অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে বিতর্ক রাজনীতির ‘খেলায়’ দুই পক্ষই জিততে চায়

0
66
Print Friendly, PDF & Email

রাজনৈতিক সংকট সমাধান না হওয়ার দায় আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কেউই নিতে চায় না। তাই দুই দলই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থেকে প্রস্তাব-পাল্টা প্রস্তাব দিচ্ছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভোটের আগে রাজনীতির এই ‘খেলায়’ দুই পক্ষই জিততে চায়। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আলোচনার কথা বললেও কার্যত সমঝোতা বা সংলাপের কোনো পরিবেশ তৈরি হয়নি।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে তিন দিন পর পাল্টা প্রস্তাব দিয়েছে। সেই প্রস্তাব গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের কাছে পৌঁছে দিয়ে আলোচনা শুরুর অনুরোধ করা হয়েছে। এ বিষয়ে আজ আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা ছিল। তবে গত রাতে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে ক্ষমতাসীন দল। আজ বুধবার সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেও তা ‘অনিবার্য কারণবশত’ স্থগিত করা হয়।
অবশ্য বিএনপির প্রস্তাব যে অসাংবিধানিক এবং গ্রহণযোগ্য নয়, তা ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা গণমাধ্যমে বলেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও গতকাল দিনাজপুরের জনসভায় নেতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রীর প্রস্তাবকে পশ্চাৎপদ বলে মন্তব্য করেন।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান প্রথম আলোকে বলেন, পর্দার অন্তরালে আলোচনা না হলে সংকটের সমাধান হবে না। এসব প্রস্তাব-পাল্টা প্রস্তাবের মাধ্যমে দুই দলই দেখাতে চায়, তারা সংকট সমাধানে আগ্রহী। সংকটের জন্য তারা কেউই দায় নিতে চায় না। দুই পক্ষই নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থেকে ভোটের আগেই মনস্তাত্ত্বিক জয় চায়। ভোটারদের দেখাতে চায়, তাদের দাবি অন্য পক্ষ মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে।
গত সোমবার বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। ওই প্রস্তাবে বলা হয়, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ২০ জন উপদেষ্টার মধ্য থেকে ১০ জনকে নির্বাচনকালীন সরকারের উপদেষ্টা করা হবে। আর প্রধান উপদেষ্টা দুই দলের মতৈক্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু খালেদা জিয়ার এই প্রস্তাব নিয়ে দলের মধ্যেই বিরূপ আলোচনা শুরু হয়েছে। স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যও বলেছেন, প্রস্তাব নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট নন। এ প্রস্তাব নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে কোনো সমাধান আসবে না।
বিএনপির এই প্রস্তাব শুধু একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকারের জন্য প্রয়োগ করা যাবে। এবং সে জন্য সংবিধানও সংশোধন করতে হবে। দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলেছেন, বিএনপির মতো একটি রাজনৈতিক দলের কাছে এমন প্রস্তাব আশা করতে পারেনি দেশের মানুষ। এ প্রস্তাব যদি মানাও হয়, তাহলে এর পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের আগে আবার নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে সংকট তৈরি হবে।
বিএনপির কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের তিন দিন পর দলীয় চেয়ারপারসন সংবাদ সম্মেলন করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেই বক্তব্যের সবচেয়ে দুর্বল অংশ হলো নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে দেওয়া তাঁর প্রস্তাবটি। অথচ সংবাদ সম্মেলন করার উদ্দেশ্যই ছিল এটি। ওই নেতা বলেন, দুটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মোট উপদেষ্টা হলেন ১৮ জন। আর দলীয় চেয়ারপারসন বললেন ২০ জন। এর মধ্যে আবার চারজন মারা গেছেন। কেউ কেউ আবার শারীরিকভাবে দায়িত্ব পালনে অক্ষম। এ বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়েই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দেওয়া ঠিক হয়নি। তিনি বলেন, তাঁদের প্রস্তাবটি দলের নেতাদের কাছেই ‘হাস্যকর’ বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
এদিকে খালেদা জিয়ার এই প্রস্তাব নিয়ে সংসদে যাওয়ার কথা ভাবছে বিরোধী দল। এ নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার রাতে ১৮-দলীয় জোটের সাংসদদের সঙ্গে আলাপ করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন।
জানতে চাইলে স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ প্রস্তাব নিয়ে বেশি দূর এগোনোর সুযোগ নেই। বিএনপির বেশির ভাগ নেতাই মনে করেন এটা মানার কোনো কারণ সরকারের নেই। ওই নেতা বলেন, এই প্রস্তাব তৈরির সঙ্গে বিএনপির নেতারা জড়িত নন। এটা দলের অরাজনৈতিক ব্যক্তি, গুলশান কার্যালয়ের কর্মকর্তা, সাবেক আমলা ও দলের ‘থিঙ্ক ট্যাংক’ নামে পরিচিত মহল করেছে। রাজনীতিবিদেরা এর সঙ্গে থাকলে এ ধরনের একটি প্রস্তাব দেওয়া হতো না। ওই নেতা বলেন, বিএনপি এখন অযোগ্য কর্মচারীনির্ভর হয়ে পড়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ১২ জন নেতার সঙ্গে গতকাল এ প্রতিবেদকের কথা হয়েছে। তাঁরা বলেছেন, প্রস্তাবটি তৈরির সঙ্গে তাঁরা জড়িত ছিলেন না। চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত লোকজন এটা করেছেন। স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, এতে তাঁরা অপ্রস্তুত হয়েছেন। বিদেশিরাও প্রস্তাবটি ভালোভাবে নেননি। ১৮-দলীয় জোটের শরিকেরাও এ বিষয়ে জানতেন না।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, সমঝোতার ব্যাপারে তাঁরা এখনো আশাবাদী। তাঁর মতে, প্রধানমন্ত্রী একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতাও দিয়েছেন। এখন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধান হবে।
এদিকে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো গতকাল সৈয়দ আশরাফ ও মির্জা ফখরুলের সঙ্গে পৃথকভাবে টেলিফোনে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে খালেদা জিয়ার প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সাংবাদিকদের বলেছেন, মির্জা ফখরুলের সঙ্গে আলাপকালে তারানকো বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন।
আওয়ামী লীগে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া: সরকারি দল খালেদা জিয়ার প্রস্তাবকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করলেও এটি সংবিধানপরিপন্থী এবং এর যেসব দুর্বল দিক রয়েছে, তা তুলে ধরতে চায়। এ জন্য আজ বুধবার ধানমন্ডির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছিল। তবে রাতে অজ্ঞাত কারণে তা স্থগিত করা হয়।
দলটি সংকট নিরসন না হওয়ার অপবাদ নিজের কাঁধে নিতে চায় না। এ জন্য সংলাপের দরজা খোলা রাখার কৌশল নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের মধ্যেই নতুন কিছু খুঁজে বের করা যায় কি না, তার ওপর সংলাপ প্রক্রিয়া নিবদ্ধ রাখার চেষ্টা করবে দলটি।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে বিরোধীদলীয় নেতা মেনে নেবেন না, এটা জানাই ছিল। তার পরও আলোচনার সূত্রপাত করা এবং বড় ধরনের সংঘাত এড়াতেই প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণে সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দেন। ওই নেতারা মনে করেন, বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাব উদ্ভট। এ অবস্থায় দুই প্রস্তাব আঁকড়ে ধরে সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।
তবে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সংলাপের দরজা খোলা আছে। সংলাপ সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে হতে হবে। বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাব সংবিধানসম্মত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই প্রস্তাব যে বাস্তবসম্মত নয়, ইতিমধ্যে তা সবাই জেনে গেছে। গণমাধ্যমেও এর নানা দুর্বল দিক এসেছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা ও মন্ত্রী বলেন, মির্জা ফখরুল চিঠি দিয়ে সংলাপের আহ্বান জানাবেন, এমন ধারণা তাঁদের ছিল না। প্রধানমন্ত্রীও বিরোধীদলীয় নেতাকে ফোন করতে পারেন। আজ ১৪ দলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক রয়েছে। এখানে বিরোধীদলীয় নেতাকে ফোন করার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।

শেয়ার করুন