সোনালী ব্যাংকের সাত হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির অনুসন্ধানে দুদক

0
42
Print Friendly, PDF & Email

হলমার্ক গ্রুপের পর আবার সোনালী ব্যাংকের আরো ১০ শাখার বিরুদ্ধে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের উপ-পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি দল ইতিমধ্যে অনুসন্ধানী কার্যক্রম শুরু করেছেন। নাম না প্রকাশের শর্তে এক কর্মকর্তা নতুন বার্তা ডটকমকে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

দুদকের এই অনুসন্ধী দলের কর্মকর্তারা প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে সোনালী ব্যাংকের হোটেল রুপসী বাংলা শাখা, গুলশান শাখা, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ শাখা, রমনা করপোরেট শাখা, আগারগাঁও শাখা, লোকাল অফিস, চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ করপোরেট শাখা, লালদীঘি করপোরেট অফিস, খাতুনগঞ্জ করপোরেট শাখা এবং নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখার বিরুদ্ধে সংঘটিত ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু করেছেন।

২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত উল্লিখিত সোনালী ব্যাংকের ওইসব শাখার বিরুদ্ধে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ পরিদর্শন ও তদন্ত প্রতিবেদনেও ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বৈদেশিক বাণিজ্যের নামে ও ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে অনিয়ম ধরা পড়েছে। ডিমান্ড লোন ও ফার্সড লোন সৃষ্টির মাধ্যমেও অনিয়ম করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সোনালী ব্যাংক লোকাল অফিসের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, কেএনএস ইন্ডাস্ট্রিজ, ক্যাংসান ইন্ডাস্ট্রিজ, থারমেক্স টেক্সটাইল, ইকো কটন মিলস, রহিমা ফুড করপোরেশন নামের কোম্পানিগুলো প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটি টাকা লোপাট করেছে। আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য পরিশোধ না করেই তা খালাস করে নেন আমদানিকারকরা। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, মূল্য পরিশোধ না করা পর্যন্ত আমদানিকৃত পণ্য ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা।

মের্সাস অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজের হিসাবে ২০১০ সালে ৩৪ কোটি ও ২০১১ সালে ৯২ কোটি টাকার ডিমান্ড ঋণ নেয়। মেসার্স এপেক্স উইভিং অ্যান্ড ফিনিশিং মিল ২০০৯ সালে ৩ কোটি, ২০১০সালে ১৯ কোটি ও ২০১২ সালে ৮০ লাখ টাকাসহ তিন বছরে ৭৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকার ঋণ নেয়।

মেসার্স পদ্মা পলি কটন নিট ফ্যাব্রিক্স ২০০৮সালে ৩৬ কোটি, ২০১০সালে ৩৫ কোটি ১৬ লাখ, ২০১২ সালে ৪৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকার ডিমান্ড ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ লোপাট করে।

মেসার্স কেএসএস নিট কম্পোজিটের হিসাবে ২০০৯ সালে ৩ কোটি ৭৫ লাখ, ২০১০ ৩ কোটি ৩২ লাখ ও ২০১২ সালে ৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকার ফোর্সড ঋণ নেয়। অ্যাকোমুডেশন বিল সৃষ্টি করে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, অলটেক্স ফ্যাব্রিক্স, এপেক্স উইভিং এবং ফিনিশিং, পদ্মা পলি কটন, কেএসএস নিট ও পিলুসিড কোম্পানি প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নিয়েছে।

এদিকে সোনালী ব্যাংক আগারগাঁও শাখা থেকে ২০১১ ও ২০১২ সালে তিন শতাধিক ভুয়া ঋণপত্রের মাধ্যমে গ্রিন প্রিন্টার্স ১৪১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ অনুসন্ধান চলছে।

সোনালী ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে রোজবার্গ, এলএনএস গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ২৮১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।

সোনালী ব্যাংকের মতিঝিল বৈদেশিক বাণিজ্য শাখা থেকে দুইটি ভুয়া বিলের বিপরীতে প্রায় তিন কোটি টাকা পরিশোধের ঘটনাটি বেরিয়ে এসেছে। একটি বিলে এক কোটি ৪০ লাখ, অপরটিতে এক কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ঋণ নেয়ার পর ওই ভুয়া দুইটি প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সোনালী ব্যাংক বঙ্গবন্ধু এভিনিউ করপোরেট শাখা থেকে ২৫০ কোটি টাকার চারটি ঋণপত্রের বিপরীতে ব্যাংকের ওই শাখা সরাসরি চার কোটি ৫০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি এবং এক কোটি ২৫ লাখ টাকার শ্রেণীকৃত ঋণ মঞ্জুরের অভিযোগ রয়েছে।

সোনালী ব্যাংকটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন কবীর ও পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সাবেক সদস্যের হস্তক্ষেপে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ করপোরেট শাখা বিভিন্ন সময় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা এলটিআর ঋণ দেয়া হয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে যা আদায়ের সম্ভাবনা নেই বলেও ব্যাংকের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
চট্টগ্রামের লালদীঘি করপোরেট শাখা ও নারায়ণগঞ্জ করপোরেট শাখা থেকে গ্রাহককে ভুয়া ঋণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংকের ২০১১ ও ২০১২ সালে পরিচালিত অভ্যন্তরীণ পরিদর্শনে অর্থ লোপাটের এসব তথ্য উদঘাটিত হলেও ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা পরিচালনা পর্ষদ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে।

শেয়ার করুন