তিস্তা চুক্তি আর হলো না

0
49
Print Friendly, PDF & Email

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বহুপ্রত্যাশীত তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি এ সরকারের আমলে আর হলো না। আওয়ামী লীগের ভারতের সম্পর্ক ভালো সে যুক্তিতে সবাই আশা করেছিল বাংলাদেশের জনগণের এ প্রত্যাশাটা এবার পূরণ হবে। তাদের পাঁচ বছরে যখন হলো না তখন ভবিষ্যতে এ চুক্তি হওয়া অনেকটা অনিশ্চিত।

তবে বাংলাদেশে আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে রাজনৈতিক ডামাডোল চলছে তা ভারতের রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। শুধু তাই নয় ভারতেও ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় নির্বাচন। কংগ্রেস সরকার ওই নির্বচনী বৈতরণী পার হতে এখনই তিস্তা চুক্তির বিতর্কিত বিষয় সামনে আনবে না এটা প্রায় নিশ্চিত।

এরমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশকে তাদের প্রাপ্ত পানির চেয়ে বেশি পানি দেয়া হচ্ছে। এটা করছেন খোদ ভারতীয় অসাধু কর্মকর্তারা।

২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ঢাকা সফরে আসেন। ওই সফরে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পাঁচ মুখ্যমন্ত্রীরও বাংলাদেশ সফরে আসার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বেঁকে বসেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশ সফরে আসতে অস্বীকৃতি জানান এবং তিস্তা চুক্তিরও বিরোধিতা করেন। ফলে সব প্রস্তুতি সত্ত্বেও তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি।

এরপরও ওই সময় থেকে বাংলাদেশ তিস্তা চুক্তি করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতির আলোকে বিশেষ করে আগামী নির্বাচনে ভোটের সমীকরণ বিবেচনা করে তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি কারার অনুরোধ করেন ভারত সরকারকে। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি।

তিস্তা নদীর পনি বণ্টন চুক্তি হবে কি না এ প্রশ্নে বাংলামেইলকে পানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এন আই খান বলেন, ‘তিস্তা চুক্তির সম্ভাবনা জিরো। তিস্তা চুক্তি হোক এটা কোনো দিনই ভারত চায় না। কারণ বলা হয়, কেন্দ্রীয় সরকার চুক্তি চায় আর প্রদেশিক সরকার সেটা চায় না। এটা হতে পারে না। তাই তিস্তা চুক্তি ভারতের একটি গেম প্লে ছাড়া কিছুই নয়। তিনি বলেন, ‘তিস্তার পানি পেতে হলে জাতিসংঘে যেতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশ কোনো দিনও পানি পাবে না।’

এন আই খান বলেন, ‘তিস্তা নদী চীন থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে এসেছে। এই নদীতে সিকিম তিনটি ও পশ্চিমবঙ্গ তিনটি বাঁধ দিয়েছে। এই নদীর আরো ২০টি উপনদীতে বাঁধ দিয়েছে ভারত। এই উপনদী থেকে তিস্তায় পানি আসে। এর ফলে তিস্তায় পানি প্রবাহ কমে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ।’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়ের অভিযোগ সম্পর্কে এই পানি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বাংলাদেশকে বেশি পানি দেয়া হচ্ছে এটা ঠিক নয়। প্রাকৃতিকভাবেই ভারত ৬ হাজার ৫শ’ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি পায়। কিন্তু এই দেশটির প্রয়োজন মাত্র ৯শ’ বিলিয়ন কিউবিক মিটার পানি। এরপরও বাংলাদেশকে পানি দিচ্ছে না ভারত। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইন অনুয়ায়ী তিস্তার পানি পাবে বাংলাদেশ।’

এদিকে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সীমান্ত চুক্তি, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি, সীমান্ত হত্যা ও নির্যাতন এবং ট্রানজিট নিয়ে বৈঠকের পর বৈঠক হয়েছে। কিন্তু ভারত অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দোহাই দিয়ে কোনকিছুই বাস্তবায়ন করেনি।

কূটনীতিকরা বলছেন, ভারত কোনো কথা না রাখায় বাংলাদেশও ট্রানজিট চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কূটচালে হারিয়ে যেতে বসেছে। কেন্দ্রের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন পশ্চিমঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং আসামের দু’জন এমপি। ফলে দৃশ্যত কংগ্রেস ‘রাজি’ থাকলেও শেষ পর্যন্ত চুক্তিগুলো আলোর মুখ দেখল না। আর সীমান্ত হত্যা বন্ধে বাংলাদেশ-ভারত বিভিন্ন সময় আলোচনা হলেও মূলত ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশিদের হত্যা-নির্যাতন করেই যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রদূত এসএম রাশেদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এটা হলো আমাদের পররাষ্ট্রনীতির চরম ব্যর্থতা। ভারতের সঙ্গে আমাদের সবকিছু এক তরফা হয়ে যাচ্ছে। আমরা সব দিয়ে দেব বিনিময়ে কিছুই পাব না তা হতে পারে না। কূটনীতি সবসময় উইন-উইন হতে হবে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আমাদের কূটনীতি একতরফা, ভারসাম্যহীন। সীমান্ত চুক্তি ও তিস্তা চুক্তির বিষয়ে ভারত বলছে তৃণমূল কংগ্রেস কথা শুনছে না। এটা তো হতে পারে না।’

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি নদী আন্তঃদেশীয় বা অভিন্ন নদী হিসেবে চিহ্নিত। তবে ব্রিটিশ আমল থেকেই গঙ্গা নদীর উপনদীগুলোয় সেচের জল সরিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে বাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন বিষয়ে ১৯৫২ সাল থেকে আলোচনা শুরু হলেও ষাটের দশকে গঙ্গা নদীর পানিবণ্টনের বিষয়টি চলে আসায় তা পিছিয়ে যায়।

ভারত ১৯৭৫ সালে গঙ্গার ওপর ফারাক্কা বাঁধ চালু করে। এরপর গঙ্গার প্রবাহ এর মূল শাখা পদ্মায় যেতে না দিয়ে ভারত এর সিংহভাগ ভাগিরথীতে চালান করা শুরু করে। এর ফলে শুকনা মৌসুমে গঙ্গা নদীর ভাটিতে পানি কমতে থাকে ও বাংলাদেশের ভেতরে বড়াল, ইছামতী, মাথাভাঙ্গা ইত্যাদি বড় বড় শাখা নদী মরতে থাকে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৭৭ সালে প্রথম গঙ্গা পানিচুক্তি স্বাক্ষর হয়। এ চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ন্যূনতম ৩৪ হাজার ৫০০ কিউসেক পানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়া ছিল। কিন্তু ১৯৮২ সালের পর কোনো চুক্তি না থাকায় ফারাক্কা দিয়ে পানি আসা কমে যায়। এরপর ১৯৮২ এবং ১৯৮৫ সালে দুটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় কিন্তু তাতে কোনো ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল না। ওই সময় ভারতের প্রস্তাব ছিল বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে একটি খাল কেটে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফারাক্কার উজানে ফেলে পানির ঘাটতি মেটাতে হবে। কিন্তু এতে লাখ লাখ মানুষকে ঘড়বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে হতো এবং পরিবেশ বিপর্যয় হতো। বাংলাদেশ এই প্রস্তাবে সায় দেয়নি। ফলে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায় এবং ১৯৯৬ পর্যন্ত কোনো নতুন চুক্তি হয়নি।

১৯৯৬ সাল নাগাদ বাংলাদেশের প্রবাহ ১০ হাজার কিউসেকেরও নিচে নেমে আসে। ১৯৯৬ সালে যে চুক্তি হয়, তাতে সর্বনিম্ন ২৭ হাজার ৬৩৩ কিউসেক পানির কথা বলা হয়। কিন্তু কোনো গ্যারান্টি না থাকায় প্রায় বছরই এ চুক্তির কোনো সুফল পাওয়া যায় না।

২০০০ সালের আগে ও পরবর্তী সময়ে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কথা ছিল, নদীকে বাঁচানো দরকার। সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে অধিক খাদ্য ফলানোর নামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাঁধ নির্মাণ করে নদীর অধিকাংশ প্রবাহ সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাঁধের ভাটিতে মূল নদীর প্রবাহে কিছুই অবশিষ্ট থাকছে না। এর ফলে নদীনির্ভর ভাটি অঞ্চলের জলজ জীব, মানুষ, পশু ও গাছপালা অস্তিত্বের হুমকির মধ্যে পড়ছে। তাই বলা হলো, শুকনো মৌসুমে ২০ শতাংশ প্রবাহ নদীর প্রাণ হিসেবে বিবেচনা করে তাতে কেউ হাত দেবে না। আরো বলা হলো, তিস্তা নদীর চুক্তিতে এ বিষয়টি যুক্ত করে বাকি ৮০ শতাংশ প্রবাহ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সমানে ভাগ করা হোক। ফলে বাংলাদেশ বাস্তবে পেতে পারে ৬০ শতাংশ এবং ভারত পাবে ৪০ শতাংশ পানি।

১৯৯৬ সালে গঙ্গা পানিবণ্টনের দ্বিতীয় চুক্তির সময় তিস্তা নদীর পানিসহ ধরলা, দুধকুমার, মনু, খোয়াই, গোমতী, মুহুরী এবং অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের বিষয়ও উঠে আসে।

শেয়ার করুন