ক্ষুদ্র ঋণের দায় মেটাচ্ছেন তারা

0
42
Print Friendly, PDF & Email

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে নেয়া ক্ষুদ্র ঋণ পরিশোধে বাংলাদেশের বেশ কজন গরিব মানুষ তাদের শরীরের অঙ্গ বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।

এদের একজন জয়পুরহাটের কালাই গ্রামের মুহাম্মদ মোকাররম হোসেন। তিনি একটি কিডনি বিক্রি করেছেন। দারিদ্র থেকে মুক্তির আশায় তিনি একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়েছিলেন। কিন্তু টাকা পরিশোধে যে এতো বড় মূল্য দিতে হবে এটি কল্পনাও করেননি তিনি। দায় মেটাতে কিডনি বিক্রি করতে হয়েছে মোকাররমকে। একই গ্রামের আরও কয়েকজনের একই পরিণতি হয়েছে।

স্বাধীনতার আগে থেকেই বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ শুরু হয়। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এই ব্যবসায় জড়ায়। ক্ষুদ্র ঋণ দিতে গড়ে উঠেছে আলাদা ব্যাংকও।

১৯৯৭ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিন কোটি ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষুদ্রঋণ নিয়েছে। এদের মধ্যে দুই কোটি ৬০ লাখ মানুষই বাস করে দারিদ্রসীমার নীচে। তবে ক্ষুদ্র ঋণ নেয়ার প্রবণতা কমে আসছে। বর্তমানে ঋণগ্রহীতা কমে দুই কোটিতে ছয় লাখে দাঁড়িয়েছে।

শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিক্রি করে দেয়া দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটি সাধারণ ঘটনা। তবে ক্ষুদ্র ঋণ পরিশোধের তাগিদে শরীরের অঙ্গ বিক্রির ঘটনাকে এই অঞ্চলের প্রথম প্রবণতা হিসেবেই বলছে বিবিসি।

৩৩ বছর বয়সী মুহাম্মদ আকতার আলমের পেটে ১৫ ইঞ্চির একটি কাটা দাগ। এ দাগের কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান একটি কিডনি বিক্রির কথা। কিডনি বিক্রির পর অনেকটা পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। এরইমধ্যে তিনি একটি চোখে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছেন না। এছাড়া তার যেকোনো ভারী কাজও নিষেধ।

কিডনি বিক্রির অর্থ দিয়ে ঋন পরিশোধ করে অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে তিনি গ্রামে একটি মুদির দোকান চালান বলে জানিয়েছে।

বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশাসহ সাতশরও বেশি সংগঠন ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবসা করছে। এদের বেশির ভাগ গ্রহীতাই নারী। ঋণ বিতরণ এবং তা তুলতে এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন এক লাখেরও বেশি মানুষ। ঋণের কিস্তি তোলার সময় ঘরবাড়ি, গবাদি পশু এমনকি অলঙ্কার খুলে নেয়ার ঘটনাও বিরল না বাংলাদেশে।

বিবিসি বলছে, গরিব মানুষরা দারিদ্র থেকে মুক্তির আশায় ঋণ নিলেও তারা সফল হয় কম ক্ষেত্রেই। বরং ঋণ পরিশোধে নানা বিড়ম্বনার শিকার হয় তারা।

দরিদ্র ঋণগ্রহীতারা আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনের জন্যে ঋণ নিলেও, অনেক ক্ষেত্রেই তা তাদের কোনো উপকারে আসে না। অনেক ক্ষেত্রেই একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধে আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেন গ্রহীতারা। এভাবে ঋণের বোঝা বাড়তেই থাকে।

কয়েক বছর আগে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন আলম। বিভিন্ন সময় বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও থেকে আটবার ঋণ নেন। ঋণের পরিমাণ প্রায় এক লাখ টাকায় পৌঁছায়। এটি পরিশোধের কোনো উপায়ই তার ছিলো না।

বাড়ির আসবাবপত্র এমনকি হাঁড়ি পাতিলও বিক্রি করেছেন। পরে একদিন এক দালালের মাধ্যমে কিডনি বিক্রির প্রস্তাব পায়। দালাল তাকে চার লাখ টাকা দেয়ার কথা বলেন। এরপর তাকে ঢাকায় এনে এক হাসপাতালে রেখে অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুত চার লাখ টাকা পাননি।

দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আলম বলেন, ‘বেঁচে আছি এবং দোকানটা আছে এটাই এখন সম্বল’।

শেয়ার করুন