সংলাপের কপাট বন্ধ

0
72
Print Friendly, PDF & Email

প্রত্যাশিত সংলাপ হচ্ছে না। সরকারের এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং মন্ত্রীদের কথার মারপ্যাঁচে অনুকূল পরিবেশকে ‘ঘোলাটে’ করায় রাজনৈতিক সংকট সমাধানে দু’দলের মধ্যকার কাক্সিক্ষত সংলাপের কপাট কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। দেশ এক গভীর সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। অন্যদিকে বিরোধীদলের অভিযোগ সরকার আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনে আন্তরিক নয়। নীল নকশার নির্বাচন ঘটাতে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে নিতেই সরকার সংলাপের নামে নাটক করেছে। সরকারের ‘পাতানো সংলাপ ফাঁদে’ বিরোধীদল পা দেবে না। দাবী আদায়ে বিরোধীদলের সামনে আন্দোলনের আর কোন বিকল্প নেই। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ১৮ দলীয় নেতাকর্মীদের শহীদদের রক্তে ছুঁয়ে শপথ নিয়ে আন্দোলনে নামার আহবান জানিয়েছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেত্রী কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী ৩ নভেম্বর ফাইনাল খেলার হুমকি দিয়েছেন।
নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে সরকারের গোয়ার্তুমির কারণে বিএনপি রাজপথ আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দলের নেতাদের বিশ্বাস রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমেই তারা দাবী মেনে নিতে সরকারকে বাধ্য করবে। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে দলের স্থায়ী কমিটি এবং জোটের নেতাদের বৈঠকেও কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে দাবী আদায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বুদ্ধিজীবী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও মনে করেন বর্তমান সংকট সমাধানে সরকার আন্তরিক নয়। বিরোধীদলকে বাইরে রেখে সরকার একদলীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা যে ভাষায় বক্তব্য দিচ্ছেন তাতে সংলাপের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী দু’জনই গতকাল বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলে অন্যদের নিয়ে তারা নির্বাচন করবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে। তাদের এ ধরনের বক্তব্য আলোচনার বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে জনমনে প্রশ্নের সৃষ্টি করে। শুধু মন্ত্রী এমপিরাই নয়, প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় গতকাল যে ভাষায় বিরোধীদলের সমালোচনা করছেন তাতে দু’দলের মধ্যে সমঝোতার পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে বলেই রাজনৈতিক বোদ্ধারা মনে করছেন। দু’দলের মধ্যে আলোচনার বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন বলেন, দেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটময়। এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোনো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না। বিশেষ করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে সরকারের আন্তরিকতার ব্যাপারে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, সকলেই অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়, শুধু সরকার চায় না। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, অবাধ কারচুপির একটা ব্যবস্থা চলছে। সরকার যাতে নিজের মতো করে সব কিছু করতে পারে সেই ব্যবস্থা চলছে।
অন্যদিকে বিরোধীদলের আন্দোলনকে স্তিমিত করতে সরকার লোক দেখানো সংলাপের আয়োজন করতে চায়। সংলাপ সংলাপ খেলা করে সরকার ভিতরে ভিতরে বিএনপিকে বাদ দিয়ে একতরফা নির্বাচন করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারের এসব ষড়যন্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে মোকাবেলার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮দলীয় জোট। এ ব্যাপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, সরকার আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান চায় না। বিরোধী দলকে আলোচনায় নিয়ে এটা শুধুমাত্র জাতিকে বিভ্রান্ত করতে চায়। ইতিপূর্বে সংবিধান সংশোধনের নামে কমিটি করে সেখানে দেশের বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী এবং রাজনীতিবিদদের মতামত নেয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সে সব মতামতের সামান্যতমও মূল্যায়ন না করে প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সংসদে পাস করা হয়। লোক দেখানো চার্জ কমিটি করে সরকার নিজেদের লোক দিয়েই নির্বাচন কমিশনও গঠন করেছে। এখনও সরকার তাদের গোপন ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতেই বিরোধী দলকে আলোচনায় ডাকছে। তিনি বলেন, আলোচনায় এমনও হতে পারে যে, সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তার প্রধান থাকবেন না এমন ঘোষণা দিতে পারেন। আর যাকে ওই সরকার প্রধান করার প্রস্তাব দেয়া হবে তিনি হয়তো শেখ হাসিনার চেয়েও আরও বড় আওয়ামী লীগার। তাই সব কিছু বিচার বিশ্লেষণ করেই বিরোধীদল সরকারের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় কঠোর আন্দোলনের প্র¯‘িত নিয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এ সরকার সংলাপের নামে নাটক করতে চাচ্ছে। আমরা স্পষ্ট করে বলেছি, নির্দলীয় সরকারের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হলেই কেবল সরকারের সঙ্গে আলোচনা হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু করতে নির্দলীয় সরকারের বিকল্প নেই। তাই আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করতে হবে।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই আন্দোলন কর্মসূচী শিথিল করা হবে না, বরং ধীরে ধীরে তা আরো কঠোর হবে। সংলাপ চলতে পারে, তবে সংলাপের পাশাপাশি সব ধরনের কর্মসূচীও অব্যাহতভাবে চলতে থাকবে। যতদিন পর্যন্ত না নির্দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনের জন্য আমাদের দাবি সরকার মেনে না নেবে।

শেয়ার করুন