ঐকমত্য না হলে নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষক আসছে না

0
73
Print Friendly, PDF & Email

নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত পর্যবেক্ষক পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে না জাতিসঙ্ঘসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগীরা। এমনকি প্রধান সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হলে পর্যবেক্ষক পাঠানো থেকে বিরত থাকতে পারে তারা। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সব পক্ষ এখন বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রেখে পরিণতি দেখার অপেক্ষা করছে। বাংলাদেশে বিগত কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষক দল পাঠিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইইউর দেড় শ’ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সক্রিয় ছিলেন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইইউর পাঁচ সদস্যের প্রাক-নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদল গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ দিন বাংলাদেশে অবস্থান করে। এ সময় তারা নির্বাচন কমিশন, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, কূটনীতিক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট এনজিওগুলোর সাথে মতবিনিময় করে। ব্রাসেলসে তাদের দেয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইইউর পর্যবেক্ষকদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। ইইউর ঢাকা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। ইইউ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। নির্বাচন-পূর্ববর্তী ঘটনাপ্রবাহের ওপর নির্ভর করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদল পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই)। সংস্থার ৮১ জন পর্যবেক্ষক এ নির্বাচনে সক্রিয় ছিলেন। আইআরআই সূত্র জানায়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। কোনো দিন মনে হয় ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের প্রস্তাব-পাল্টাপ্রস্তাব, সংলাপের জন্য টেলিফোন আলাপে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে একটা সুরাহা হবে। আবার পরদিনের ঘটনাপ্রবাহ সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। তাই নির্বাচন সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে পর্যবেক্ষক পাঠানোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব না। তবে আইআরআই ঢাকা কার্যালয় পুনর্বিন্যাস করে এ জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি রাখা হচ্ছে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচনের দিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অপর সংস্থা ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউটের (এনডিআই) ৬০ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দায়িত্ব পালন করেন। একই বছরের ২০ নভেম্বর থেকে আরো ২০ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক তৎপর ছিলেন। সংস্থার ঢাকা কার্যালয় সূত্র জানায়, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনডিআই পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করবে না। সংস্থাটি দাতাগোষ্ঠরী অর্থায়নে পরিচালিত ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) বাইরে থাকা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় এনজিওদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তবে এনডিআই প্রাক-নির্বাচনী পরিস্থিতির ওপর একটি সমীক্ষা করবে। প্রসঙ্গত ২০০৬ সালে ভোটার তালিকায় এক কোটিরও বেশি ভুয়া ভোটার নিয়ে এনডিআইয়ের একটি সমীক্ষা ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়নের সিদ্ধান্ত হয়। গত সেপ্টেম্বরে নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুনের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচন পূর্ববর্তী প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণের জন্য জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুনকে পর্যবেক্ষক পাঠানোর অনুরোধ করেন। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্যের পরই জাতিসঙ্ঘ এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে বলে প্রধানমন্ত্রীকে জানান তিনি। এ ব্যাপারে বিশ্বসংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায় জাতিসঙ্ঘ। নির্বাচনকালীন সরকারপদ্ধতি নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিকদেরই সংলাপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো এ ব্যাপারে ঐকমত্যে না পৌঁছা পর্যন্ত বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জাতিসঙ্ঘ সম্পৃক্ত হবে না। বাংলাদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাস ও হাইকমিশন নির্বাচন-পূর্ববর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের দেশগুলোকে নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠাচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব প্রতিবেদনে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সঙ্কট তীব্রতর হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে একজন পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনে আমরা কঠোর অবস্থান নেবো। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে আমাদের হয়তো পর্যবেক্ষক পাঠানো থেকে বিরত থাকতে হবে। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন (ইওএম), এনডিআই, আইআরআই, ইডব্লিউজি ও কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিয়েছিল। এর প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে ১০ জানুয়ারি ইইউর বহিঃসম্পর্ক বিভাগের কমিশনার ড. ফেরেরো ওয়াল্ডনার এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহে ইইউ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। জনগণের অধিকার ও আশা-আকাক্সার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ইইউসহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা সফল হয়নি। এ পরিপ্রেক্ষিতে এবং সব ক’টি প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে ইওএমের কার্যক্রম আশানুরূপ ফল বয়ে আনবে না। এ কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ইওএমের কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।’ প্রসঙ্গত, নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিরূপণে পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শেয়ার করুন