৩৪২ জন অতিরিক্ত জনবল নিয়োগই সংকটের কারণ

0
42
Print Friendly, PDF & Email

অনুমোদনের বাইরে অপরিকল্পিত জনবল নিয়োগই রংপুরে অবস্থিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকটের মূল কারণ। সাবেক উপাচার্য আবদুল জলিল মিয়ার আমলে অনুমোদিত ৩৩৬টি পদের বিপরীতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী মিলিয়ে মোট ৬৭৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত জনবল হয়ে গেছে ৩৪২ জন।

মূলত এসব জনবলের বেতন-ভাতা ও চাকরি নিয়মিতকরণ নিয়েই সংকটের মুখে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো আন্দোলন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাবেক উপাচার্যের রেখে যাওয়া জঞ্জাল সরাতে হিমশিম খাচ্ছে মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং বর্তমান উপাচার্য।

বিদ্যমান সংকট সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য সরকারের কাছে আপৎকালীন ১০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ চেয়েছেন। কিন্তু এখনো অনুমোদন মেলেনি।

উদ্ভূত পরিস্থিতি উত্তরণে ইউজিসি গঠিত কমিটি সংকটের কারণ উল্লেখ করে তা থেকে উত্তরণে আটটি সুপারিশ করেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। গত মাসে ইউজিসির সদস্য আতফুল হাই শিবলীকে আহ্বায়ক করে ওই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটি সরেজমিনে এই প্রতিবেদন তৈরি করে।

 প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়টির নিয়োগের ওপর সরকার ও ইউজিসির নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গত ১ জানুয়ারি থেকে ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আট দিনে ২৮৫ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে অস্থায়ী, অ্যাডহক ও দৈনিক হাজিরা ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা নজিরবিহীন। এত অল্প সময়ে এত অধিকসংখ্যক কর্মকর্তা, কর্মচারী অননুমোদিতভাবে নিয়োগ দেওয়াতেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়।

জানতে চাইলে কমিটির আহ্বায়ক ও ইউজিসির সদস্য আতফুল হাই শিবলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এখন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’

এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী সালাহউদ্দিন আকবর জানান, তাঁরা প্রতিবেদন পেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এভাবে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য দায়ী সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চান তাঁরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউজিসি থেকে কয়েক দফায় ৩৩৬ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিভিন্ন পদের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে শিক্ষকের ৮২টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ৯২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে ১৮ আগস্ট শিক্ষকের আরও ৩০টি পদ অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে শিক্ষকের ২০টি পদ এখনও শূন্য।

অন্যদিকে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা পদের ৬২ জনের অনুমোদন থাকলেও নিয়োজিত আছেন ৭০ জন। দ্বিতীয় শ্রেণীর কর্মকর্তা পদে ২০ জন অতিরিক্ত আছেন। এই শ্রেণীতে ২২ জনের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৪২ জন। তৃতীয় শ্রেণীর ৫৯টি পদের বিপরীতে আছেন ১৩৪ জন। আর চতুর্থ শ্রেণীর ৮১টি পদের বিপরীতে নিয়োজিত আছেন ৩৪০ জন। এর মধ্যে ৫২ জন ‘কাজ নাই মজুরি নাই’ ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। চতুর্থ শ্রেণীর পদে অতিরিক্ত কর্মচারী আছেন ২৫৯ জন।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক জানিয়েছেন, মোট অতিরিক্ত জনবল ৩৩৮।

কমিটি বলছে, শিক্ষক পদে নিয়োগ নিয়ে সমস্যা না থাকলেও কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নিয়েই সবচেয়ে বেশি সমস্যা। গত জানুয়ারিতে মাত্র আট দিনে ২৮৫ জনের নিয়োগ খুবই অস্বাভাবিক। কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি যে নিয়মবহির্ভূতভাবে ইউজিসির অনুমোদন না নিয়ে গণহারে নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে হবে। নিয়মবহির্ভূত এই নিয়োগের ফলেই নব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম প্রায় স্থবির।

রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ খোলার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুযায়ী পদে ইউজিসির অনুমোদন নেওয়া হয়নি। এসব বিভাগে নিয়োগ দেওয়া জনবলের জন্য ইউজিসি থেকে বাজেট বরাদ্দ না থাকায় আর্থিক সংকটের সৃষ্টি হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবল কাঠামো (অর্গানোগ্রাম) অনুযায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা থাকার কথা ৩৩৪ জন। চলতি ২০১৩-১৪ অর্থবছরে জনবল ৪২৪ জন হওয়ার কথা। এই ৪২৪ জনের অনুমোদন দেওয়া হলেও চলতি অর্থবছরে আরও ১৬২ জন অতিরিক্ত থেকে যান।

কমিটির আট সুপারিশ: বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কমিটির আট সুপারিশের মধ্যে রয়েছে; উপাচার্যের আবেদন অনুযায়ী ১০ কোটি টাকা বিশেষ থোক বরাদ্দের ব্যবস্থা করা, ২০১৩-১৪ অর্থবছর পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী পদের অনুমোদনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা এবং যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ইতিমধ্যে অননুমোদিতভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের শুধু ওই সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী নিয়মিতকরণের ব্যবস্থা করা। এ ক্ষেত্রে অস্থায়ীভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। অ্যাডহক ভিত্তিতে এবং ‘কাজ নেই মজুরি নেই’ ভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে থেকে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনীয়তার নিরিখে পদের অনুমোদন পাওয়া সাপেক্ষে কমিশন থেকে যে পদ দেওয়া হবে শুধু সেই পদেই যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিয়োগ দিতে বলা হয়েছে। তবে আর্থিক সংকটের কারণে কমিটি ‘কাজ নাই মজুরি নাই’ ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া ৫২ জনকে বাদ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছে।

কমিটি বলছে ইউজিসির অনুমোদন ছাড়া ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আর কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করা যাবে না। তবে শিক্ষক পদে নিয়োগ প্রয়োজন হলে ইউজিসির অনুমোদন নিয়ে নিয়োগ করা যাবে। নতুন কোনো হল, বিভাগ বা অন্য কোথাও সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন হলে নিয়োগ দেওয়া জনবল থেকে সমন্বয় করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে বর্তমান উপাচার্য এ এম নূর-উন-নবী বলেন, সংকট সমাধানের জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

শেয়ার করুন