বসুন্ধরার জালিয়াতি : ড্যাপ সংক্রান্ত সাব কমিটির সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত

0
90
Print Friendly, PDF & Email

প্রকল্প বাস্তবায়নে ড্যাপ সংক্রান্ত সাব কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্ত জালিয়াতির মাধ্যমে পাল্টে দেয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে ফেলেছে বসুন্ধরা গ্রুপ। ৪ সেপ্টেম্বর গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বসুন্ধরা হাউজিংয়ের ‘ই’ ব্লক থেকে ‘কে’ ব্লক পর্যন্ত প্রকল্পের অনুমোদন দেয় ড্যাপ (ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান) সংক্রান্ত সাব কমিটি। এই কমিটির আহ্বায়ক হচ্ছেন ভূমিমন্ত্রী। অন্য সদস্যরা হলেন- পরিবেশ ও বন মন্ত্রী, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সচিব, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ডিজি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিজি। তবে কমিটি এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ড্যাপ অনুসৃত নির্দেশাবলী পালনে বসুন্ধরাকে ১১দফা সিদ্ধান্ত জুড়ে দেয়।

সূত্র মতে, পরবর্তীতে নিজেদের সুবিধার্থে সাব কমিটির গৃহীত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে তৎপর হয় বসুন্ধরা গ্রুপ। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিদের মাঝে মোটা অংকের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
সূত্রমতে, বসুন্ধরা হাউজিংকে ‘এ’ থেকে ‘ডি’ ব্লকের অনুমোদন আগেই দেয়া হয়েছিল । ৪ সেপ্টেম্বর সাব কমিটির বৈঠকে ‘ই’ থেকে ‘কে’ ব্লকের অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত হলেও সভার কার্যবিবরণীতে তা উল্লেখ করা হয়নি। পরবর্তীতে জালিয়াতির মাধ্যমে ‘এল’ ব্লক থেকে ‘পি’ ব্লকের অনুমোদন চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে বসুন্ধরা। ইতোমধ্যে, পূর্তমন্ত্রী এবং একই মন্ত্রণালয়ের সচিব তা অনুমোদন করেছেন। এখন তা ভূমিমন্ত্রীর অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
জানা গেছে, বসুন্ধরার প্রস্তাবিত প্রকল্পের ‘এল’ ব্লক থেকে ‘পি’ ব্লকের বাস্তবে কোন অস্তিত্ব নেই। ঐসব এলাকায় গভীর খাল ও জলাশয়ে নৌকা চলে।
সূত্র জানায়, গত বছরের ১৭মে অনুষ্ঠিত সভায় সরকারি তরফে বলা হয়, বসুন্ধরার প্রস্তাবিত এসব প্রকল্পে ভাওয়াল এস্টেটের ২১৬ একর ও সরকারের ৮০০ একর খাস জমি রয়েছে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অসাধু ব্যক্তিদের অবৈধ সুবিধা দিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপ এ জমিও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকল্পের আওতাভুক্ত করে অনুমোদন নেয়ার পাঁয়তারা করছে।
জানা গেছে, অস্তিত্বহীন এসব প্রকল্প অনুমোদন পেলেও ২৫ বছরের আগে তা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অথচ, বসুন্ধরা এরই মধ্যে জনগণকে ধোঁকা দিয়ে ওইসব অস্তিত্বহীন প্রকল্পের প্লট বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে।
সূত্র মতে, সাব কমিটির দেয়া ১১টি সিদ্ধান্তের মধ্যে বেশ ক’টি সিদ্ধান্ত বসুন্ধরা গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে নিজেদের সুবিধামত পাল্টে দেয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে ফেলেছে।

জানা গেছে, বসুন্ধরা হাউজিংয়ের বাড্ডা, ক্যান্টনমেন্ট ও গুলশান থানাধীন প্রকল্পের ‘ই’ থেকে ‘কে’ ব্লকের অনুমোদন দেয়ার ক্ষেত্রে ড্যাপ সাব কমিটির সিদ্ধান্তে বলা হয়, ৩০০ ফুট চওড়া কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোডের উত্তর পাশে ড্যাপ প্রস্তাবিত ১০০ ফুট চওড়া জলাধার সীমানা নির্ধারণপূর্বক সংরক্ষণ করতে হবে।
সূত্র মতে, বসুন্ধরা সাব কমিটির এ সিদ্ধান্ত ভঙ্গ করে বর্তমানে ১০০ ফুটের পরিবর্তে ৫০ ফুট চওড়া জলাধার সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে।
কমিটির সিদ্ধান্তে আরো বলা হয়, ৩০০ ফুট চওড়া কুড়িল-পূর্বাচল লিংক রোড এবং ৩টি রাস্তার উচ্চতা এক না হওয়ায় উক্ত লিংক রোড ও রাস্তা ৩টির সংযোগ স্থলে ক্লোভারলিফ (ঘাস) এবং প্রয়োজনীয় জায়গা সংরক্ষণ করতে হবে। এ ৩টি রাস্তা ব্যতীত অন্য কোন রাস্তা দিয়ে সরাসরি ৩০০ ফুট চওড়া রোডে প্রবেশ করা যাবে না। অভিযোগ রয়েছে, বসুন্ধরা হাউজিং সাব কমিটির দেয়া এ সিদ্ধান্তটি ভঙ্গ করে ৩০০ ফুট চওড়া রোডে প্রবেশ করার লক্ষ্যে বিকল্প একাধিক রাস্তা নির্মাণ ও ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে।
ড্যাব-এর সাব কমিটির সিদ্ধান্তে আরো বলা হয়, বালু নদীর পশ্চিম পাশে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ড্যাপ প্রস্তাবিত ৩০০ ফুট চওড়া ইস্টার্ন বেড়িবাঁধ এবং টঙ্গি ও ডিএনডিকে সংযোগকারী ড্যাপ প্রস্তাবিত ১৩০ ফুট চওড়া সড়কের মধ্যবর্তী এলাকায় ড্যাপে চিহ্নিত জলাধার এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউক যৌথভাবে স্থানীয় জনগণ, ডেভেলপার এবং বিভিন্ন স্টেক হোল্ডারদের সাথে নিয়ে সমগ্র এলাকার জন্য ল্যান্ড রিডজাজমেন্ট প্রকল্পের প্রস্তাবনা দাখিল করতে হবে।
জানা গেছে, বসুন্ধরা এ বিষয়ে মোটেও তোয়াক্কা করছে না। বরং বর্তমানে এলাকাটি যে অবস্থায় রয়েছে সেভাবেই রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, আবেদনকৃত প্রকল্প এলাকায় বুয়েট-এর মাধ্যমে ওয়াটার মডেলিং করে বসুন্ধরাকে অভ্যন্তরীণ ড্রেনেজের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এ ব্যাপারে ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতামত গ্রহণ করতে হবে। বাস্তবে এ শর্তের তোয়াক্কা না করে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বসুন্ধরা হাউজিং নিজেরাই ওয়াটার মডেলিং এবং ডেনেজ নির্মাণ করে উল্লিখিত সংস্থাগুলোকে অবহিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। অর্থাৎ বুয়েট, ওয়াসা ও পাউবোকে পাশ কাটিয়ে বসুন্ধরা সুবিধামত প্রকল্প বাস্তবায়নের পাঁয়তারা করছে।

শেয়ার করুন