আশার ভেলায় তামিম

0
92
Print Friendly, PDF & Email

দলের প্রাপ্তি আর নিজের প্রাপ্তি কখনো গাঁথা হয় এক সুতোয়। কখনো আবার নিজের সাফল্য মলিন হয়ে যায় দলের ব্যর্থতায়। কখনো বা দলের সাফল্য ভুলিয়ে দেয় নিজের আক্ষেপ। তবে দলের উদ্ভাসিত সাফল্যও পুরোপুরি ভুলিয়ে দিতে পারে না তামিম ইকবালের একটি আক্ষেপ। সেই যে খেলতে পারলেন না বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে জায়গা পাওয়া ‘বাংলাওয়াশ’ সিরিজে!
কী দুর্দান্ত ফর্মেই না ছিলেন সে বছর! জহির-ইশান্ত-হরভজনদের ছাতু বানিয়ে মিরপুরে করলেন ১৫১। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দেশের মাটিতে দুই টেস্টে তিন ফিফটি, এর একটিতে লাঞ্চের আগে সেঞ্চুরি প্রায় করেই ফেলেছিলেন। ওয়ানডেতেও ব্রেসনান-ব্রড-সাইডবটমদের তুলাধোনা করে ১২০ বলে ১২৫। ইংল্যান্ডে ফিরতি সফরে লর্ডস ও ওল্ড ট্রাফোর্ডে পিঠোপিঠি সেঞ্চুরি। তখন তিনি দেশের অবিসংবাদিত সেরা ব্যাটসম্যান। অথচ চোটের কারণে খেলতে পারলেন না অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজটায়! দলে না থেকেও অবশ্য সতীর্থদের ইতিহাস গড়া দেখেছেন ড্রেসিংরুমে বসেই। দুধের স্বাদ কি আর ঘোলে মেটে?
সামনে আবার সেই নিউজিল্যান্ড। তামিমের সুযোগ সত্যিকারের ‘দুধের’ স্বাদ নেওয়ার। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমের সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে শোনালেন সেই আশাবাদ, ‘সেবার আমি খেলতে পারিনি, অনেক অনেক মিস করেছি। সবার মাঝে যে উচ্ছ্বাসটা দেখতে পেয়েছিলাম, আশা করি এবার তেমন কিছুর অংশ হতে পারব। তবে সে জন্য অনেক কষ্ট করতে হবে আমাদের। ওরা ভালো দল, সম্প্রতি খেলছেও ভালো। আমরাও ভালো খেলছি। আমাদের কাজগুলো ঠিকভাবে করতে পারলে আমাদের সম্ভাবনাই বেশি।’
সেবার বাংলাদেশ দলে ছিলেন না তামিম, এবার নিউজিল্যান্ডে নেই দলের অপরিহার্য অংশ ড্যানিয়েল ভেট্টোরি। উল্টো কিছুর সংকেত নয় তো এটি! মজাটা বুঝে তামিমের আত্মবিশ্বাসী উত্তর, ‘বাংলাদেশের জন্য আরও ইতিবাচক ইঙ্গিত যে এবার আমি আছি, ভেট্টোরি নেই!’
দলের হয়ে ইতিহাসের অংশ হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা আছে। আছে ব্যক্তিগত কিছু লক্ষ্য, হিসাব মেলানোর পালাও। দলের আর নিজের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সেই পুরোনো টানাপোড়েন। ২০১০ সালের জুনে ওল্ড ট্রাফোর্ডের প্রতিকূল কন্ডিশনে সেই সেঞ্চুরিটা যেমন হয়ে আছে তাঁর ব্যাটসম্যানশিপের বড় একটা বিজ্ঞাপন, তেমনি বুকের ভেতর একটা ভোঁতা যন্ত্রণাও জাগিয়ে দেয় ওই ইনিংস। ওই ইনিংসের পর পেরিয়ে গেছে ৪০ মাস, কিন্তু টেস্টে তিন অঙ্ক ছোঁয়া হয়নি আর একবারও!
৪০ মাসে খেলেছেন অবশ্য মাত্র নয়টি টেস্ট। এই সময়ে বাংলাদেশ খেলেছে ১১টি টেস্ট, সেঞ্চুরি হয়েছে মাত্র ছয়টি। এর মধ্যে গত মার্চে গল টেস্টে মোহাম্মদ আশরাফুল, মুশফিকুর রহিম ও নাসির হোসেন, গত নভেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের দুই টেস্টে আবুল হাসান ও নাঈম ইসলাম এবং ২০১১-এর ডিসেম্বরে পাকিস্তানের বিপক্ষে সাকিব আল হাসান। অর্থাৎ এই সময়ের ১১ টেস্টের আটটিতেই কোনো সেঞ্চুরি পাননি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। তামিমের ৯ টেস্টে সেঞ্চুরি না-পাওয়াকে এই বিবেচনায় ‘ক্ষমা’ করে দেওয়াই যায়। চার টেস্ট সেঞ্চুরি নিয়ে তখনো বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টেস্ট সেঞ্চুরির মালিক ছিলেন, আছেন এখনো (সর্বোচ্চ আশরাফুলের ৬ সেঞ্চুরি)। টেস্টপ্রতি সেঞ্চুরির হারেও তামিম এখনো সেরা। প্রতি সাত টেস্টে একটি সেঞ্চুরি তাঁর, প্রতি সেঞ্চুরির জন্য আশরাফুলের লেগেছে ১০ টেস্টের বেশি, সাকিবের ১৫, হাবিবুল বাশারের ১৬ টেস্টের বেশি ও মুশফিকের ১৭।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে তিনি তামিম বলেই। ২০১০ সালের ওই সময়টার পর এই তিন বছরে তাঁর হয়ে ওঠার কথা ছিল বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন। অথচ তাঁর ফর্মের তুলনা করতে হচ্ছে নিজ দেশের ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে। পেছন দিকে হাঁটা বা ওখানেই থমকে থাকার প্রমাণ এটিই। অথচ তাঁর সামর্থ্য আছে বিশ্বসেরাদের কাতারে থাকার।
এটি তামিমও জানেন। জানেন বলে আক্ষেপ-অনুশোচনা আছে, ‘কী বলব আসলে, খুবই দুঃখজনক। সব ব্যাটসম্যানই চায় বড় ইনিংস খেলতে। আমারও বড় ইনিংসের প্রতি ভীষণ ঝোঁক। পারিনি, অনেক কারণ দেখানো যায়। কিন্তু অজুহাত দেব না। যদি সেট হতে পারি, ৪০-৫০ করত পারি, চেষ্টা করব এই সিরিজে বড় ইনিংস খেলতে।’
ম্যাচটি চট্টগ্রামে বলে গত তিন বছরের আক্ষেপের সঙ্গে যোগ হয়েছে একটি চিরন্তন আক্ষেপও। ঘরের মাঠে এখনো পেলেন না আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি! তামিম আবারও ভাসালেন আশার ভেলা, ‘চট্টগ্রামে প্রথম সেঞ্চুরি দিয়ে যদি টেস্ট ক্রিকেটে তিন বছরের সেঞ্চুরি-খরা কাটত, এর চেয়ে ভালো কিছু আর হয় না।’
সত্যিই সেটা হলে নিজের দর্শকদের জন্য ঘরের ছেলের পক্ষ থেকে হবে সেটি বড় এক উপহার। আর সেই সেঞ্চুরির হাত ধরে যদি আসে জয়, দারুণ এক উপহার হবে সেটি গোটা দেশের জন্যই!

শেয়ার করুন