কীভাবে ব্যয় হয় নোবেলজয়ীদের অর্থ

0
54
Print Friendly, PDF & Email

বিশ্বে নোবেল পুরস্কার এখনও সবচেয়ে বড় স্বীকৃতির নাম। প্রতিবছর মোট ছয়টি ক্ষেত্রে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। এবারও গত সোমবার থেকে শুরু হয়েছে নোবেল পুরস্কার দেয়া। প্রথমদিনে চিকিৎসায় যৌথভাবে নোবেল পেলেন জেমস ই. রথম্যান, র‌্যান্ডি ডব্লিউ শেকম্যান ও টমাস সি. সুদফ।

তবে আলোচনাটা আসলে এবার কারা নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন তাদের নিয়ে নয় বরং নোবলেজয়ীরা কীভাবে তাদের প্রাপ্ত পুরস্কারের অর্থ ব্যয় করেন তা নিয়ে। কারণ নোবেল পুরস্কারে প্রাপ্ত অর্থের পরিমান সাড়ে বারো লাখ মার্কিন ডলার।

নোবেলজয়ীরা যখন তাদের পুরস্কারের অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেন তখন তারা বেশ উদ্ভাবন পটুতার পরিচয় দেন। যেমন স্যার পল নার্স ২০০১ সালে চিকিৎসায় নোবেল পাওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন,তার সাধের মোটরবাইকের আধুনিকায়নের জন্য তিনি পাওয়া অর্থ খরচ করবেন। তার আগে ১৯৯৩ সালে নোবেল বিজয়ী রিচার্ড রবার্টস তার বাড়ির সামনে বল খেলার জন্য একটা ছোট মাঠ বানান পুরস্কারের অর্থ দিয়ে।অন্যদিকে ২০০৪ সালে নোবেলজয়ী অস্ট্রিয়ান লেখক এলফ্রিদে জেলিনেক পুরস্কারের অর্থকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বলে দাবি করেন।

তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে পুরস্কারের অর্থ খরচ করার ক্ষেত্রে অনেককিছুই ঘটতে পারে।অনেক সময় দেখা যায় তারা পুরস্কারের অর্থ বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে কিংবা বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে দান করে দেন।

তবে নোবেলজয়ীদের অভ্যেস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক লার্স হেইকেনসন বলেন, ‘নোবেলজয়ীদের মধ্যে কেনাকাটা করার অভ্যাস অতটা নেই। আমার মনে হয় এটা নির্ভর করে তারা কোন দেশ থেকে আসছে,তাদের ব্যক্তিগত উপার্জন কেমন বা জীবিকা কি ইত্যাদির ওপর।’

তিনি আরো বলেন, ‘পুরস্কারে পাওয়া অর্থ দিয়ে কি করবেন যারা এটা ভাবেন তাদের জন্য ভূমি ক্রয় একটা জনপ্রিয় পন্থা। যদিও শুনতে বা গুনতে পুরস্কারের অর্থ অনেক মনে হয় কিন্তু মাঝে মধ্যেই এই অর্থ কয়েকজন বিজয়ীর মধ্যে ভাগাভাগি হয়।মজার বিষয় হলো তখনই তাদের পুরস্কারের অর্থ খরচ সংক্রান্ত ভাবনায় তাদের ভাটা পরে।’

২০০১ সালে নোবেল পাওয়া উলফগ্যাঙ কেটেরলে তার দুই সহকর্মীর সঙ্গে পুরস্কারের অর্থ ভাগাভাগি করে নেন। তার নিজের ভাগের অর্থ তিনি তার সন্তানদের শিক্ষাখাতে ব্যয় করেন। অবশ্য তিনি একবার বলেছিলেন,‘যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে অর্ধেক অর্থ আয়কর দেবার পর আর কি থাকে’।

১৯৯৩ সালে চিকিৎসায় নোবেলজয়ী ফিলিপ শার্প তার পুরস্কারের সমুদয় অর্থই একশ বছরের পুরোনো একটি বাড়ির পেছনে ব্যয় করেন। তার বক্তব্যেই ফুটে ওঠে তার মেজাজ। তিনি বলেন, ‘আমি ওই অর্থ নিয়েছি একটা বিশাল বাড়ি কেনার জন্য। এটা খুবই সুন্দর একটা পুরাতন জায়গা। নোবেল পুরস্কারে অর্থ একটা বড় ব্যাপার কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো স্বীকৃতি।’

তবে ইদানিং যারা নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন তাদের অনেকেই কিভাবে এই অর্থ ব্যয় করবেন সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। দেখা যায়, এই সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তারা বছরের শুরুতেই সভা সেমিনারও করেন। ২০১২ সালে পদার্থবিদ্যায় যৌথ নোবেলজয়ীদের মধ্যে একজন হলেন সার্জ হারোশ্।তিনি কিভাবে এই অর্থ ব্যয় করবেন এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমি এখনও ঠিক করতে পারিনি কিভাবে পুরস্কারের অর্থ ব্যয় করবো।’ যদিও তিনি জমি ক্রয়ের দিকেই ইঙ্গিত দিয়েছেন পরবর্তীতে।

তবে শান্তিতে যারা নোবেল পান তারা এক্ষেত্রে কিছু পরিস্কার। বেশিরভাগই বিভিন্ন সংস্থা বা জণকল্যানমূলক কাজে ওই অর্থ ব্যয় করেন।যেমনটা ২০০৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনুস ২০০৬ সালে তার পুরস্কারের অর্থ দিয়ে একটি চক্ষু হাসপাতাল এবং দরিদ্রদের স্বল্পমূল্যে খাবার তুলে দেয়ার জন্য একটা ব্যবসা করা কথা বলেন। এই নোবেলজয়ী গ্রামীন ব্যাংক নামের একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। যে ব্যাংক থেকে দারিদ্রতা রোধে দরিদ্রদের সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হয়।

কিন্তু এতোকিছুর মধ্যে ব্যাতিক্রমও আছে। ১৯২০ সালে নোবেলজয়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইড্রো উইলসন পুরস্কারের সমুদয় অর্থ ব্যাংকে রাখেন মাসে মাসে মুনাফার জন্য।কারণ তিনি তার অবসর জীবন নিয়ে বেজায় চিন্তিত ছিলেন।

তবে সাহিত্যে নোবেলজয়ীরা প্রায়শই জানান না যে তারা কিভাবে তাদের পুরস্কারের অর্থ ব্যয় করবেন।

উপসালা ইউনিভার্সিটির নোবেল সাহিত্য বিষয়ক গবেষক আনা গুন্ডার বলেন, ‘যদিও নোবেলজয়ী অনেক লেখকই বেশ স্বনামধন্য কিন্তু লিখে তারা অর্থ উপার্জন করতে পারেনি। এই প্রাপ্তি তাদের জীবনকে পরিবর্তন করে দেয়। তবে পুরস্কার প্রাপ্তির প্রথম বছর তারা তুলনামূলক অনেক কম লেখেন।কিন্তু বছর দুই পর তারা আবার আগের মতো লিখতে থাকেন।’

চলতি অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অনেকেই মনে করছেন যে নোবেল পুরস্কারের অর্থ বাড়ানো যেতে পারে। তবে নোবেল কমিটির পুরস্কারের অর্থ বাড়ানো নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পরিকল্পনা নেই। কিন্তু অনেকেই কমিটিকে ফোন করে বিষয়টি সম্পর্কে বলেন।

পদার্থ বিদ্যায় নোবেলজয়ী হারোশ বলেন, ‘আমার মনে হয় না পুরস্কারের অর্থ মূল বিষয়। পুরস্কারটা আসলে একটা স্বীকৃতি।

শেয়ার করুন