পাওয়া না পাওয়া নিয়ে সরকারপন্থি আমলাদের বিরোধ চরমে

0
54
Print Friendly, PDF & Email

পাওয়া না পাওয়ার হিসেব-নিকেশে গড়মিল দেখা দেওয়ায় সরকারের শেষ সময়ে সরকারপন্থি আমলাদের বিরোধ এখন চরমে।

মহাজোট সরকারের ৪ বছর ৯ মাসের শেষ দিন আজ। সরকারের এ দীর্ঘ সময়ে যারা কোনঠাসা হয়েছিলেন, তারা এখন ক্ষোভে ফেটে পরছেন। মেয়াদ যত ফুরিয়ে আসছে, চেপে রাখা ক্ষোভের আগুন ততই প্রকাশ্যে রূপ নিচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, মহাজোট সরকারের প্রকৃত সমর্থক আমালারা গত পৌনে পাঁচ বছরে তাদের আশা অনুযায়ী মূল্যায়িত না হওয়ায় এবং তার বিপরীতে দলীয় সাইনবোর্ড রাতারাতি গায়ে লাগিয়ে এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাবাদীরা গুরুত্বপূর্ণ পদ আঁকড়ে থাকায় এ সংকট জগদ্দল পাথরের মতো আরও ঘনীভূত হয়েছে।

প্রাইমনিউ.কম.বিডি’র এ প্রতিবেদকের কাছে আওয়ামীপন্থি ত্যাগী কর্মকর্তাদের কয়েকজন এমন ক্ষোভের কথা জানিয়ে বলেন, মহাজোট সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমেই বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাবাদী আমলাকে স্থান করে দেওয়ায় সরকারকে আজ ঘরে-বাইরে বিপাকে পড়তে হচ্ছে।’ তারা মনে করছেন, ভুল অনেক হয়েছে, আর না। এবার তাদের বিদায় করে শাস্তির মুখোমুখি করতেই হবে। তা না হলে দল আবার ক্ষমতায় এলে এরা আওয়ামী লীগসহ সরকারকে ভয়ংকর বিপাকে ফেলবে।

বিরোধের অন্যতম কারণ উল্লেখ করে তারা জানান, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামীপন্থি ত্যাগী কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। কাউকে বিলম্বে করা হয়েছে, আবার কেউ কেউ থেকে গেছেন একেবারে দৃষ্টির আড়ালে। প্রথমেই এক শ্রেণির সুবিধাবাদী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা নানা সূত্র ও সিঁড়ি ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি বাগিয়ে নেন। যাদের কেউ কেউ চারদলীয় জোট সরকারের লোক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অথচ রাতারাতি তেল মেরে এরাই বড় আওয়ামী লীগার হিসেবে নিজেদের জাহির করেন। কেউ কেউ আবার নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে আওয়ামী পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তাও গড়েন। একবার যিনি গুরুত্বপূর্ণ পদের দেখা পেয়েছেন তাকে আর সেখান থেকে নামানো সম্ভব হয়নি, বরং দিনে দিনে ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করে উপরের দিকে ওঠে গেছেন। এর ফলে যোগ্যতা ও ত্যাগ অনুযায়ী প্রকৃত আওয়ামীপন্থি কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পোস্টিং পাওয়া তো দূরের কথা, সময়মতো পদোন্নতি পাওয়া নিয়েও পদে পদে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।

তারা আরো বলেন, বাস্তবতা এমন পর্যায়ে গেছে, শুরুতেই যেসব সুবিধাবাদী আমলা বড় ক্ষমতার খুঁটি পেয়ে গিয়েছিলেন তারা নিচের দিকের প্রভাবশালীদের সব সময় কোণঠাসা করে রেখেছেন। আর কেউ কেউ চেয়েছিলেন এসব ত্যাগী কর্মকর্তা যেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ধারে-কাছেই ঘেঁষতে না পারেন। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। সত্যিকারার্থে যেসব কর্মকর্তা নিঃস্বার্থভাবে আওয়ামী লীগকে ভালোবাসতেন তাদের অনেককে সব দিক থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের একজন যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে বলেন, গত চারদলীয় জোট সরকারের সময় প্রমার্জন করে পছন্দের আমলাদের দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে সচিব পদে তুলে আনলেও এ সুযোগকে এবার কাজে লাগাতে দেওয়া হয়নি। এর পেছনেও ছিল ওই এক শ্রেণির ক্ষমতাধর আমলার ভূমিকা। এমনকি এক বছর আগে থেকে যাদের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব ছিল; তাদের এখন পর্যন্ত শক্ত হাতে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। বিপরীতে নিজেদের ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করতে ক্ষমতাধররা চাকরির মেয়াদ আরও দু’বছর বাড়িয়ে নিয়েছেন। এতে করে শত শত কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকে যাওয়াসহ সরকারি বাসা বরাদ্দ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ভূমি মন্ত্রনালয়ের সচিব পদ মর্যাদার একজন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, প্রশাসনে ক্ষমতার কর্মকর্তার সংখ্যা খুব বেশি নয়। উচ্চ পর্যায়ে এ সারির কর্মকর্তা রয়েছেন হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র । তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ের সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহিদ খান। ’

তিনি আরো বলেন, তাদের আর একজন এখন আছেন বিদেশী সংস্থায়। অথচ তিনি যখন দেশে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন, তখন কম ক্ষমতা দেখাননি। প্রভাব খাটিয়ে নিজের ভাইকে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে দিয়েছেন। সাভারে সরকারি একটি অফিসে তার ভাই ছাড়া অন্য কারও কাজ পাওয়ার সুযোগই ছিল না। প্রতিবাদ করায় তৎকালীন সচিব পদমর্যাদার দফতর প্রধানকে চাকরি ছাড়তে হয়েছিল। তিনি ঘনঘন বিদেশ যেতেন ছোট ল্যাগেজ নিয়ে, আর ফিরতেন সারা রাজ্যের লাগেজ ভর্তি করে। বিদেশে কেনাকাটা করতেন উপহার পাওয়া ক্রেডিড কার্ডে। বর্তমানে এ তালিকায় যারা দেশের মধ্যে কর্মরত আছেন তাদের কারও বৈধ আয়ের সঙ্গে ব্যায়ের কোনো মিল নেই।

অভিযোগকারী কয়েকজন প্রাইমনিউজ.কম.বিডিকে আরো বলেন, কোনো কারণে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করতে না পারলে চাকরিচ্যুতিসহ সব নিপীড়ন নেমে আসবে আওয়ামীপন্থি চিহ্নিত কর্মকর্তাদের ওপর। আর যারা সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন, তাদের তো হারানোর কিছুই নেই। কেউ আছেন চুক্তিতে, কেউ আবার অবসরে যাওয়ার পথে।’

তারা বলেন,‘চাকরি থেকে বিদায় নিয়ে তারা রাতারাতি সুশীল হিসেবে সমাজে স্বীকৃতি পেয়ে যাবেন। টিভিতে টকশো আর পত্রিকায় কলাম লিখে সময় কাটাবেন। আর অবস্থা বেশি বেগতিক হলে বিদেশে পাড়ি জমাবেন। কিন্তু সব ভোগান্তি আমাদের মত কিছু কর্মকর্তাকে ভোগ করতে হবে।’ তাই শেষ সময় হলেও তারা ওইসব দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার মুখোশ খুলে দিতে চান।’

শেয়ার করুন