খোলা চিঠি

0
75
Print Friendly, PDF & Email

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’—এই বাণী যাঁরা শিক্ষা দিয়ে আসছেন, তাঁরাই যুগের পর যুগ মেরুদণ্ডহীন হয়ে বেঁচে আছেন। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, সেই সরকারের শেখানো বুলি আর জয়গানে জীবন ধন্য করতে হয়। বদলে যায় সমাজ আর জীবনযাত্রার মান, কিন্তু বদল হয় না শিক্ষকদের অবস্থান।
ব্রিটিশ শাসনামলে সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পে ‘পণ্ডিত মশাই’ তাঁর ছাত্রদের যে সহজ অঙ্কটি দিয়েছিলেন, আজও সেই অঙ্ক কষতে পারেননি পণ্ডিত মশাইয়ের ছাত্ররা।
পণ্ডিত মশাইয়ের ছাত্ররা হাজার হাজার কোটি টাকা কী করে ব্যাংক থেকে, শেয়ারমার্কেট থেকে লোপাট করা যায়, সে হিসাব সহজে মেটাতে পারে। শত শত কোটি টাকা ‘মাত্র কয়েকটি টাকা’ কী করে হয়, তা জানে কিন্তু কেন একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের বেতন স্কেল আর অষ্টম শ্রেণী পাস একজন ড্রাইভারের বেতন স্কেল সমান হয়, সে হিসাব জানে না।
এ দেশের প্রত্যেক পেশাজীবী তাঁদের অবস্থান পরিবর্তনের জন্য আন্দোলনের পথ বেছে নেন। আন্দোলনের মুখে সরকার দাবি মেনে নেয়। কিন্তু স্বাধীনতার ৪২ বছরেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা কোনো আন্দোলন সেভাবে করেননি।
আন্দোলন মানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, রক্তপাত, ইটপাটকেল; যার কোনোটি শিক্ষকেরা করেন না। ছোট ছোট শিশু তাঁদের সান্নিধ্যে থাকায় নিজের অজান্তেই তাঁরা ভুলে গেছেন আন্দোলন কী এবং কীভাবে করতে হয়। ফলে ক্লাস বর্জন করার পরও যখন মনে হয় শিশুদের পরীক্ষা চলে এসেছে, তখন নিজেদের দায়েই তাঁরা ক্লাস শুরু করেন।
বরং আন্দোলনের নামে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে যখন মরিচের গুঁড়া ছাড়া হয় তখন দুর্বল, নিরীহ শিক্ষক যাঁরা আন্দোলনে মারা গেলে সমাজ ধরেই নেয়, এ মৃত্যুতে পুলিশের দায় নেই, সরকারেরও নয়। কারণ, আধপেট খাওয়া, অপুষ্টি, অনাহারে থাকা শিক্ষক আন্দোলনে নয়, আন্দোলনের ভয়েই তাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বয়স পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে। তারা শিক্ষকদের বঞ্চনা বোঝে না। তারা বড় হয়ে কেউই শিক্ষক হওয়ার মনোবাসনা পোষণ করে না।
যোগ্যতার সীমা এইচএসসি হলেও বেশির ভাগ শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপ্রাপ্ত। সুতরাং শুধু নীতিবাক্য দিয়ে, ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে শিক্ষকদের বঞ্চিত করার সময় শেষ হওয়া উচিত। এ দেশের শিক্ষকসমাজ এক হয়ে জ্বলে ওঠার দুঃসাহস দেখাতে পারেনি এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও তো ঠিক যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে পোশাকশ্রমিক—সবাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হাত ধরেই অ আ ক খ শিখেছেন।
সাংবাদিকদের কলমের যে আলো দূর করে সমাজের অন্ধকার, যে আগুন পুড়িয়ে ছাই করে দেয় অপশক্তিকে, সেই কলমটি ধরতে যিনি প্রথম শিখিয়েছেন, তিনি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। সাংবাদিকদেরও কি কোনো দায়বদ্ধতা নেই তাঁদের ছেলেবেলার সেই গুরুর প্রতি?
শিক্ষকদের মিছিলের স্লোগানে জোর নেই, আন্দোলনে সহিংসতা নেই, তাই তাঁদের খবরে কারও আগ্রহ নেই। এ দেশের শিক্ষকেরা এতগুলো বছরে শুধুই বড় বড় দুর্নীতিবাজ সৃষ্টি করেছেন? তাঁদের পাশে দায়বদ্ধতা নিয়ে দাঁড়ানোর মতো কোনো প্রতিবাদী, আলোকিত মানুষ তৈরিতে কি শিক্ষকদের কোনো ভূমিকা নেই?
সাংবাদিক পেটানোর দায় নিয়ে সরকারি দলের সাংসদকে পর্যন্ত জেলে যেতে হয়। অথচ শিক্ষকের গালে চড় মারা, যখন-তখন লাঞ্ছিত করা এবং বিভিন্নভাবে অপমানিত করার কোনো বিচার হয় না।
শাকিলা নাছরিন
মুরাদপুর মাদ্রাসা রোড, ঢাকা।

শেয়ার করুন