সিটি নির্বাচন: মন্ত্রী জানেন না সিদ্ধান্তের কথা প্রধানমন্ত্রী অবাক হন

0
56
Print Friendly, PDF & Email

পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ জানতে প্রধানমন্ত্রী ডেকে পাঠান স্থানীয় সরকার, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী এবং দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে। তিনি জানতে চান- মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কেন নির্বাচন দেয়া হল। নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল কিনা। নির্বাচনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন সরকারের অনুমতি নিয়েছিল কিনা। মন্ত্রীর সরাসরি জবাব- এ ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত হন এবং অবাক হয়ে জানতে চান- আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন, অথচ আপনি কিছুই জানেন না! ‘আমি সত্যিই এ ব্যাপারে কিছু জানি না’, বললেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা না করে, এমনকি খোদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে না জানিয়ে, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেশের ৫টি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন করার জন্য সচিব তার একক সিদ্ধান্তে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি প্রেরণ করেছিলেন। আর এই ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি হলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান। মন্ত্রণালয়ের চিঠির প্রেক্ষিতে যথারীতি ইসি নির্বাচনের আয়োজন করে এবং সবক’টিতে সরকারি দলের ভরাডুবি হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নির্বাচনে ভরাডুবির কারণ খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য।
রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক্রমে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের আয়োজন করে। সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা ছিল, যেহেতু বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে সরকারের জনপ্রিয়তা নিম্ন মুখী তাই মেয়াদ শেষে নির্বাচন হলে সরকার দলীয় প্রার্থীদের বিজয় অনিশ্চিত হতে পারে। এজন্যই তাদের বিজয় নিশ্চিত করতে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেভাগে চারটি সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু সবক’টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা পরাজিত হলে সারা দেশে মাঠ পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে হতাশা নেমে আসে। সরকারের অবস্থানও নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
এদিকে মেয়াদ শেষ না হওয়ায় নব নির্বাচিত মেয়রদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত হয়, যা বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হয়। এ অবস্থায় নবগঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ঘোষণা করা হয়। যেহেতু, গাজীপুর নির্বাচনী এলাকাটি আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত, তাই ধারণা ছিল এখানকার নির্বাচনে জিততে পারলে অপর চারটি সিটি করপোরেশনের পরাজয়ের ধকল কাটানো সম্ভব হবে। কর্মীদের মন চাঙ্গা হবে এবং সরকারেরও মান রক্ষা হবে। কিন্তু পরাজয়ের ধারাবাহিকতায় গাজীপুরেও বিরোধীদলের প্রার্থীর কাছে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হেরে যান সরকারি দলের প্রার্থী। একের পর এক পরাজয় দেশব্যাপী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যা সরকারের জন্য মহা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই সিরিজ পরাজয় দলের শীর্ষ মহলকে ভাবিত করে তোলে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হন।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ জানতে প্রধানমন্ত্রী ডেকে পাঠান স্থানীয় সরকার, সমবায় ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রী এবং দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে। তিনি জানতে চান- মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কেন নির্বাচন দেয়া হল। নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল কিনা। নির্বাচনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন সরকারের অনুমতি নিয়েছিল কিনা।
মন্ত্রীর সরাসরি জবাব- এ ব্যাপারে তিনি কিছুই জানেন না। মন্ত্রীর বক্তব্য শুনে প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত হন এবং অবাক হয়ে জানতে চান- আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন, অথচ আপনি কিছুই জানেন না!
‘আমি সত্যিই এ ব্যাপারে কিছু জানি না’, বললেন, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
ক্ষুব্ধ প্রধানমন্ত্রী এবার তার উপদেষ্টা এইচটি ইমামকে দায়িত্ব দিলেন- কার অনুমতি নিয়ে নির্বাচন করা হলো, বিষয়টি খতিয়ে দেখতে। এরপর এইচটি ইমাম প্রথমে নির্বাচন কমিশনের কাছে এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চাইলেন। সূত্রমতে, নির্বাচন কমিশন উপদেষ্টাকে জানায় যে, তারা মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাওয়ার পর নির্বাচনের আয়োজন করেছে। ইসিতে এ সংক্রান্ত চিঠিও সংরক্ষিত আছে।
এরপর এইচটি ইমাম স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে খোঁজখবর নেন। ফাইলপত্র ঘাটতে গিয়ে আসল রহস্যটি বেরিয়ে পড়ে।
সূত্রমতে, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে নির্বাচন কমিশনকে যে চিঠি প্রেরণ করা হয়েছিল সেই ফাইলে মন্ত্রীর স্বাক্ষর নেই। ফাইলটি সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান পর্যন্ত অনুমোদিত হয়েছে। ফাইলটি সচিব মন্ত্রীর কাছে না পাঠিয়ে নিজেই সরাসরি সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। স্বাক্ষর রয়েছে।
জানা যায়, সচিব ফাইলে অনুমোদন দিয়ে নিচের দিকে পাঠিয়ে চিঠি ইস্যুর নির্দেশ দেন। সচিবের একক সিদ্ধান্তে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সেকশন অফিসারকে দিয়ে চিঠি তৈরি করিয়ে ইসি বরাবরে প্রেরণ করা হয়। এবার শীর্ষ মহলের কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার হয় যে, মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে কিছু না জানিয়ে এবং তাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান নিজেই এত বড় একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা সরকারের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সচিবের এই ঔদ্ধত্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভীষণ ক্ষুব্ধ হন এবং শহীদ খানকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে অন্যত্র বদলির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু করিৎকর্মা শহীদ খান বসে থাকেন নি। তিনিও বদলি ঠেকাতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেন। তথ্যমতে, প্রধানমন্ত্রীর সচিব মোল্লা ওয়াহেদুজ্জামানসহ আমলাদের একটি প্রভাবশালী গ্রুপের হস্তক্ষেপে শহীদ খান এ যাত্রায় বদলি ঠেকাতে সক্ষম হয়েছেন এবং স্বপদে বহাল আছেন।
উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই আবু আলম মো. শহীদ খান সহকারী সচিব থেকে এক লাফে অতিরিক্ত সচিব এবং পরে সচিব পদে উন্নীত হন। বর্তমান সরকারের শুরু থেকে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেন। সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব, পরে সচিব এবং রাতারাতি প্রভাবশালী হয়ে উঠার পেছনে যুক্তি বা অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছিল, বিগত বিএনপি সরকারের আমলে তিনি বঞ্চিত এবং নির্যাতিত। বস্তুত, খতিয়ে দেখলে বেরিয়ে আসবে, বিএনপি তার সঙ্গে কোনো অন্যায় আচরণ করেনি। বরং তার অনেক উপকার করেছে।
আবু আলম শহীদ খান বিএনপির আগের আমলে অর্থাৎ ৯১-৯৬ সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সহকারী সচিব পদে গুরুত্বপূর্ণ শাখায় দায়িত্বে ছিলেন। ওই সময়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে সংঘটিত বহুল আলোচিত সাইপেম কেলেংকারিতে তিনি সরাসরি জড়িত ছিলেন। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে সাইপেম কেলেংকারি নিয়ে বিএনপির মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে প্রধান আসামি করে মামলা হয়। আবু আলম যেহেতু এ ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন তাই তাকেও আসামি করতে বাধ্য হয় তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো। এ মামলায় চার্জশীট হয়। ওই সময় আলম প্রধানমন্ত্রীর দফতরে কর্মরত ছিলেন। যেহেতু মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি, তাই তাকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বাধ্য হয় ওএসডি করতে। সেই থেকে তিনি দীর্ঘকাল ওএসডি ছিলেন। সাইপেম মামলাটিতে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা- মন্ত্রী জড়িত। তাই মামলাটিকে বিএনপি আমলে প্রভাবিত করে খারিজের ব্যবস্থা করা হয়। আসামিদের খালাস দেয়া হয়। আবু আলমও এই সুযোগে বেঁচে যান।
হিসাব করলে দেখা যায়, চাকরি জীবনে আবু আলমের তেমন বাস্তব কোন অভিজ্ঞতা নেই। কারণ, সিনিয়র সহকারী সচিব পদে থেকে দীর্ঘকাল তিনি ওএসডি রয়েছেন। তারপরও সরকার তাকে রাতারাতি পদোন্নতি দিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দিয়েছে। তারই খেসারত এখন সরকারকে দিতে হচ্ছে।

শেয়ার করুন