গার্লফ্রেন্ড

0
167
Print Friendly, PDF & Email

তিন পাখির কিচিরমিচির শুনছি সাইবার ক্যাফেতে।
পাখি বলতে টিয়া পাখি, ময়না পাখি, টুনটুনি কিংবা বুলবুলির কিচিরমিচির নয়। তিন তরুণীর কিচিরমিচির। অবশ্য এদেরকে তরুণী বলাটা ঠিক হবে কিনা জানি না। কথা শুনে বোঝা গেল, এরা সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু করেছে। সেই হিসাবে বয়স ষোল-সতের হওয়ার কথা। ষোল-সতের বছরের মেয়েদের তরুণী বলা যায় কিনা চিন্তা করতে হবে। কবি-সাহিত্যিকরা এ বয়সী মেয়েদের তরুণী বললেও সরকারি আইন বলছে এরা শিশু। আমাদের আইন মোতাবেক ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু। কথাবার্তায় অবশ্য তিন মেয়ের কাউকেই শিশু বলে মনে হচ্ছে না। তিনজনের দুজনেরই বয়ফ্রেন্ড আছে এবং দুজনই বিশাল বিশাল গপ্প ঝাড়ছে তাদের বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে। তিন নাম্বার মেয়েটির সম্ভবত বয়ফ্রেন্ড নেই। তাই দুই বান্ধবীর রোমান্সের গল্প শুনছে খুব মনোযোগ দিয়ে। চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে, খুব আফসোস হচ্ছে তার। একটা বয়ফ্রেন্ড যদি তারও থাকত, সেও বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প করতে পারত।

তিনজনই বসেছে এক কম্পিউটারে। অল্পবয়সী মেয়েরা একসঙ্গে থাকলে যা হয়; চিত্কার-চেঁচামেচি, দুষ্টামি, খোঁচাখুচি, হি হি হাসি সবই হচ্ছে। রুমের অন্য ইউজাররা বেশ বিরক্ত হলেও আমি বিষয়টা উপভোগ করছি। এক মেয়ে কিছুক্ষণ হি হি করে হেসে বলল, এই জানিস, আমার বয়ফ্রেন্ড না ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড চেয়েছিল। আমি দেইনি। শখ কত দেখেছিস? প্রেম করি বলে কি পাসওয়ার্ডও দিয়ে দিতে হবে নাকি। গাধা একটা।
এবার পাশের মেয়েটাও কিছুক্ষণ হি হি হেসে বলল, আমি কিন্তু ভাই অন্য রকম। আমার বয়ফ্রেন্ড আমাকে খুব বিশ্বাস করে। আমিও তাকে বিশ্বাস করি। তাই দুজনই এফবি অ্যাকাউন্ট খুলেছি একসঙ্গে বসে। দুজনই দুজনের পাসওয়ার্ড জানি।
মেয়েটির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনজনই এবার হি হি করে হেসে উঠল। তবে হাসির কারণটা যথারীতি বুঝলাম না। হাসি থামার পর যে মেয়েটি ফেসবুক চালাচ্ছিল সে চিত্কার করে বলল, এই দেখ দেখ। আমাদের ক্লাসের দিপার বয়ফ্রেন্ডের কি অবস্থা! কি রকম ভোন্দা মার্কা চেহারা দেখেছিস। ছাগলের মত কত বড় সানগ্লাস পড়ে ছবি তুলেছে। আসলেই একটা ছাগল। দিপা তাকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোড়াচ্ছে।
আবার তিনজন হি হি হি করে হাসল। তাদের হাসি দেখে কেন জানি মনে হলো, আমারও একটা গার্লফ্রেন্ড থাকলে খুব ভালো হতো। তার সঙ্গে কিছুক্ষণ কিচিরমিচির করতে পারতাম, হি হি হি করে হাসতে পারতাম। এ রকম ইচ্ছা অবশ্য মাঝেমধ্যেই জাগে। বাসায় বউ আছে আমার। কিন্তু তাকে তো আর গার্লফ্রেন্ড বলা যায় না। গার্লফ্রেন্ড হচ্ছে গার্লফ্রেন্ড, বউ হচ্ছে বউ। গার্লফ্রেন্ডের মজা এক রকম আর বউয়ের মজা আরেক রকম। বউকে যখন ইচ্ছা তখনই জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া যায়, কোনো বাধা দেয় না। কিন্তু গার্লফ্রেন্ডকে চুমু খেতে হয় লুকিয়ে লুকিয়ে, একদম হঠাৎ করে। গার্লফ্রেন্ড আনন্দে লাফাতে লাফাতে বয়ফ্রেন্ডকে একটু আধটু বাধা দেবে। তবু তার বয়ফ্রেন্ড জোর করে চুমু খেয়ে ফেলবে। সেই চুমুর মধ্যে নিশ্চয়ই অন্য রকম একটা শিহরণ থাকে, যা স্ত্রীকে চুমু খাওয়ার মধ্যে থাকে না।
আজকালকার মেয়েরা অবশ্য অনেক বেশি ফাস্ট। চুমু খেলেও অনেকে কোনো বাধাটাধা দেয় না। ২০-২৫ বছর আগে কোনো ছেলে যদি এমন করত, মেয়েটি নিশ্চিত লজ্জায় লাল হয়ে যেত। তারপর হয়তো রাজ্জাক-কবরীর বাংলা সিনেমার মতো বলতো, ‘যাহ্ দুষ্টু’।

তিন মেয়ের উচ্ছ্বাস দেখে গার্লফ্রেন্ডের আকাঙ্ক্ষাটা আবারও তীব্র হয়ে উঠল আমার। খুব আফসোস হতে থাকল। এ আফসোসটা অবশ্য সারাজীবনেরই। বিয়ের আগে জীবনে বহুবার প্রেম করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু একটাতেও সফল হইনি। রবার্ট ব্রুস সাতবার চেষ্টা করে যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন। আমি অসংখ্যবার চেষ্টা করেও একটা গার্লফ্রেন্ড যোগাড় করতে পারিনি। তবে বিয়ের পর আমার স্ত্রী শম্পা কিছুটা হলেও এ আফসোস ভুলিয়ে দিচ্ছে। যখন আমার প্রেম করতে ইচ্ছে হয়, তখন আমরা দুজন বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড সাজি। তারপর শম্পাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে ফোন করি। শম্পা ফোন ধরার সঙ্গে সঙ্গেই আমি চিত্কার করে ডাকি, টুনটুনিইইইই…।
অপর পাশ থেকে শম্পার উত্তর, কী জান?
-টুনটুনি, তোমাকে আজ খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। তুমি একটু বারান্দায় আসনা প্লিজ। একনজর দেখে যাই।
শম্পা আমার পাগলামির আনন্দে বিরক্ত হয়ে বলে, এখন বারান্দায় যেতে পারব না। মা আমার রুমেই আছে। দেখে ফেললে বকা দিবে। তোমার জন্য এখন বকা খেতে পারব না।
আমি একটু মন খারাপ করার ভান করে বলি, তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসনা ময়না পাখি। অথচ দেখ, আমি কত দূর থেকে চলে এসেছি তোমাকে দেখতে। তোমার জন্য আমি সব কিছু করতে পারি টুনটুনি।
শম্পা আমার বারবার অনুরোধে অবশেষে বারান্দায় আসতে রাজি হয়। আমি তাকে দূর থেকেই দেখি। ইশারা-ইঙ্গিতে কিছুক্ষণ কথা বলি আমরা। তারপর চলে আসি নিজের বাসায়।

মাঝেমাঝে শম্পাকে ফোন দিয়ে বলি, টুনটুনি চলো আজকে ডেটিংয়ে যাই। কতদিন আমরা পাশাপাশি বসি না! তোমার হাত ধরে হাঁটি না।
শম্পা প্রথমে না না করে, তার মা জানতে পেলে বকা দিবে বলে। তবে আমার অনেক অনুরোধের পর রাজি হয়। আমরা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করতে যাই। আমি আর শম্পা একটা রেস্টুরেন্টে বসে স্যুপ খাই আর পাখির মত কিচিরমিচির করি, গুটুরগুটুর-পুটুরপুটুর গল্প করি।

সন্ধ্যা হয়ে আসলে শম্পাকে একটা রিকশাতে তুলে দেই বাসায় যাওয়ার জন্য। রিকশায় উঠে শম্পা হাত তুলে টাটা দেয়। আমিও টাটা দেই। শম্পা আমাকে রেখে চলে যায় তার বাবার বাসায়। আমি তার রিকশার দিকে তাকিয়ে থাকি যতক্ষণ আমার দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকে। রিকশা চলে যায়, শম্পাও চলে যায়, চলে যায় আমার গার্লফ্রেন্ড।
আমি একাএকা হাটি আর গুনগুন করে গান গাই- I just called to say I love you…I just called to say I love you…

শেয়ার করুন