সরকারি অর্থে নির্বাচন প্রস্তুতি অর্থমন্ত্রীর!

0
100
Print Friendly, PDF & Email

সরকারি অর্থ ব্যবহার করে নির্বাচনের মাঠ গোছাচ্ছেন মহাজোট সরকারের প্রভাবশালী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এরই মধ্যে নিজেই নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করে তিনি এখন ঘনঘন সিলেটে যাচ্ছেন। তার তৎপরতায় সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দলীয় মনোনয়নের থোড়াই পরোয়া করেন তিনি।

সূত্র বলছে, চলতি সেপ্টেম্বরেই তিন তিনবার সিলেট ছুটে গেছেন মুহিত। এক মাসে তার তিন দফা সিলেট সফর এবারই প্রথম। আর রাজনৈতিক কারণে গেলেনও সবগক`টি সফরকে দেখাচ্ছেন সরকারি সফর হিসেবে। অথচ সরকারি  কোনো কর্মসূচিতে যাননি তিনি সিলেট সফরে।

আগামী নির্বাচন সামনে রেখে নিজের মাঠ তৈরিই এসব সফরের উদ্দেশ্য, বলছেন ওয়াকিবহাল মহল ও রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।  Mohit

আর অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, দফতরের কাজ রেখে অর্থমন্ত্রী সিলেটে নিজের নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকায় নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে থাকছে মন্ত্রণালয়ে।

সূত্র জানিয়েছে, মুহিতের “সরকারি সফরে“ তার সঙ্গী হচ্ছেন একান্ত সচিব (পিএস) এসএম জাকারিয়া, সহকারী একান্ত সচিবের (এপিএস) দায়িত্বে থাকা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক কর্মকর্তা, তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তাদের যাতায়াত খরচ ও হোটেল ভাড়া থেকে শুরু করে সব ধরনের খরচ বহন করা হচ্ছে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে। আবার এসব কর্মকর্তা ভ্রমণভাতাও নিচ্ছেন এসব রাজনৈতিক সফরের জন্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী আগে মাসে কিংবা দু’মাসে একবার সিলেটে যেতেন। তবে কখনো পনের দিনে একবার যেতেন জরুরি কাজ থাকলে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন টেলিফোনে বাংলানিউজকে বলেন, সিলেটে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। এসব বৈঠকে সাংগঠনিক নির্দেশনা তিনি দিচ্ছেন। বিশেষ করে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে নেতাকর্মীদের।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিলেট আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা বলছেন, আবুল মাল আবদুল মুহিত সিলেট এসে আমাদের সঙ্গে তার নিজের এবং সিলেটের নির্বাচনী প্রস্তুতি চূড়ান্ত করছেন। আমাদের তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচন করবেন। সংবাদ মাধ্যমকেও তিনি একই কথা বলেছেন। যদিও এটা দলীয় শৃ্ঙ্খলা পরিপন্থি। দলীয় সিদ্ধান্ত বা মনোনয়নের আগে তিনি নিজেকে প্রার্থী ঘোষণা করতে পারেন না। তবুও তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে ঘন ঘন সিলেটে আসছেন। ভিত্তি প্রস্তুর স্থাপন করছেন, ফিতা কাটছেন। এসব কিছুই রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশে করা। 
muhit-new-sm
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসের ৬ তারিখে দু’দিনের সফরে সিলেটে যান মুহিত। যেটি ছিলো দু’দিনের সরকারি সফর।

অর্থ মন্ত্রণালয় এ সফরকে সরকারি বললেও সিলেটের স্থানীয় সূত্র জানায়, এটি নির্বাচনী সফরের বাইরে আর কিছু নয়। এসময় নগরীর চৌহাট্টায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পুনর্নির্মাণ কাজ পরিদর্শন, রিকাবীবাজারে কাজী নজরুল অডিটোরিয়ামের সংস্কার কাজের ভিত্তিপ্রস্তুর স্থাপন অনুষ্ঠানে যোগদান, সুরমা নদীর দক্ষিণ তীর সংরক্ষণ ও সৌন্দর্য বর্ধন কাজের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদান, সার্কিট হাউস সংলগ্ন ক্লিন ব্রিজের পাশের সুরমা নদীতে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকা ছাড়া কোন সরকারি কাজ করেন নি অর্থমন্ত্রী।

ওই সফরে নিজের নির্বাচন প্রস্তুতি নিতে ধোপাদিঘির হাফিজ কমপ্লেক্সে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ন করেন তিনি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ওই সফরকালেই আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ আসন থেকে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।

এর আগে গত ৩০ মে সচিবালয়ে তিনি বলেন, এখনই রাজনীতি ছাড়ছি না। তবে আগামীতে আর মন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছা নেই।

সংবাদ মাধ্যমের সম্পাদকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মুহিত বলেন, মন্ত্রী হিসেবে আমার যে দায়িত্ব তাতে দিনে কমপক্ষে ১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। আগে আমি ১৬ ঘণ্টাই কাজ করতে পারতাম। এখন ১২ ঘণ্টার বেশি পারি না। মূলত এ কারণেই আমি পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিত্ব থেকে বিরত থাকতে চাই। তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা আছে।
Muhit-3
সূত্র জানায়, এরপর গত ১৬ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো আবার সিলেট যান প্রভাবশালী এই মন্ত্রী। তিন দিনের ওই সরকারি সফরে বিমানবন্দর থেকে  তিনি হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরান (র.) এর মাজারে যান। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মাজার জিয়ারতে অংশ নেন। এরপর গোলাপগঞ্জ গিয়ে ফের ফেরত যান সিলেটে।এ সফরেও মতবিনিয়ম করেন নিজের এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে।

সূত্র বলছে, চলতি সেপ্টেম্বরের ২৪ তারিখে তৃতীয়বারের মতো সিলেটে যান মুহিত। এসময় তিনি চারদিন সেখানে থাকেন। এই চারদিনে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা আর ফিতা কাটার বাইরে কোনো সরকারি কাজ ছিলে না তার। তবে ঠিকই ছিলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। মতবিনিময় ছিলো জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে।

প্রসঙ্গত, গত নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে জয়ী হওয়ার পর অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন আওয়ামী লীগ নেতা মুহিত। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাস বলছে, ওই আসনে যে দল জয় পায়, সেই দলই সরকার গঠন করে।   
 
৮০তে পা দেওয়া মুহিত ১৯৮২-৮৩ সালে এইচএম এরশাদের সরকারের সময়েও প্রায় ২০ মাস অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এক সময়ের ডাকসাইটে আমলা দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছা অবসরে গিয়ে যোগ দেন মন্ত্রিসভায়। তখন তার বয়স ৫০ বছরও পূর্ণ হয়নি।

একাত্তরে ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসের ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স মিনিস্টারের দায়িত্বে ছিলেন মুহিত। তখন তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে পরের বছরই সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। পরে অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও উচ্চতর শিক্ষা নেন মুহিত। ১৯৭২ সালে ৩৭ বছর বয়সে তিনি সচিব পদে উন্নীত হন এবং পরিকল্পনা ও বহিঃসম্পদ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেন।

শেয়ার করুন