১০ উপদেষ্টা নিয়ে অবস্থান পরিবর্তন সংসদে নির্দলীয় সরকারের প্রস্তাব দিল বিএনপি

0
62
Print Friendly, PDF & Email

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার প্রস্তাব সংসদে উত্থাপন করেছে বিএনপি। উত্থাপনের পরপরই নির্বাচনকালীন সরকারের ১০ জন উপদেষ্টার বিষয়ে তাদের অবস্থান থেকে সরে আসে বিএনপি। তবে নির্দলীয় সরকারের প্রধানের বিষয়টি আগের অবস্থানে অনড় থাকে দলটি।

গতকাল বুধবার বিএনপির সাংসদ জমির উদ্দিন সরকার উত্থাপন করে প্রস্তাবের একটি কপি স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে দেন। এর পরেই বিরোধী দলের প্রস্তাব নিয়ে সরকারদলীয় সাংসদেরা আলোচনা শুরু করেন। একপর্যায়ে সরকারদলীয় সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম তাঁর বক্তব্যে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে ‘কটূক্তি’ করলে বিরোধীদলীয় সাংসদেরা রাত পৌনে আটটায় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। এ সময় বিএনপির সাংসদ শহীদ উদ্দীন চৌধুরী স্পিকারকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমরা সংকট সমাধানের জন্য এসেছি। এ ধরনের বক্তব্য শোনার জন্য আসিনি। তাই ওয়াক আউট করতে বাধ্য হলাম।’

প্রস্তাব উত্থাপনের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারদলীয় সাংসদদের মধ্যে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত একে বাতিল মাল বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বদলীয় সরকার নিয়ে যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। সরকারদলীয় সাংসদ তোফায়েল আহমেদ বিরোধী দলের প্রস্তাব সংবিধানসম্মত নয় বলে মন্তব্য করেন।

সন্ধ্যা সাতটার দিকে বিএনপির সাংসদ জমির উদ্দিন সরকার প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা শেখ হাসিনার অবগতির জন্য উত্থাপন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সংসদে উপস্থিত ছিলেন না। তবে প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরুর পরপরই তিনি সংসদে ফিরে আসেন।

প্রস্তাব উত্থাপন করতে গিয়ে জমির উদ্দিন সরকার বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এই মর্মে প্রস্তাব করছি যে আলোচনার মাধ্যমে এর সুরাহা হওয়া দরকার। সেই আলোচনা যত দ্রুত শুরু করা যায়, ততই মঙ্গল।’ তিনি গত ২১ অক্টোবর বিএনপির চেয়ারপারসনের দেওয়া প্রস্তাবটি সংসদে তুলে ধরেন। সংসদে উত্থাপিত প্রস্তাবে বলা হয়, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের ২০ জন উপদেষ্টার মধ্য থেকে ১০ জন হবেন নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাঁচজন করে নাম প্রস্তাব করবে। প্রধান উপদেষ্টা হবেন দুই দলের সম্মতিতে। রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও সংরক্ষিত নারী সাংসদদের যেভাবে নির্বাচিত করা হয়, প্রয়োজনে তাঁদেরও সেভাবে সংসদ ভেঙে দেওয়ার আগেই নির্বাচিত করে আনা যেতে পারে।

প্রস্তাবে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান ও অনুরোধ জানানো হয়। বক্তব্যে জমির উদ্দিন বলেন, ১৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রস্তাবে সবকিছু আসেনি। সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

প্রস্তাব উত্থাপনের পর তোফায়েল আহমেদ বলেন, প্রস্তাবটি সুনির্দিষ্ট বিধিতে দেওয়া হলে আলোচনা করা যেত। এটা না করায় তিনি বিরোধী দলের সমালোচনা করে বলেন, প্রস্তাবে অনেকগুলো ভুল আছে। বিএনপি বলেছে, দুই তত্ত্বাবধায়কে ২০ জন উপদেষ্টা আছেন। কিন্তু এটা হবে ১৮ জন। বিএনপি আসলে হোমওয়ার্ক করেনি। বিরোধীদলীয় নেতাকে সতর্কতার সঙ্গে এটা উপস্থাপন করা উচিত ছিল। তা ছাড়া এই ১৮ জনের মধ্যে চারজন মারা গেছেন। চারজন অসুস্থ, দুজন অপারগতা প্রকাশ করেছেন। আর একজন তো বিএনপির উপদেষ্টা। তাঁর নাম বলতে চাই না। এখন তো ১০ জনই খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি প্রশ্ন করেন, তাহলে ১০ জন খুঁজে বের করা যাবে কীভাবে? তিনি বিভিন্ন উদাহরণ ও পত্রিকার খবর তুলে ধরে বলেন, ওই দুই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিতর্ক আছে। ’৯৬-এর সরকার নিয়ে তো বিএনপিই প্রশ্ন তুলেছিল।

তোফায়েল আহমেদ কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী বিরোধী দলকে প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান।

তোফায়েল আহমেদের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর জমির উদ্দিন সরকার বলেন, প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রীর অবগতির জন্য দেওয়া হয়েছে। অথচ তোফায়েল আহমেদ নিজেই সেই দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। আগের তত্ত্বাবধায়ক নিয়ে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে সেগুলো অতীত। এসব অভিযোগের খাতা বন্ধ।

এরপর বিরোধীদলীয় সাংসদ এম কে আনোয়ার বলেন, ২০ জনের কথা বলা হয়েছে। এখান থেকেই হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান নির্বাচন করা গেলে উপদেষ্টা কোনো ব্যাপার নয়। উপদেষ্টারা ওই ২০ জন থেকে আসবেন, নাকি অন্য কোনো ব্যক্তির মধ্য থেকে আসবেন, সেটা সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হতে হবে। দোষারোপ করলে হবে না। সংসদে আলোচনা করে সমাধান সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, আলোচনা বাইরে হতে হবে। সংসদে বিতর্ক হতে পারে।

এম কে আনোয়ার বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, এটা আমরাও জানি। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে এটা করা যেতে পারে। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সংকট সমাধানে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তা না হলে একদলীয় নির্বাচন হবে। গণতন্ত্রের ধারা ব্যাহত হবে। দেশ অস্থিতিশীল হবে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, সংসদে প্রস্তাব দিলে তা সংসদের সম্পদ, শুধু প্রধানমন্ত্রীর নয়। তিনি বলেন, দেশে সাংবিধানিক কোনো সংকট নেই।

শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করেনি। তারা সংবিধান সংশোধন করতে বাধ্য হয়েছে। কেননা আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবৈধ ঘাষণা করেছেন। জিয়াউর রহমানের শাসন ও ক্ষমতা দখলকে অবৈধ বলেছেন। তাঁর এই বক্তব্যে বিরোধীদলীয় সাংসদেরা হইচই করেন। তাঁরা স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে থাকেন, আমরা এসব শুনতে আসিনি। আমরা সমাধান চাইতে এসেছি। তাঁরা শেখ সেলিমের মাইক বন্ধেরও দাবি জানান। একপর্যায়ে সংসদ থেকে তাঁরা ওয়াক আউট করেন।

মুলতবি বৈঠক: এরপর বিকেল পাঁচটায় বিরোধী দলের সাংসদেরা বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের কার্যালয়ে বৈঠকে বসেন। সে সময় অধিবেশনে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

শেয়ার করুন