হেফাজত নিয়ে সরকারের দ্বিমুখী আচরণ আম ছালা দু’টোই যাবে

0
44
Print Friendly, PDF & Email

খুলনার মহাসমাবেশে বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশ বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও এর পাশাপাশি এই প্রথম ঈমান বাঁচাও শ্লোগান তুলেছেন। তিনি খুলনার জনসমুদ্রে দীর্ঘ সময় নিয়ে তৌহিদী জনতার আবেগ ও দুঃখ-বেদনা নিয়েও স্পষ্ট বক্তব্য রাখেন। নবী করিম (সা.) এর শানে ইতিহাসের জঘন্যতম কুৎসা ও বিষোদগারের জন্য দায়ী নাস্তিক মুরতাদদের শাস্তি না দিয়ে তাদের পক্ষ নিয়ে তিন মাসব্যাপী ব্যস্ততম রাজপথ দখলে রেখে, তাদের খানা-পিনা ও ফূর্তির যোগান দিয়ে সরকার নিজের চরিত্র উন্মোচন করেছে, অপরদিকে মহানবী (সা.)-এর অবমাননার প্রতিবাদে শাপলা চত্বরে সমবেত ধর্মপ্রাণ মানুষ ও আলেম-ওলামাদের এক রাতের জন্যও সহ্য করেনি সরকার। বিভিন্ন বাহিনী ও দলীয় ক্যাডার দিয়ে তাদের উপর নিমর্ম অত্যাচার করা হয়েছে। নিজেরা মসজিদে আগুন দিয়ে কোরআন পুড়িয়ে মানুষ মেরে নিরীহ আলেমদের দোষারোপ করেছে। যুগশ্রেষ্ট আলেম আল্লামা আহমদ শফীর কুৎসা রটনা ও তার প্রতি বিদ্রুপ করা হচ্ছে। ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত ও ঘুমন্ত ব্যক্তিদের উপর বাতি নিভিয়ে, টিভি চ্যানেল বন্ধ করে নিমর্ম দমন পীড়ন চালানো হয়েছে। যাদের হাতে কোরআন, তসবি জায়নামাজ ও পানির বোতল ছাড়া কিছুই ছিল না, তাদের বলা হচ্ছে জঙ্গি। বেগম জিয়ার মুখে এ ধরনের কথা শুনে হেফাজত নেতাকর্মী ও ধর্মপ্রাণ মানুষের মনোবেদনা অনেকটা লাঘব হয়েছে। অপরদিকে প্রধানমন্ত্রীর নানা উক্তিতে দেশের মানুষ খুবই ব্যথা-ভারাক্রান্ত। তিনি সংসদে জনসমাবেশে, মিডিয়ায় এমনকি নিউইয়র্কে বসেও হেফাজত সম্পর্কে কটূক্তিই করে চলেছেন। শাপলা চত্বরে নাকি গায়ে রং মেখে আলেমরা শুয়েছিলেন, পুলিশি হামলা হলে লাশ উঠে দৌড় দিয়েছে। আল্লামা শফীকে ‘তেঁতুল হুজুর’ নামে ডাকার মত নি¤œমানের কাজ আর দেশের ইমাম আলেম, হাফেজ, মুফতি ও মাওলানাদের কোরআন পোড়ানোর অপবাদ দিয়ে সরকার তার জনপ্রিয়তা তলানিরও নিচে নিয়ে গেছে। ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিত্ব ও ভাবমর্যাদা এখন মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ।
শাপলা চত্বর ট্র্যাজেডির পর দেশের ইসলামপ্রিয় জনতা সরকারকে কতটুকু ঘৃণা করছে-এর প্রমাণ হল কোন বিশিষ্ট আলেমকেই দাওয়াত করে শত চেষ্টা করেও প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতে রাজী করা সম্ভব হচ্ছে না। কোন শীর্ষ আলেম সরকারের সাথে গোপনে বসতেও সম্মত হচ্ছেন না। একবার মন্ত্রী হাছান মাহমুদ সব ব্যবস্থা করে ফেললেও হেফাজত নেতা-কর্মী ও তৌহিদী জনতার তোপের মুখে কিছু মুখচেনা আলেম শেষ পর্যন্তও গণভবনে যাওয়ার সাহস পাননি। এমনকি তারা প্লেনের টিকেট পর্যন্ত ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম পটিয়া আসনের এমপি শামসুল হক চৌধুরীর সাথে লালবাগের মুফতি তৈয়্যব হোসাইনসহ বেশ ক’জন হেফাজত নেতার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁয়ে বৈঠকের খবর প্রচারিত হলে এ ধরনের টুকটাক বৈঠকও বন্ধ হয়ে যায়। আল্লামা শফী স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী নেত্রী আমাদের ৭০টি আসন দিতে চেয়েছেন বলে যে খবর ছড়ানো হচ্ছে, এর কোন ভিত্তি নেই। হেফাজত রাজনৈতিক সংগঠন নয়। ভোট যার যার পবিত্র আমানত। সবদিক বিবেচনা করে দেবেন। ইসলামবিদ্বেষী, নাস্তিক-মুরতাদদের পক্ষে যেন না যায়। এটাই আলেম সমাজের নির্দেশনা। হেফাজতের অন্যতম কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির বলেন, ৫ মে শহীদ ও উৎপীড়িত আলেম-ওলামা, ধর্মপ্রাণ মানুষের ত্যাগের সাথে বেঈমানি করে কেউ যদি ধর্মহীনতা ও নাস্তিক্যবাদের সাথে আঁতাত করে তাহলে বাংলাদেশের মানুষ তাকে ক্ষমা করবে না। আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস বাদ দিয়ে নাস্তিক্যবাদ ও ধর্মবিদ্বেষ সংবিধানে স্থাপনের কোন প্রতিকার না হওয়া পর্যন্ত যদি আলেম নামধারী কোন লোভী বা ভিতু লোক ধর্মবিদ্বেষী চক্রের সাথে সহযোগিতা করে তাহলে সে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। এমনকি সেটা যদি কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার কল্যাণের ব্যানারেও হয়। বাংলাদেশের মানুষ হেফাজতের দিকে তাকিয়ে আছে। সরকারকে বলব, সারাদেশের গোয়েন্দা রিপোর্ট পড়–ন। আল্লামা শফী ও হেফাজত নেতৃবৃন্দ নির্দেশ দিলে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশ অচল করে দেয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমি মনে করি, আল্লামা শফীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলাম একটি আধ্যাত্মিক জাগরণ। হযরত ইমাম মাহদী (আ.)-এর পূর্ববর্তী বাহিনী হিসেবে এই সংগঠন দিন দিন আরো গতিশীল ও শক্তিশালী হতে থাকবে। সরকার মুফতি ওয়াক্কাসকে গ্রেফতার করেছে, আরো কিছু আলেমকে হয়রানী করছে, অবিলম্বে এসব বন্ধ না হলে দেশে গণঅভ্যুত্থান ঘটবে। খোদায়ী গজবে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবে। ভিন্ন শক্তিকে আল্লাহ ক্ষমতা দান করবেন। রাজনীতি যে দিকেই গড়াক ইসলামী শক্তিই হবে আগামীর কিংমেকার।
বাংলাদেশ সরকারের একজন সাবেক সচিব গতকাল এক বৈঠকী আলোচনায় মন্তব্য করেন, গত প্রায় পাঁচ বছরে সরকার বিরোধী দলের যত আন্দোলন মোকাবেলা করেছে এর সবগুলো মিলিয়েও এক হেফাজতে ইসলামের সমান নয়। জাতির এক ক্রান্তিকালে আলেম সমাজের আহ্বানে দেশবাসী সকল অন্যায়, দুর্নীতি, অপসাশন ও ফ্যাসিবাদী আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠায় হেফাজত জনপ্রিয় গণআন্দোলনে পরিণত হয়। দেশের তৃণমূল পর্যায় থেকে রাষ্ট্রের শিখর পর্যন্ত বিস্তৃত ও প্রভাববিস্তারী এই ঈমানী গণজাগরণ মোকাবেলা করতে বিদেশি নির্দেশনায় পরিচালিত শাহবাগ অভিযান সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। সরকার বুদ্ধিমত্তার সাথে শাহবাগ আন্দোলনকে ব্যবহার করতে পারেনি এবং হেফাজতে ইসলামকে মোকাবেলা করতে সরকার শতভাগ ব্যর্থ হয়েছে। ইচ্ছে করলে সরকার কৌশলে হেফাজতকে মানাতে পারত কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস সরকারকে দাম্ভিক ও বেপরোয়া বানিয়ে দেয়ায় সে হেফাজতকে নিয়ে এত বিরাট একটি ভুল পদক্ষেপ নেয়, যার খেসারত দিয়ে কোনদিন তারা শেষ করতে পারবে না। বিশেষ করে ৫ মে শাপলা চত্বরে সরকারের ঐতিহাসিক ভুল ও এর সুদূরপ্রসারী মন্দ প্রভাব আওয়ামী লীগকে এক’শ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর কাছে ৫ মে’র ঘটনা সরকার সাজিয়ে গুছিয়ে তুলে ধরলেও বিশ্বসমাজ এসব সরলভাবে বিশ্বাস করছে বলে মনে করার কোন কারণ নেই। হেফাজত যে এদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের একটি অরাজনৈতিক ঈমানী জাগরণ, কোন কথিত সন্ত্রাসবাদী বা জঙ্গীঁ সংগঠন নয় সেটা বিদেশিরা নানাভাবে জেনে গিয়েছে। সরকারি প্রচারণা, সিডি, ডিভিডি থেকে তারা যা পেয়েছে, কূটনৈতিক মিশন ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মাধ্যমে এর চেয়ে ভিন্ন এবং স্পষ্ট চিত্র তাদের কাছে আরো দ্রুত পৌঁছে গেছে। অনলাইন ও আইটি’র উৎকর্ষ এখন পৃথিবীকে সংক্ষিপ্ত ও নিকটতর করে দিয়েছে। শুনেছি হেফাজতে ইসলাম নিজেরাই বিদেশি কূটনীতিক, দাতাগোষ্ঠী ও মিডিয়ার সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করে নিয়েছে। একজন বিদেশি কূটনীতিক আমাকে বলেছেন, আমাদের কূটনৈতিক মহলে হেফাজত সমর্থক অন লাইন অ্যাকটিভিস্টরা একটি রম্য লেখা প্রচার করছে, যেখানে দেখানো হয়েছে যে, একই দিনের জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেছেন, আমরা হেফাজতকে কিছুই মনে করি না। ওদের মোটেও পাত্তা দিই না। ব্লগাররা মন্তব্য করেছেন, পাত্তা দেন কি দেন না, এর দলিল হিসেবে তাদের এসব বক্তব্যই কি যথেষ্ট নয়? একটি সংগঠনকে নিয়ে সরকারের বড় বড় সব মাথাকে যদি এত জোর গলায় বলতে হয় যে, এ নিয়ে আমাদের মোটেও মাথা ব্যাথা নেই, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ ভাববে যে, আসলে মুখে তারা যাই বলুন না কেন, হেফাজতকে নিয়ে তারা ভীষণ চিন্তিত, একে নিয়ে তারা মাথাব্যথায় অস্থির।
প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, ৫ সিটি কর্পোরেশনে সরকারি দলের ভূমিধস পরাজয়ের পর দলীয় নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী সাহসের বাণী শুনালেও এবং ভোটারদের প্রতি অনাস্থা ও উষ্মা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখলেও ভেতর গতভাবে তিনি খুবই চিন্তিত। যে কোনভাবে অবাধ সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন হলে ফলাফল যে কেমন হবে তা তিনি খুব ভাল করেই জানেন। লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত হলে তার দল সিটি নির্বাচনের মতই হোয়াইট ওয়াশের শিকার হবে বলে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদন থেকেও তা স্পষ্ট। সংবিধান মত সবকিছু ঠিকঠাক চললে একরকম। কিন্তু যদি বিরোধী রাজনৈতিক মহল, সুশীল সমাজ, বিদেশী দাতা ও সহায়ক গোষ্ঠী এবং শতকরা ৯০ ভাগ জনগণের মত অনুযায়ী নির্দলীয় সরকারের আওতায় নির্বাচন দিতে হয়, তাহলে হেফাজত প্রভাবিত জনমত সপক্ষে আনতে না পারলে আওয়ামী লীগের ফলাফল হবে ভয়াবহ। এসব ভেবেই হয়ত তিনি হেফাজত মোকাবেলায় বহুরৈখিক কৌশল বেছে নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা বাস্তবায়নে কাজ করছেন অন্তত: বিশজন উপদেষ্টা, মন্ত্রী, নেতা, এমপি, ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পপতি ও আমলা। প্রধানমন্ত্রীর হেফাজত মোকাবেলার কৌশল এবং নিযুক্ত লোকজন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করতে নারাজ এই সূত্র মতে, কয়েক মাস ধরে অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে, বহু কৌশল খাটিয়ে এবং বিপুল অর্থ ব্যয় করেও হেফাজত মোকাবেলায় সংশ্লিষ্টরা কোন সাফল্য না পাওয়ায় নেত্রী এখন খানিকটা ক্ষুব্ধ ও হতাশ। জাতিসংঘ সম্মেলন শেষে দেশে ফিরলে তাকে হেফাজত সম্পর্কে কোন সুখবর দেযার জন্য সংশ্লিষ্টরা শেষ মুহূর্তে মরিয়া হয়ে উঠলেও ফলাফল শূন্য।

শেয়ার করুন