বি দ্যু ৎ খা ত: সরকারের ৫ বছর অগ্রগতির রেকর্ড, তবে টেকসই নয়

0
31
Print Friendly, PDF & Email

বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সরকারের প্রথম বছরের প্রায় পুরোটাই গেছে পরিকল্পনা করতে। তার পর থেকে চুক্তি সই ও উৎপাদন বৃদ্ধির যে ধারা শুরু হয় তা এখনো অব্যাহত আছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত ক্ষমতা ও প্রকৃত উৎপাদন বৃদ্ধি—এই দুই ক্ষেত্রেই বর্তমান সরকার রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। তবে এই সাফল্য টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়নি।
সরকারের পঞ্চম বছরে বিদ্যুৎ খাতে আরও একটি বড় সাফল্য ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হওয়া। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে উপ-আঞ্চলিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতার দীর্ঘকালের কথিত বিষয় বাস্তবে রূপায়িত হওয়ার ধারা সূচিত হয়েছে।
গত পৌনে পাঁচ বছরের শাসনমেয়াদে ভাড়াভিত্তিক, দ্রুত ভাড়াভিত্তিক ও পিকিং কেন্দ্রসহ মোট ৫৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়েছে। ফলে ২০০৯ সালের জানুয়ারির চার হাজার ৯৪২ মেগাওয়াটের তুলনায় দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থাপিত ক্ষমতা বেড়ে হয়েছে নয় হাজার ৭১৩ মেগাওয়াট। এখনো ৩৩টি নতুন কেন্দ্র চালুর প্রক্রিয়াধীন আছে।
সর্বোচ্চ উৎপাদন ২০০৯ সালে ছিল তিন হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। এখন তা বেড়ে হয়েছে ছয় হাজার ৬৭৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ সর্বোচ্চ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১০৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। ভারত থেকে আসা বিদ্যুৎ এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়। বিদ্যুৎ খাতে পদ্ধতিগত লোকসান কমেছে। মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়েছে। বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে প্রায় ৬২ শতাংশ মানুষ। অতীতে কোনো একটি সরকারের শাসনমেয়াদে এমন সাফল্যের নজির নেই।
তবে এই বিপুল সাফল্য ও অগ্রগতির রেকর্ড সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাত স্থিতিশীল হয়নি। দূর হয়নি অস্বস্তিও। এর প্রধান কারণ, সরকারের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাভুক্ত ও বাস্তবায়নাধীন একটিও বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র (বেইজলোড প্ল্যান্ট) পূর্ণ ক্ষমতায় চালু হয়নি। সরকারি খাতের হরিপুর ৪৫০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি উদ্বোধন করা হলেও সেখানে জ্বালানির সরবরাহ অপ্রতুল হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্য বড় কেন্দ্রগুলোর একটিও বছর খানেকের আগে চালু হওয়ার পর্যায়ে নেই।
এ অবস্থায় বিদ্যুতের জন্য অতিমাত্রায় নির্ভর করতে হচ্ছে ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর। অথচ সেগুলো করা হয়েছিল বিদ্যুতের আশু সংকট মোকাবিলায় তিন ও পাঁচ বছরের জন্য। এর অনেকগুলো কেন্দ্রের ইতিমধ্যে চুক্তির মেয়াদ শেষে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার কথা। গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বড় কেন্দ্রগুলো চালু না হওয়ায় সরকার বাধ্য হচ্ছে ওই কেন্দ্রগুলোর সঙ্গেই চুক্তি নবায়ন করতে। সেই প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে।
তা ছাড়া বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে এখনো ঘাটতি আছে। বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা আছে। সরকার ইচ্ছা করলেও লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণ করার অবস্থা নেই। তেলভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতার কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন মূল্য বেড়েছে। ফলে পাঁচবার দাম বাড়িয়েও বিদ্যুৎ খাত ভর্তুকিমুক্ত করা যায়নি।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির সংস্থান ও সরবরাহ, নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পরিকল্পিত বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রভৃতি সরকারের সামনে এখনো চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কাজ এগোলেও কয়লাভিত্তিক অন্য প্রকল্পগুলোর কাজে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। এমনকি দেশের কয়লা দিয়ে বড়পুকুরিয়ায় যে ২৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন বাড়ানোর কথা তা-ও বিলম্বিত হচ্ছে। অথচ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার কথা কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের মাধ্যমে।
সরকারি-বেসরকারি খাতের কয়েকজন বিশ্লেষক বলেন, বড় কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে না আসা এবং ছোট কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা দীর্ঘায়িত হলে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন মূল্য কমবে না। ফলে ভর্তুকি কমানো সম্ভব হবে না। এর বিরূপ প্রভাব পড়বে সামষ্টিক অর্থনীতিতে।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিদ্যুৎ ও জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে ক্ষমতা, তাতে ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার সমস্যা থেকেই গেছে। কারণ, বিদ্যুৎ সমস্যার যে সমাধান করা হয়েছে, তা টেকসই নয়। যেকোনো সময় সমস্যা দেখা দেওয়ার মতো অনিশ্চয়তা কাটেনি।
তামিম বলেন, এর কারণ দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ সরবরাহ করার মতো কেন্দ্রগুলো যেমন স্থাপিত হয়নি, তেমনি এসব কেন্দ্রের জ্বালানির সংস্থানও করা যায়নি। দ্রুত এগুলো করা না গেলে ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রের মতো অস্থায়ী সমাধানের ওপরই নির্ভর করতে হবে। তাতে পরিস্থিতি এমন হওয়াও অস্বাভাবিক নয়, যাতে বিদ্যুতের অভাবে অর্থনীতি মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়তে পারে।

শেয়ার করুন