মুফতি ইজাহার ও ছেলে পলাতক, আহত একজন মারা গেছেন

0
172
Print Friendly, PDF & Email

চট্টগ্রামের লালখান বাজারের জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন গত সোমবার গভীর রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা গেছেন। তাঁর নাম হাবিবুর রহমান। তিনি ওই মাদ্রাসার ছাত্র বলে জানা গেছে। আহত অপর তিনজনের অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
বোমা বানানোর সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ এনে পুলিশ খুলশী থানায় দুটি মামলা করেছেন। বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে ও অ্যাসিড আইনে করা মামলা দুটিতে মাদ্রাসার পরিচালক ও অধ্যক্ষ মুফতি ইজাহারুল ইসলাম, তাঁর ছেলে হারুন ইজাহারসহ ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। অন্যরা হলেন সোমবার মাদ্রাসা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ শিক্ষক-কর্মচারী, আহত চার ব্যক্তি ও অপর একজন মাদ্রাসার কর্মী। এ ছাড়া অনেক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিও জড়িত আছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেজামে ইসলাম পার্টির একাংশের সভাপতি ও হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির মুফতি ইজাহার সোমবার বিকেল পাঁচটার পর থেকে পলাতক রয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর গতকাল মঙ্গলবার চাঁদপুরে সাংবাদিকদের বলেছেন, ইজাহার ও তাঁর সহচরদের গ্রেপ্তার করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, হেফাজতে ইসলাম হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পাঁয়তারা চালাচ্ছে।
পুলিশ বলছে, মুফতি ইজাহার ও তাঁর ছেলে হারুনকে ধরার জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
অবশ্য সোমবার বিস্ফোরণের পর দিনভর মুফতি ইজাহার মাদ্রাসায় ছিলেন। তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন। বিকেল পাঁচটায় পুলিশ কমিশনার ঘটনাস্থলে যখন যান, তখনো তাঁকে তাঁর কক্ষে দেখা গেছে। এর পর থেকে তাঁকে আর দেখা যায়নি। তাঁকে তখন কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা প্রথমে নিশ্চিত ছিলাম না এটা কী ধরনের বিস্ফোরণ। যখন বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে বোমা বিস্ফোরণের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তখন থেকে তাঁকে আর পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মুফতি ইজাহারকে গ্রেপ্তারের জন্য সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে।’
গতকাল লালখান মাদ্রাসায় গিয়ে কোনো ছাত্র-শিক্ষককে দেখা যায়নি। পুলিশের ১৫ জন সদস্য ঘটনাস্থল পাহারায় রয়েছেন। খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাইনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, গতকাল ধ্বংস্তূপ থেকে আলামত সংগ্রহের সময় আরও একটি অবিস্ফোরিত তাজা বোমা উদ্ধার করা হয়েছে।
গত সোমবার বেলা ১১টার দিকে লালখান বাজার মাদ্রাসার ছাত্রাবাসের তিনতলার একটি কক্ষে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। ওই দিন সন্ধ্যায় পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে ওই কক্ষের ধ্বংস্তূপ থেকে অবিস্ফোরিত তিনটি হাতবোমা এবং বোমা তৈরির উপাদান লোহার পাইপ ও মার্বেল উদ্ধার করে। এরপর মাদ্রাসা চত্বরে অবস্থিত মুফতি ইজাহারের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ১৮ বোতল অ্যাসিড-জাতীয় পদার্থ। এ ছাড়া মঙ্গলবার লালখান বাজার মাদ্রাসা থেকে আটক চার শিক্ষকসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁরা হলেন হাবিবুর রহমান, ইছহাক, মনির হোসেন, আবদুল মান্নান ও তফসির আহমেদ।
এই পাঁচজনকে পরে পুলিশের করা দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে মহানগর হাকিম নূরে আলম ভূঁইয়ার আদালতে পাঁচজনকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করে পুলিশ। এই আবেদনের ওপর আজ বুধবার শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
এ ছাড়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নূরনবী, সালমান ও জোবায়ের আহমেদ এবং নিহত হাবিবুরকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করে পুলিশ। পরে আবেদন সংশোধন করে তা থেকে মৃত আসামি হাবিবুর রহমানের নাম বাদ দেওয়া হয়।
তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক: মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত অপর তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাঁদের মধ্যে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে পাস করা মো. নূরনবীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পুলিশ হেফাজতে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁর শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।
আহত অপর দুজনের মধ্যে জুবায়ের আহমেদ ও মো. সালমানের শরীরের যথাক্রমে ৮০ শতাংশ ও ১৭ শতাংশ পুড়ে গেছে। দুজনই মাদ্রাসার নবাগত ছাত্র। তাঁদের সঙ্গে গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। জুবায়ের বলেন, তাঁর বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে। আট দিন আগে এই মাদ্রাসায় এসেছেন। তাঁর দাবি, ‘গ্যাসের চুলায় রান্না করার সময় বিস্ফোরণ ঘটেছে।’
আর সালমান জানান, তাঁর বাড়ি হবিগঞ্জের বাহুবলে। তিনি ২৩ দিন আগে এই মাদ্রাসায় ভর্তি হন। বিস্ফোরণের কারণ জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, ‘আমি তখন ঘুমাচ্ছিলাম। কী হয়েছে বলতে পারব না।’
বার্ন ইউনিটের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মৃণাল কান্তি দাশ বলেন, আহতদের সবার শরীর জ্বলসে গেছে। কারও শরীরে কোনো স্প্লিন্টার পাওয়া যায়নি। রসায়নিক-জাতীয় পদার্থের কারণে এমনটা হয়েছে কি না, তা বলা যাচ্ছে না।
অবশ্য বিস্ফোরণের পর পর মুফতি ইজাহারুল ইসলামসহ মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল, ল্যাপটপ কিংবা আইপিএস কিংবা চুলা থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তবে তাঁদের দাবি নাকচ করে দিয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শহীদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ঘরটির একটি পাশে বিস্ফোরণ ঘটেছে। এর ফলে আগুন লেগেছে। সেখানে উপস্থিত লোকজন আহত হয় আগুনে। এক পাশে থাকায় আহতদের শরীরে কোনো স্প্লিন্টার লাগেনি।’ তিনি আরও বলেন, ওই কক্ষের দেয়ালে স্প্লিন্টারের চিহ্ন আছে। পুলিশ পরে সেখান থেকে বোমায় ব্যবহারের জন্য অনেক মার্বেল উদ্ধার করেছে।
বোমা তৈরির লক্ষ্য খুঁজছে পুলিশ: চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) বনজ কুমার মজুমদার গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, লালখান বাজার মাদ্রাসায় কেন বোমা তৈরি (পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হাতে তৈরি গ্রেনেড) করা হচ্ছিল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। গতকাল পর্যন্ত কোনো কারণ জানা যায়নি। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
হাটহাজারীতে প্রতিবাদ সভা: লালখান বাজার মাদ্রাসায় বিস্ফোরণের ঘটনাকে সম্পূর্ণ ‘ষড়যন্ত্রমূলক ও সাজানো নাটক’ বলে দাবি করে গতকাল হাটহাজারীতে প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করেছে কওমি মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদ।
মিছিল শেষে হাটহাজারী ডাকবাংলো চত্বরে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির ও হাটহাজারী মাদ্রাসার মুহাদ্দিস হাফেজ শামসুল আলম।
বক্তারা বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ ও নাস্তিক্যবাদের সহায়ক ক্ষমতাসীন মহল দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসের ধারক-বাহক কওমি মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করার জন্য ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছে। তারা কখনো বোমাবাজির নাটক সাজানোর প্রয়াস চালাচ্ছে, কখনো কথিত জঙ্গিবাদের ধুয়া তুলে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। বক্তারা অবিলম্বে লালখান বাজার মাদ্রাসা থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করে এর স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

শেয়ার করুন