হজযাত্রীদের দিনলিপি

0
103
Print Friendly, PDF & Email

পবিত্র হজ পালন করতে এসে হজযাত্রীরা ৪০ থেকে ৫০ দিন সৌদি আরবে অবস্থান করেন। এর মধ্যে জিলহজ মাসের ৭ থেকে ১২ তারিখ হজের আনুষ্ঠানিকতায় পূর্ণ থাকে। আর আছে মদিনায় মসজিদে নববিতে আট দিন ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা। তবে এটা হজের অংশ নয়। বাকি দিনগুলো ইবাদত-বন্দেগি আর স্বাভাবিক জীবনযাপনে কাটে হজ পালনকারীদের।
বাংলাদেশ থেকে এবার ৮৮ হাজারের বেশি মুসলমান পবিত্র হজ পালন করতে এসেছেন। বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে আসা এই হজযাত্রীরা বিভিন্ন এলাকায় বাড়িভাড়া নিয়ে থাকছেন। গতকাল সোমবার মক্কার ইব্রাহিম খলিল রোডে হারাতুর রুশদ দাখালা এলাকায় এমনই একটি বাড়িতে গেলাম। পুরোনো একটা ভবন। খাড়া সিঁড়ি, লিফটও আছে। মসজিদুল হারাম সম্প্রসারণের জন্য মক্কার অনেক বাড়িঘর ভেঙে ফেলেছে কর্তৃপক্ষ। এই বাড়িটিও ভাঙা পড়তে পারে—এই ভেবে বাড়ির মালিকও ভবন সংস্কার করছেন না।
পাঁচতলা দার সালেম নামের এই বাড়িতে ১১০ জন থাকার তাসরিয়া আছে। একটি বাড়িতে কতজন হাজি বসবাস করতে পারবেন, তার ছাড়পত্রকে বলে তাসরিয়া। ভবনে ঢুকেই দেখা গেল টেলিভিশনে বাংলাদেশের একটি চ্যানেলের খবর হচ্ছে। স্থানীয় সময় বেলা ১১টা। আগ্রহী কয়েকজন টিভির সামনে। দেশের খোঁজখবরে বেশ মনোযোগ।
বাড়িটির ৪০২ নম্বর কক্ষে ঢুকলাম। মাঝারি ধরনের প্রতি কক্ষে ছয়জন করে থাকার ব্যবস্থা। ছয়টি লোহার খাটে ম্যাট্রেস-কম্বল বিছানো। কক্ষের চারপাশে ঘুরানো খাট। মাঝখানে সামান্য একটু জায়গা। তাতেই খাওয়াদাওয়া, চলাফেরা। কক্ষের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত নাইলনের দড়ি টানানো। তাতেই সবার কাপড় নেড়ে দেওয়া আছে। সাময়িক সময়ের জন্য আলনা বা আলমিরা তো নেই! ফ্যান ঘুরছে, এসিও চলছে।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের আবদুল ওয়াহেদ মণ্ডল কাপড় ধোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পরিচয় হলো। দ্রুত কাজ শেষ করলেন। আলাপের শুরুতেই বললেন, ‘আল্লাহর অশেষ রহমত, কাবাঘর দেখলাম। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কাবাঘরে পড়ছি। এর চেয়ে শান্তির আর কী আছে। জীবনের পরম পাওয়া বলতে পারেন।’

এই কক্ষে আরও থাকেন দবির উদ্দিন, মসির উদ্দিন, আবদুর রশিদ, মোস্তাফিজুর রহমান, এ বি এম হাবিবুর রহমান। সবার বাড়ি উত্তরবঙ্গে—ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুরে।

এই প্রতিবেদককে পেয়ে কিছু খাওয়ানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তাঁরা। বাংলার চিরাচরিত অতিথি আপ্যায়ন। একজন হাতে ধরিয়ে দিলেন খেজুর। আরেকজন খাটের নিচে রাখা ফল বের করে কাটার জন্য ছুরি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

ভবনের সবাই লিফটে ওঠা-নামা করেন। লিফটের ধারণক্ষমতা চারজন। পুরুষেরা থাকেন ওপরের তলায়। তাঁদের সঙ্গে হজ পালন করতে আসা কারও মা, কারও স্ত্রী বা বোন তাঁদের থাকার ব্যবস্থা নিচতলায়। এমন ২৮ জন নারী হজযাত্রী থাকেন এই ভবনে।

এ বি এম হাবিবুর রহমান বিরামপুর কলেজের সাবেক অধ্যাপক। সস্ত্রীক এসেছেন পবিত্র হজ পালন করতে। বললেন, ‘আবহাওয়াটা বেশ গরম।’ তবে তাঁরা এ নিয়ে তেমন ভাবেন না। এই কক্ষের সবাই ইতিমধ্যে হাজরে আসওয়াদে চুমু খেয়েছেন, প্রতিদিন জমজমের পানি খাচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের আলোচনায় এসবই গুরুত্ব পায়।

মোস্তাফিজুর রহমান বললেন, আশপাশের সবাই বাংলাদেশি। বাংলায় কথা বলেন। তাই বিদেশ বলে মনে হচ্ছে না। তবে বেশি খারাপ লাগলে নাতি-নাতনিদের সঙ্গে ফোনে আলাপ করেন তিনি।

দবির উদ্দিন বললেন, ‘মিনা (হজযাত্রীরা যেখানে অবস্থান করবেন), মুজদালিফা, আরাফাতের ময়দান, জাবালে নুর, হেরা গুহা দেখে আসছি। এত শান্তি লাগছে ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’

মসির উদ্দিনের মন যেন ইতিমধ্যে চলে গেছে মদিনায়। বললেন, ‘হজের পরে মদিনায় মসজিদে নববিতে আট দিন ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করব।’

কথা বলতে বলতে জোহরের আজান হলো। ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১২টা। এই দেশে আজান হওয়ার পরপর জামাতে নামাজ শুরু হয়ে যায়। একসঙ্গে মসজিদুল হরামে নামাজ আদায় করতে গেলাম। রাস্তায় বের হয়ে ছাতাটা খুলতে হলো। প্রচণ্ড গরম, ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা।

এই হজযাত্রীরা জানালেন, তাঁদের দিন শুরু হয় ভোর সাড়ে চারটায়। অজু করেই ছোটেন মসজিদুল হারামের উদ্দেশে। সেখানে জামাতে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকেন কাবাঘরের দিকে। কাবার গিলাফ নিচের দিকটায় একটু ওঠানো রয়েছে। সকাল-বিকেল সব সময় চলছে তাওয়াফ। ওমরাহ করছেন হজযাত্রীরা। ভিড় একটু কম থাকলে ৪০২ নম্বর কক্ষের এই বাসিন্দারাও তাওয়াফ করেন। কাবা শরিফ সাতবার প্রদক্ষিণ করার পর দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন।

মক্কায় প্রথম দিন এসেই অন্যদের মতো তাঁরা ওমরাহ করেছেন। অনেকে এখন বাবা, মা ও প্রিয়জনের নামে ওমরাহ করতে চান। ওমরাহর নিয়ত করলে তাওয়াফের পর সায়ী করতে হয়। অর্থাৎ সাফা-মারওয়া পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থান সাতবার প্রদক্ষিণ করতে হয়। যাঁরা কুলিয়ে ওঠেন না, তাঁরা শুধু তাওয়াফই করেন।

তারপর দলবেঁধে বাসায় ফেরা। হেঁটে আসতে ১০-১২ মিনটি সময় লাগে। পথে কখনো বোরকা কখনো টুপি, তসবিহ ইত্যাদি সুবিধামতো পেলে কিনে ফেরেন।

হজযাত্রীরা যে এজেন্সির মাধ্যমে আসেন, তারা তিন বেলা খাবার সরবরাহের দায়িত্বে থাকে। হাজিদের জন্য রান্না করবেন বাংলাদেশি বাবুর্চি। হালকা মসলা, হালকা ঝাল দিয়ে দেশি রান্না, যাতে সব বয়সী লোক খেতে পারেন। এই ভবনের বাবুর্চির নাম মনির। বাড়ি জামালপুর। পাঁচ-ছয় বছর ধরে মক্কায় হাজিদের রান্না করে খাওয়ান তিনি। বললেন, ‘হাজিদের জন্য রান্না করে আনন্দ পাই। তাঁদের খেদমত করতে পারছি, এটাই আনন্দ।’

হাজিদের খাবার বাইরে থেকে রান্না করে আনতে হয়। বাড়িতে রান্না করলে অসাবধানে আগুন ধরে যেতে পারে, এ জন্য কর্তৃপক্ষ রান্না করার অনুমতি দেন না। সকালে এজেন্সি থেকে রুটি-সবজি নাশতা দেওয়া হয়। চা খেতে হয় নিজের টাকায়। দুধ-চা দুই রিয়াল, দুধ ছাড়া চা এক রিয়াল।

এই বাড়ির হজযাত্রীরা জানান, নাশতা খেয়ে অনেকে একটু ঘুমিয়ে নেন। কাপড়চোপড় ধোয়া থাকলে একটু আগে ওঠেন। গোসল সেরে জোহরের নামাজ পড়তে ছোটেন কাবা শরিফে। জোহরের নামাজ আদায় করে বাসায় ফিরে দুপরের খাবার খান। মেন্যু—সবজি, মাছ বা মাংস ও ডাল।

দুপরের খাবার খেয়ে কখনো বিছানায় একটু গড়াগড়ি। কারণ, বেলা তিনটা থেকে আসরের নামাজের প্রস্তুতি নিতে হয়। আসরের নামাজ পড়তে বাসা থেকে বের হয়ে একেবারে এশার নামাজ পড়ে বাসায় ফেরেন তাঁরা। জামাতে নামাজ আদায়ের পর পকেটে রাখা কুরআন শরিফ তেলাওয়াত করেন অনেকে। মসজিদের ভেতরেও অসংখ্য কুরআন শরিফ থাকে।

রাতের খাবার মেন্যু দুপুরের মতোই থাকে বলে জানান হজযাত্রীরা। নামাজ ও তাওয়াফ শেষে বাড়ি ফিরে খাবার গ্রহণ করেন সবাই একসঙ্গে। তারপর ক্লান্ত শরীর বিছানার দিকে ছোটে। এর আগে মোবাইল ফোনে অ্যালার্ম দিতে ভুল করেন না কেউই। কারণ, আবার ফজরের নামাজের জন্য উঠতে হবে।

শেয়ার করুন