চট্টগ্রামে মাদ্রাসায় বিস্ফোরণ

0
53
Print Friendly, PDF & Email

চট্টগ্রামের লালখান বাজারে জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে গতকাল সোমবার বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে একটি কক্ষের জানালা উড়ে গেছে। এ ঘটনায় আহত চারজনসহ মোট নয়জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শহীদুল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, বোমা তৈরির সময় এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পরে ঘটনাস্থল থেকে বোমা তৈরির নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় আহতরা বেসরকারি হাসপাতালে লুকিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছিল। আমরা চারজনকে গ্রেপ্তার করেছি। তাদের মধ্যে নুরুন্নবী নামে পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের একজন ছাত্রও আছে।’
মাদ্রাসার পরিচালক ও অধ্যক্ষ মুফতি ইজাহারুল ইসলাম চৌধুরী দাবি করেন, ‘ছেলেদের ল্যাপটপে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তা থেকে কেরোসিনের চুলায় আগুন লেগে বড় বিস্ফোরণ হয়েছে।’
মাদ্রাসার দারুল ইফতার শিক্ষার্থী জহিরুল ইসলাম বলেন, আইপিএস বিস্ফোরণ হয়ে এ ঘটনা ঘটেছে। এরপর নিজেরা চেষ্টা করে আগুন নেভাতে ব্যর্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে আগুন নেভান। তবে আরেক ছাত্র সাজ্জাদুল কবির বলেন, ওখানে কোনো আইপিএস ছিল না।
মুফতি ইজাহারুল ইসলাম হেফাজতে ইসলামের নায়েবে আমির। মাদ্রাসার ভেতরেই তাঁর বাসা। আর যে কক্ষে বিস্ফোরণ হয়েছে, তার পাশের কক্ষে থাকেন ইজাহারের ছেলে হারুন ইজাহার। পুলিশ সন্ধ্যার পর তল্লাশি চালিয়ে ইজাহারের বাসা থেকে ১৮ বোতল অ্যাসিডজাতীয় পদার্থ উদ্ধার করে।

পুলিশ জানায়, গতকাল বেলা ১১টার দিকে চারতলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে বিস্ফোরণ হয়। পুলিশ সন্ধ্যার পর তল্লাশি চালিয়ে ওই কক্ষ থেকে হাতে তৈরি তিনটি তাজা বোমা এবং লোহার পাইপ, মার্বেলসহ বোমা তৈরির বিভিন্ন উপাদান উদ্ধার করে।

ঘটনার পর সন্ধ্যায় পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে । ছবি: প্রথম আলোঘটনার পর সন্ধ্যায় পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে । ছবি: প্রথম আলোসরেজমিনে দেখা গেছে, যে কক্ষে বিস্ফোরণ হয়েছে, সেটির দেয়াল কালচে হয়ে আছে। ফাটল দেখা দিয়েছে। একটি জানালার গ্রিল বাঁকা হয়ে বের হয়ে গেছে। আরেকটি জানালার কাচ গিয়ে অন্তত ৫০ গজ দূরে পড়েছে। বৈদ্যুতিক পাখা পুড়ে বাঁকা হয়ে গেছে।
ঘটনার পরপর যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা মাদ্রাসার গেটের সামনে বিক্ষোভ করেন। তাঁরা মুফতি ইজাহারের গ্রেপ্তার দাবি করেন।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, বিস্ফোরণের পরপরই অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা আগুন নেভান। সেখানে ছাইয়ের নিচে বেশ কিছু বিস্ফোরক পদার্থ পাওয়া যায়। এর মধ্যে গ্রেনেড (হাতে তৈরি বোমা) ও বারুদমিশ্রিত স্প্লিন্টারও রয়েছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরের আগে এ ধরনের ঘটনা বেশ উদ্বেগজনক।
তবে এ ঘটনার পরও শুরুতে পুলিশ বেশি গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বেলা ১১টার দিকে বিস্ফোরণের পর খুলশী থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। তখন ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের পুলিশ জানায়, কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে, তা এখন বলা যাবে না। পরে বেলা দুইটার দিকে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল যায়। তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করে একই কথা জানাতে থাকে। এরপর র‌্যাবের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। তখন তারা উপস্থিত সাংবাদিকদের এ বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হয়নি। পরে বিকেল চারটার দিকে পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) হারুনুর রশীদ হাযারী ঘটনাস্থলে গিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ডিবি ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে। বিস্ফোরণের কারণ পরে জানা যাবে।

বিকেল পাঁচটার দিকে পুলিশ কমিশনার ঘটনাস্থলে আসেন। তখন জানানো হয়, মাদ্রাসায় বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর মাদ্রাসায় তল্লাশি শুরু করা হয়। সন্ধ্যার পর মাদ্রাসা থেকে পাঁচজনকে আটক করে পুলিশ।

ঘটনার তদন্তে ও মাদ্রাসায় তল্লাশি অভিযানে বিলম্ব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হারুনুর রশীদ হাযারী বলেন, ‘মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বলেছিল, আইপিএস বা অন্য কোনো কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে। তাই আমাদের বোমা বিশেষজ্ঞ দল না আসা পর্যন্ত পুলিশ অপেক্ষা করেছে। সরঞ্জাম পাওয়ার পর আমরা বোমা বিস্ফোরণের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছি।’

রাত পৌনে ১১টায় মাদ্রাসায় তল্লাশি শেষ হয়। দিনভর মুফতি ইজাহার মাদ্রাসায় বসে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললেও, বিকেলে তল্লাশি অভিযান শুরুর পর তাঁকে আর দেখা যায়নি। তাঁকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না—পুলিশের তল্লাশি অভিযান শেষে সাংবাদিকেরা জানতে চাইলে অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. শহীদুল্লাহ বলেন, ‘বিকেল পর্যন্ত আমরা নিশ্চিত ছিলাম না, এটা কী ধরনের বিস্ফোরণ। এখন যদি এ ঘটনায় ইজাহারের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তিনি পালিয়ে বাঁচতে পারবেন না।’

শেয়ার করুন