প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগই একমাত্র সমাধান : গোলটেবিলে বক্তারা

0
57
Print Friendly, PDF & Email

গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বিশিষ্টজনেরা বলেছেন, শুধুমাত্র গণমাধ্যম নয়, দেশের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব ও গোটা দেশের অস্তিত্বই আজ আক্রান্ত এবং চরম হুমকির মুখে। গণমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বের কারণে সংকট আরো ঘনিভুত হয়েছে। বর্তমানে দেশে চরম সংকট চলছে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, এক ব্যক্তির ইচ্ছার কাছে দেশের ১৬ কোটি মানুষ আজ জিম্মি হয়ে আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগই এ থেকে উত্তরণে একমাত্র সমাধান।

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে আয়োজিত ‘আক্রান্ত গণমাধ্যম : সংকটের আবর্তে দেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, সাংবাদিক এবং বিশিষ্টজনেরা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ডিইউজের সভাপতি কবি আবদুল হাই শিকদার।

গোলটেবিল বৈঠকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজকে শুধু গণমাধ্যম নয়, দেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। ক্ষমতাসীন সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও তারা গণতন্ত্র বিরোধী কাজে লিপ্ত। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র কিভাবে ধংস করা যায় সে প্রচেষ্টা প্রতিনিয়ত করেছেন। তারা ১৯৭৫ সালে সব পত্রিকা বন্ধ করে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ও মানুষের বাক স্বাধীনতা হরণ করেছিল। গত ৫ বছর ধরে ভিন্ন মতালম্বীদের গ্রেফতার ও পত্রিকার বন্ধ করেছে এই সরকার। তারা ৯৬’ সালে ক্ষমতায় এসেও ৪টি পত্রিকা বন্ধ করেছিল। সর্বশেষ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ আমার দেশ, দিগন্ত, ইসলামিক টিভি, চ্যানেল ওয়ানসহ অনেক গণমাধ্যম বন্ধ করেছে। সাহসী সম্পাদক মাহমুদুর রহমান ও মানবাধিকার সংগঠক আদিলুর রহমানকে কারারুদ্ধ করেছে। তিনি বলেন, যে অভিযোগে মাহমুদুর রহমানকে এই সরকার বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করেছে সেই একই অভিযোগে বর্তমান তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও অভিযুক্ত। তিনি বিরোধী দলের নেতার অনুমতি ছাড়াই ফোনালাপ প্রকাশ করার কথা বলেছেন। গণমাধ্যমে এটি প্রকাশ করা হয়েছে। এজন্য তথ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিতে সম্মতি দেওয়ায় তারও পদত্যাগের বিষয় নৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

দেশের মিডিয়াগুলোকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বিএনপির এই মুখপাত্র বলেন, মিডিয়াকে দলীয় অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। কিছু মিডিয়া ফরহাদ মজহারের বিচারের কথা বললেও একবারও তারা বলছেন না সাগর-রুনি হত্যার বিচার, বন্ধ গণমাধ্যম চালু ও সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের কারারুদ্ধ জীবনের মুক্তির বিষয়ে। এটা দু:খজনক।

নির্বাচনকে সরকার দলীয়করণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের ৯০ ভাগ মানুষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইলেও সরকার সেটা চাচ্ছে না। কারণ গত পাঁচ বছরে সরকারের দুর্নীতি-অনিয়ম ও সম্পদ লুট করে দেশের অর্থনীতিকে ধংস করেছে। তারা এখন স্বপ্ন দেখছে ২০২১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার। কিন্তু তাদের এ স্বপ্ন কখনোই বাস্তবায়ন হবে না। এজন্য বাংলাদেশের অস্তিত্ব, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যতকে রক্ষা করতে হলে সবাইকে লড়াইয়ে নামতে হবে। একাত্তরের মতো গণতন্ত্র, স্বাধীনতাকে রক্ষার লড়াইয়ে নেমে বিজয় অর্জন করতে হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান বলেন, ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে আমরা এখানে সমবেত হয়েছি। আমরা কোন দিকে যাবো সেটা স্পষ্ট নয়। অনিশ্চয়তা আমাদের ঘিরে রেখেছে। প্রায় দু’যুগ ধরে সংঘাতময় রাজনীতিতে আছি আমরা। একতরফা নির্বাচনের কারণে ভবিষ্যতে এটি আরো ঘনিভুত হবে। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে একতরফা নির্বাচন কখনো মানায় না।

বর্তমানে দুটি অশুভ বিষয় ঘটছে উল্লেখ করে এ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, তার একটি হচ্ছে রাজনীতি ক্রমশ চরমপন্থীদের হাতে চলে যাচ্ছে এবং ক্রমশ এটি বিস্তৃত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত: ক্রমশ এই চরমপন্থার দিকে যাওয়ায় রাজনীতিটা অবাস্তব হয়ে যাচ্ছে। এটা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। গণমাধ্যমের ওপর হামলাসহ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাস করা হচ্ছে। সিভিল সমাজকে ভেঙ্গে ফেলা হচ্ছে। এজন্য দেশের সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসকসহ সব পেশার মানুষ আজ খন্ডবিখন্ড হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তি গণতন্ত্রের চেতনা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যাচ্ছে তাতে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে। এ থেকে উত্তরণের একটি উপায় হচ্ছে আমাদেরকে আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এজন্য প্রতিবেশি ও সকল পেশাজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে সবাইকে নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত আরো অবনতি ঘটবে। তবে আমি আশাবাদী এ অবস্থা সৃষ্টির আগেই দেশের মানুষ এটিকে অতিক্রম করবে।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ বলেন, বর্তমানে দেশের একমাত্র সমস্যা হচ্ছে শৃঙ্খলাবোধের অভাব। এজন্য গণতন্ত্র ছাড়া বাংলাদেশের উপায় নেই। ক্ষমতাসীনরা জনগণকে ক্ষমতার উৎস বললেও জনগণকে ক্ষমতা দিতে চায় না। তিনি বলেন, দেশের জাতীয় পর্যায়ে একটি নির্বাচন করতে গেলে প্রায় ১৪ লাখ লোকের প্রয়োজন হয়। এরা সবাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। এদেরকে বলার দরকার নেই যে আপনারা আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করুন। দলীয় সকারের অধীনে নির্বাচন হলে তারা নিজেদের চাকরি রক্ষার্থেই আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করবে। এজন্য একমাত্র ভোটাররা নির্বাচন পরিচালনা করলেই কেবলমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে না। তা না হলে কোনোভাবেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।

তিনি বলেন, সংবিধান বুঝার ক্ষমতা নেই বলেই ক্ষমতাসিনরা সংবিধান সংশোধন করে একতরফা নির্বাচনের কথা বলছেন। দেশের স্বার্থে সবাইকে এক হয়ে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ এবং মিডিয়া কখনো এক সঙ্গে চলতে পারে না। এটি অতীতেও দেখা গেছে এবং বর্তমানেও অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গেছে। ভিন্নমত, বিরোধীতা ও প্রতিবাদ সহ্য করার ক্ষমতা আওয়ামী লীগের নেই, কখনো ছিল না। তিনি বলেন, বর্তমানে ভিন্ন মতালম্বীদের ওপর নির্যাতন দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

কবি আল মাহমুদ বলেন, সব সময় কোনো না কোনোভাবে গণমাধ্যম আকান্তের শিকার হয়েছে। এটা নতুন নয়, যৌবন কালে আমি নিজেও অকারণে জেল খেটেছি। আমার বয়স বেড়ে গেছে কিন্তু অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় নি। প্রতিবাদকারী সাহসী ব্যক্তিদের সাথে আমি থাকতে চাই। সাহসী মানুষদের পক্ষে দাঁড়াতে চাই। সব সময় প্রতিবাদী, আকান্ত ও পরাক্রমশালী ছিল গণমাধ্যম। গণমাধ্যম আক্রান্ত হলে তার বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করতে চাই।

কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, সাংবাদিকসহ দেশের মানুষ সবাই আজ আক্রান্ত। এই সরকারের এখন আর বেলা নেই। একমাত্র সমাধান প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দেশের জন্য আমি অনেক অপমান সহ্য করেছি। তার এই বক্তব্যে আমি মর্মাহত হয়েছি। আমাকে তিনি পাগল বলেছিলেন, প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক, ড. ইউনূসকে নিয়ে তিনি গালমন্দ করেছেন। তাতে তিনি অপমানিত হন নি।। তিনি বলেন, আসলে কাউকে অপমান করলে তার জন্য একদিন তাকেও অপমানিত হতে হয়। খালেদা জিয়ার জন্মদিন পালন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কটুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাহলে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী কি ১৫ আগস্ট বিয়ে করেনি। ওইদিন কি তাদের কোনো সন্তান হয়নি। তাহলে ওই দিনে একজন জন্মদিন পালন করলে সমস্যা কোথায়? তিনি বলেন, বিরোধী দলীয় নেতার আগামী ৬৯ তম জন্মদিনে যদি ৬৯টি গরু-খাসি মেরে জন্মদিন পালন করেন আর সেখানে আমাকে দাওয়াত দিলে কেউ না গেলেও আমি সেখানে যাবোই।

গণমাধ্যমে ফরহাদ মজহারকে নিয়ে কটুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেক মানুষ গণমাধ্যম নিয়ে কটুক্তি করলেও তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলা হয়না। ফরহাদ মজহার যে ব্যাখ্য দিয়েছেন তার পক্ষেই আমার মত। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, মাহমুদুর রহমানকে যে কারণে জেলে রেখেছেন সে কারণে আপনাদের মাজায় এবং গলায় দড়ি-হ্যানকাফ লাগিয়ে জেলে রাখা উচিত। তিনি বলেন, সামনে নির্বাচন করতে চাইলে মাহমুদুর রহমানকে ছেড়ে দিন। ফরহাদ মজহারকে আক্রান্ত করা ছেড়ে দিন। যতক্ষণ গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করবেন তার বিরুদ্ধে দাড়াবো। ফরহাদ মজহারকে বলবো ভয় নাই।

তথ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর তো সন্ত্রাসের মন্ত্রী হওয়ার কথা। তার আগের কার্যকলাপতো সন্ত্রাসী কার্যকলাপ। তিনি হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতাকে হত্যা করেছেন, অথচ তিনিই আজ আওয়ামী লীগের নেতা ও পরামর্শদাতা হয়েছেন। তিনি বলেন, আমি দিগন্ত টিভিতে গিয়েছি বলে রাজাকার হয়েছি। কিন্তু আমি রাজাকার নই। মুক্তিযুদ্ধের একজন যোদ্ধা ছিলাম, এখন রাজাকার হলেও আমার আপত্তি নেই। দেশের মানুষের বাইরে আমাকে টেনে নেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, বিএনপির সরকার রাজাকারদের গাড়িতে পতাকা উড়িয়ে যে অপরাধ করেছেন তার চেয়ে বড় অপরাধ করেছে আওয়ামী লীগ একজন স্থায়ী রাজাকার মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে মন্ত্রী বানিয়ে।

মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে আর যাই হোক বিভ্রান্ত করা যাবে না উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক বলেন, ৪৭ বছর পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করার কোনো যুক্তি নেই। এ সরকারের বিরুদ্ধে সবাইকে ইস্পাত সমান ঐক্য গড়ে তোলা আহ্বান জানান তিনি।

রাষ্ট্র ও সমাজচিন্ত কবি ফরহাদ মজহার গণমাধ্যমের ওপর হামলার ঘটনায নিন্দা জানিয়ে বলেন, আমি বিস্মিত হয়েছি একটি টিভির সাংবাদিকরা নিজেদের সাংবাদিক বলে দাবি করেন, অথচ তারা পেশাদারিত্ব বাদ দিয়ে আমার বক্তব্যকে কেটে, জোরাতালী দিয়ে বিকৃত করে প্রচার করে কিছু ব্যক্তিকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিয়েছেন। অথচ আমার কোনো বক্তব্য নেওয়ার প্রয়োজন কেউ মনে করেনি।

তিনি বলেন, সারাজীবন মানবাধিকারের পক্ষে লড়েছি আর আমার বিরুদ্ধে সাংবাদিকরা বিষোদগার করছেন। আমার লজ্জা হয় যে, এটা কোন ধরণের সাংবাদিকতা?

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, সাগর-রুনির রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আপনি কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হলেন? জাতি তা জানতে চায়। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শুধুমাত্র হাসিনা-খালেদাই একমাত্র দায়ি নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা গণমাধ্যম কর্মীরাও এর জন্য অনেকাংশে দায়ী।

দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার সম্পাদক আবুল আসাদ বলেন, গণমাধ্যম আজ আক্রান্ত হয়েছে। সত্য কথা বলায় মাহমুদুর রহমানকে জেলে ঢুকানো হয়েছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখতে হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, অনেক আগে থেকেই দেশের গণমাধ্যমগুলো শৃঙ্খখলিত হয়ে গেছে। আগে এমন ছিল না। ব্যবসায়িক সমাজ গণমাধ্যমকে দখলে নিয়ে নিয়ন্ত্রণেন চেষ্টা করছে। এজন্য গণমাধ্যমগুলো মুক্ত নয়। নির্ভয়ে কথা বলতে পারে না। কিন্তু আমরা নির্ভয়ে কথা বলতে চাই। এটা কারো পছন্দ না হলে গণমাধ্যমে লিখে প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু তা বাদ দিয়ে অপছন্দের ব্যক্তিকে জেলে ঢোকানোর চিন্তা অগণতান্ত্রিক। বাংলাদেশ আজ শৃঙ্খখলিত হয়ে গেছে। এ থেকে আমাদের মুক্তি প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজের) সভাপতি রুহুল আমিন গাজী বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে সাগর-রুনিসহ ২০জন হত্যা, ২ হাজার জনকে আহত, আমার দেশকে দ্বিতীয়বারের মতো বন্ধ, মাহমুদুর রহমানকে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ, দিগন্ত-ইসলামিক টিভি বন্ধ, সংগ্রামের ওপর হামলা হয়েছে। ফরহাদ মজহারকে বিতর্কিত করার জন্য তার বক্তব্যকে বিকৃত করে প্রচার করা হয়েছে। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেন এটাই তার অপরাধ।

দুই নেত্রীর ফোনালাপে প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি মিথ্যাচার করেছেন উল্লেখ করে সাংবাদিক শফিক রেহমান বলেন, প্রথমটি রেড ফোনে কল করা ও বিরাধী দলীয় নেতার সাড়া না দেওয়ার ব্যাপারে। দ্বিতীয়টি তাঁর ডান কানে না শুনা নিয়ে। তৃতীয়টি নির্দিষ্ট সময়ের আধাঘন্টা পরে দেরিতে ফোন করা নিয়ে। চতুর্থটি বিএনপি ৩৩০ দিন হরতার পালনের কথা বলে মিথ্যাচার করেছেন। এসময় তিনি শেখ হাসিনাকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বলেছেন সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করবেন। কিন্তু এটা তার মিথ্যাচার। তিনি সর্বোচ্চ ত্যাগ শিকার করতে চাইলে তার পদত্যাগ করা উচিত।

বার কাউন্সিলের সহ-সভাপতি এ্যাড. খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, শুধু গণমাধ্যম আক্রান্ত নয়, সমগ্র দেশ, গণতন্ত্র এদেশের সবকিছুই এখন আক্রান্ত। বর্তমান বাকশালী সরকার একদলীয় যে সরকার ব্যবস্থা তৈরি করেছে তার বিরুদ্ধে আমারদেরকে রুখে দাঁড়াতে হবে।

গণমাধ্যমে হামলার নিন্দা জানিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ বলেন, তবে এর পেছনে কারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করা দরকার। কারণ এরা একটা পক্ষের লোক। তিনি বলেন, শুধু গণমাধ্যম নয়, দেশপ্রেমিকরা আজ আক্রান্ত। ফরহাদ মজহারের বক্তব্যকে বিকৃত করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে-পেছনের কথা বাদ দিয়ে মাঝখানের বক্তব্য খন্ডিত ভাবে উপস্থাপন করা সৎ সাংবাদিকতা নয়। তিনি সত্য কথা বলেছেন বলেই আকান্তের শিকার হয়েছেন। বর্তমান সংকটের সমাধানে আলোচনা নয়, পুর্বের অবস্থায় ফিরে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেই বর্তমান সংকটের সমাধান হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যরিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, গণমাধ্যম আজ বিভক্ত। সত্য কথা বললে সেই গণমাধ্যমের পক্ষে না গেলে সেটা বিকৃত করে প্রকাশ করা হয়। ফরহাদ মজহারকে একজন সম্মানিত ব্যক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সত্য কথা বলায় তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। তার বক্তব্য সঠিকভাবে প্রচারিত হয়নি। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সমগ্র দেশ ও গণতন্ত্র আজ বিপন্ন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন কমিটির পরামর্শ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র এক ব্যক্তির সিদ্ধান্তের কারণে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। এক ব্যক্তি ইচ্ছার বিরুদ্ধে সমগ্র দেশের মানুষকে রুখে দাঁড়াতে হবে।

সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, দেশে অনেক সংকট পাড়ি দিয়ে আমরা এখানে এসেছি। এদেশে অনেক সংকট সৃষ্টি হয়েেেছ। তবে এবারের সংকট অনেক বেশি ঘনিভুত হয়েছে। এজন্য যোগ্য নেতৃত্ব ও জাতির মধ্যে ঐক্য খুবই প্রয়োজন। ঠান্ডা মাথায় ঐক্যবদ্ধভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করলে চলমান সংকটের উত্তরণ সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সাংবাদিকদের ওপর কোনো রকম হামলা গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর নিন্দা জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, গণমাধ্যম যতই পক্ষপাতিত্ব করুক তার উত্তর বোমাবাজী বা ব্যক্তিগত হামলা নয়। কিন্তু গণমাধ্যমের মালিকরা নির্লজ্জভাবে পক্ষপাতিত্ব করে দেশের সংকটময় মুহুর্তে অপসাংবাদিকতা করছে। এ কারণে মালিকরা সাংবাদিকদের জীবনকে নিরাপত্তাহীনতা করে তুলেছে। যারা বিশেষ দলের হয়ে সাংবাদিকতা করছে তারাই গণমাধ্যমে হামলার উস্কানীদাতা। ফরহাদ মজহারের বক্তব্য পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ পায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার দেশ-এর ওপর হামলা করার জন্য শাহবাগ থেকে উস্কানী দেওয়া হয়েছিল সেটা আরো বড় ধরনের অপরাধ। কিন্তু সেগুলো গণমাধ্যমে আসে না। বিভিন্ন চ্যানেল, পত্রিকা বন্ধ, সাগর-রুনি হত্যার বিচার হয় না। সেগুলোর প্রতিবাদ করা হয়না। তা না করে কিছু গণমাধ্যম আজ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে কটুক্তি করছে। তিনি বলেন, আমার দেশ বন্ধ করতে বলবেন আর হামলার প্রতিবাদ করবেন এটা হতে পারে না। এজন্য সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করতে গণমাধ্যমের ওপর হামলা অনেকাংশেই কমে যাবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ফরহাদ মজহার সত্য কথা বলেন বলেই তার ওপর এই আক্রমণ। মাহমুদুর রহমানের মামলা নিয়ে গেলে বিচারপতিরা বিব্রতবোধ করেন। এটা কেন? তিনি বলেন, এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ যাকে ইচ্ছা তাকে ভোট দিবে। তাহলে বিটিভি বা একাত্তর টিভিকে বন্ধ করার কথা বলতে হবে না এমনিতেই তাদের চেহারা পাল্টে যাবে।

ড. মাহফুজ উল্লাহ বলেন, শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হওয়া দোষের কিছু নয়। এর আগেও ফরহাদ মজহার আক্রমণের শিকার হয়েছেন। গণমাধ্যম বন্ধুদের প্রতি আহ্বান অগ্রজরা সাহসের সাথে লড়াই করেছেন, অনুজদেরকেও দায়িত্ববোধ থেকে সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, তা না হলে ভবিষ্যত ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

রাজনীতিক বিশ্লেষক ড. পিয়াস করিম বলেন, গণমাধ্যমে হামলা সব সময়ই ঘটেছে। বর্তমানে এটি বেশি ঘটছে। এর বিরুদ্ধে আমাদেরকে দাঁড়াতে হবে। শুধু গণমাধ্যম নয় পুরো দেশটাই আজ আক্রান্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য আ ফ ম ইউসুফ হায়দার বলেন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগের সাথে কখনই চলে না। বর্তমানে এক ব্যাক্ত বনাম ১৬ কোটি মানুষ হয়ে গেছে। তিনি সরে গেলেই দেশে শান্তি ফিরবে।

আইন বিশেষজ্ঞ¡ ড. তুহিন মালিক বলেন, সামনে নির্যাতনকারী সরকার আসছে, বিশেষ করে যারা সরকারের সমালোচনা করে টকশো করে তাদের জন্য এ নির্যাতনের মাত্রা আরো বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, যারা আজকে গণমাধ্যম এবং টিভি ব্যক্তিত্বদের বাড়ি-গাড়িতে হামলা হলেও তার প্রতিবাদ হয় না। এ
অবস্থা চলতে থাকলে আমরা কেউ রেহাই পাবো না।

বিশিষ্ট চলচিত্রকার ও গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে মাহমুদুর রহমান, সাগর-রুনিসহ অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু অনেক গণমাধ্যম সেগুলোর পেছনে দাঁড়ায়নি। আমাদের প্রত্যাশা গণমাধ্যম তাদের সঠিক ভূমিকা পালন করবে।

ডিইউজে সভাপতি কবি আব্দুল হাই শিকদারের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, সাবেক সচিব আ ন ম আখতার হোসেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাদা দলের সাবেক আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মু. আজহার আলী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. খন্দকার মোস্তাহিদুর রহমান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি ড. রেজাউল করিম, সংসদ সদস্য আসিফা আশরাফি পাপিয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. মামুন আহমেদ, ডিইউজের সাবেক সভাপতি আবদুস শহিদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ, মেজর জে, (অব) আয়েন উদ্দিন, চলচিত্র ব্যক্তিত্ব আবুল কাশেম মিঠুন, ডিইউজের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান প্রুমখ।
উৎসঃ   শীর্ষ নিউজ

শেয়ার করুন