে, এ মামলার রেকর্ড এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদিতে নিবন্ধনের নতুন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগে নির্বাচন কমিশনকে হিমশিম খেতে হয়েছে এবং তাদেরকে আইন ও নীতির অনুসরণ করতে হয়েছে। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে জামায়াতসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দিতে হয়েছে। এটা স্বীকার করতে হবে জামায়াত তখন একটি প্রধান রাজনৈতিক জোটের অংশ ছিল। এরপর সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়। এরপর নির্বাচন কমিশন তাদের সিদ্ধান্ত রিভিউ শুরু করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধনে তাগিদ দেয়া শুরু করে। আবেদনকারীদের মামলা জামায়াতের ধর্মীয় চরমপন্থা, জঙ্গিবাদ এবং জিহাদের দিকে ইঙ্গিত করে। নিঃসন্দেহে এসব বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। জামায়াতের যেসব রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার কথাও বলা হয়েছে তার সবই পুরনো এবং কোনটিই নতুন নয়। এত বছর পর এ নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি এম মোয়াজ্জাম হোসেন।
দুই বিচারপতি মতে নিবন্ধন অবৈধ: জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণার পক্ষে মূল রায় লেখেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক। তিনি লিখেছেন, আইনের বিধানমতে এটা স্পষ্ট যে, জামায়াতে ইসলামীকে অযোগ্য গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে নিবন্ধন দেয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের ছিল না। যেহেতু দলটিকে এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে নিবন্ধন দেয়া হয়েছে তাই দলটির গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে বলার এখতিয়ারও নির্বাচন কমিশনের ছিল না। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম লিখেছেন, জামায়াতে ইসলামী তর্কিত নিবন্ধনটি হাসিলের জন্য নির্বাচন কমিশনে প্রবঞ্চনা বা প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল। অতএব, ওই নিবন্ধনটি অশুদ্ধ ও অকার্যকর।
পূর্বাপর: বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী, জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সি আবদুল লতিফ, আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান-এর সভাপতি হুমায়ূন কবির, সম্মিলিত ইসলামী জোটের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হাসানসহ ২৫ ব্যক্তি ২০০৯ সালে জামায়াতের নিবন্ধনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট আবেদন দায়ের করেন। ২০০৯ সালের ২৭শে জানুয়ারি বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক (পরে প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি মো. আবদুল হাইয়ের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ নিয়ে রুল জারি করে। ৬ সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়। রুলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯০বি(১) (বি) (২) ও ৯০(সি) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়। জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মো. মুজাহিদ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। গত এপ্রিলে হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চে এ রুলের ওপর শুনানি শুরু হয়। রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এম কে রহমান এবং ইসি’র পক্ষে সিনিয়র এডভোকেট মহসিন রশিদ শুনানি করেন। অন্যদিকে, জামায়াতের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এবং ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন। শুনানিতে ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর বলেছিলেন, জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্র ইসলামের প্রথম সংবিধান মদিনা সনদ, বাংলাদেশের সংবিধান ও জনগণের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তারা কাদিয়ানিদেরকে মুসলমান মনে করে না। বিভিন্ন সুফি সাধকদেরকে মুসলিম বলে মনে করে না। অন্যদিকে, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যুক্তি দেখান, অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। তাই রিট আবেদনটি চলতে পারে না। দেশের আরও অনেক রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে একই ধরনের বিধান থাকলেও ওই সব দলের বিরুদ্ধে কোন রিট আবেদন করা হয়নি। জামায়াতের গঠনতন্ত্রে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোন কিছু নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

শেয়ার করুন