গিয়াসউদ্দিন মামুন বললেন আসেন এমপি সাহেব

0
286
Print Friendly, PDF & Email

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি গ্রেফতার হয়েছিলেন গত ২৫ জুলাই। কারাগারে বসেই তিনি লিখেছেন নিজের দুঃখ-কষ্ট ও আটক হওয়ার নেপথ্য কারণ নিয়ে। বাংলাদেশ প্রতিদিনে আজ ছাপা হলো তার লেখার একটি বিশেষ অংশ। তবে এরপর ধারাবাহিকভাবে থাকবে আটক কাহিনী, ডিবি অফিস, আদালতপাড়া এবং জেল জীবনের খণ্ডচিত্র -বার্তা সম্পাদক

রাত তখন সাড়ে ১০টা বেজে গেছে। কাশিমপুর কারাগারের মূল ফটক খুলে আমাকে অফিস রুমে নেওয়া হলো। দুজন ডেপুটি জেলার আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বসতে বললেন। তারপর প্রিজন ভ্যানের পুলিশ কর্তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করলেন। পুলিশের লোক বিদায় নেওয়ার পর ডেপুটি জেলাররা তাদের রেজিস্টারে আমার নামধাম লিপিবদ্ধ করলেন বেশ দ্রুততার সঙ্গে। আমি যদি ঢাকার জেলের প্রাথমিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে কাশিমপুরের ঘটনার তুলনা করি তবে এ স্থানকে জান্নাত বলে মনে হবে। এরপর এক কর্মকর্তা এলেন এবং নিজেকে সিনিয়র জেল সুপার বলে পরিচয় দিলেন। আমি তখন পর্যন্ত জেলের কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা সম্পর্কে অবহিত ছিলাম না। পরে জানলাম এখানে সিনিয়র জেল সুপারই হলেন সবচেয়ে বড় কর্তা।

আমার জায়গা হলো কাশিমপুর ২ নম্বর জেলে। এখানে মোট চারটি জেল রয়েছে পাশাপাশি। তবে ২ নম্বর জেলই হলো সবচেয়ে বড়। বলা হয়ে থাকে এই জেলখানাটি নাকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম জেল। ভারতের তিহার জেল নাকি সবচেয়ে বড়। তারপর আমাদের কাশিমপুর জেল। প্রায় ৩৫ একর জমির ওপর জেলটির ধারণ ক্ষমতা ১৮০০ বন্দী। কখনো বন্দীসংখ্যা ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে যায়। তবে এই মুহূর্তে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কমসংখ্যক বন্দী রয়েছে। সম্ভবত ১৪০০ বা ১৫০০ হবে। উপস্থিত তরুণ ডেপুটি জেলাররা গড় গড় করে তথ্যগুলো বলে গেলেন।

আমাকে সিনিয়র জেল সুপারের রুমে নেওয়া হলো। ভদ্রলোক বয়সে নবীন এবং চেহারার মধ্যে প্রচণ্ড আন্তরিকতার ছাপ আছে। তিনি আমাকে বসতে অনুরোধ জানালেন এবং আমি চা, কফি বা অন্য কোনো কোল্ড ড্রিংক খেতে চাই কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বিনয়ের সঙ্গে তাকে জানালাম আমার শরীরটা ভয়ানক ক্লান্ত। এই মুহূর্তে কোনো ধরনের আপ্যায়ন আসলে আমার কষ্টের কারণ হবে। আমি অনুরোধ জানালাম যত দ্রুত সম্ভব আমাকে নির্ধারিত গন্তব্যে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। ওই মুহূর্তে আমার দরকার ছিল প্রথমে গোসল এবং তারপর ঘুম। ভদ্রলোক বুঝলেন এবং আমার অনুরোধের সম্মানস্বরূপ দ্রুত ভেতরে পাঠানোর ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট সুবেদার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিলেন।

আমি জেল সুপার সাহেবকে জিজ্ঞাসা করলাম আমাকে কোথায় রাখা হবে এবং সেখানে আমার সঙ্গী-সাথীই বা কারা? তিনি বললেন সুরমা নামক একটি সেলে আমাকে থাকতে হবে। এটি মূলত সাধারণ বন্দীদের সেল। কিন্তু সম্প্রতি এটাতে ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দীদের রাখা হচ্ছে। বর্তমানে সুরমা সেলে ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এবং জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলী আছেন। মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে আমার একদিন পরিচয় এবং আলাপ হয়েছিল একুশে টিভির অফিসে অঞ্জন রায়ের রুমে। কট্টর আওয়ামীবিরোধী হলেও যৌক্তিক মানুষ বলেই তাকে আমার মনে হয়েছিল। মীর কাসেমের সম্পর্কে মীথ হলো তিনি অঢেল টাকার মালিক। তিনি দিগন্ত টিভি, নয়া দিগন্ত পত্রিকারও মালিক। ভদ্রলোকের সঙ্গে আমার জীবনে দেখা-সাক্ষাৎ বা কথাবার্তা হয়নি। অন্যদিকে গিয়াসউদ্দিন আল মামুন মূলত তারেক রহমান সাহেবের বন্ধু হিসেবেই সমধিক পরিচিত। ২০০১ সালের পর থেকে অদ্যাবধি অর্থাৎ গত ১৩টি বছর তিনি বিভিন্ন কারণে আলোচিত এবং সমালোচিত ব্যক্তি। তার নাম শুনে আমি ভীষণ বিব্রতবোধ করলাম। কারণ চার বছর ধরে যত টেলিভিশন টকশো করেছি তার বেশির ভাগ অনুষ্ঠানে তাকে যথেষ্ট গালমন্দ সহকারে অকথ্য ভাষায় সমালোচনা করেছি। নিশ্চয়ই সেই খবর তার অজানা নয়। আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তার সঙ্গেই থাকতে হবে। বিএনপির লোকজন আওয়ামী লীগারদের মানুষই মনে করে না। অনেকে কমিউনিস্ট নাস্তিক বলে গালি দেয়। আর ভারতের দালাল তো আমাদের কমন উপাধি। মাহমুদুর রহমান তার পত্রিকায় আওয়ামী লীগারদের ক্রমাগতভাবে ফ্যাসিস্ট এবং নির্লজ্জ মিথ্যাবাদী উপাধি দিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন এবং একাধিক বইও রচনা করেছেন। সেই অর্থে আমার তো লজ্জা থাকা উচিত নয়। কিন্তু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সামনে যেতে আমার সত্যিই খুব লজ্জা লাগছিল। আমি বিষয়টি সুপার সাহেবকে বললাম। তাকে জানালাম যে টকশোগুলোতে মামুন সাহেবকে গালি না দিলে একদিকে যেমন অনুষ্ঠান জমতো না অন্যদিকে পেটের ভাতও হজম হতো না। এখন কী করি বলুন তো! সুপার সাহেব সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, কোনো অসুবিধা হবে না। মামুন সাহেব এখানে খুব কো-অপারেটিভ মানুষ। সবাইকেই সাহায্য-সহযোগিতা করেন বিশেষ করে গরিব মানুষদের। আমি সুপার সাহেবের রুম থেকে বিদায় নিয়ে মূল জেলখানার ভেতরে ঢুকলাম এবং আমার গন্তব্যে পৌঁছার জন্য সুবেদার সাহেবকে অনুসরণ করতে লাগলাম।

জেলখানাটি আসলেই বেশ বড়। ভেতরের রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন এবং সড়কবাতি দিয়ে আলোকোজ্জ্বল করা। রাস্তার দুই পাশে হরেক রকম গাছ-গাছালিতে পরিপূর্ণ। প্রতিটি সেলই আলাদা। কোনোটি তিন তলা, আবার কোনোটি সাত তলা। প্রতিটি সেল আবার সুইফ দেয়াল দিয়ে ঘেরা। সেলগুলোর সামনে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গা রয়েছে। এর বাইরে যেসব উন্মুক্ত খালি জায়গা সেখানে নানারকম শাকসবজির চাষ করা হয়েছে। রাতের আলোতে সেসব দৃশ্য ভালোই লাগছিল। প্রায় ১০ মিনিট হাঁটার পর আমরা সুরমা সেলের সামনে এলাম। বিশাল বিল্ডিং। ১০০ ফুটের মতো লম্বা তিন তলা বিল্ডিং। সামনে প্রায় দুই বিঘার মতো খালি জায়গা। সেলের ভেতরে নানা রকম ফলদ ও ঔষধি গাছ লাগানো। আম, কাঁঠাল, বেলগাছ ছাড়াও নিম, বকুল, বটগাছসহ আরও কয়েক প্রকার গাছ রয়েছে। আমাকে দোতলার একটি রুমে আনা হলো। বেশ বড়সড় রুম। সাধারণ বন্দীরা যখন এই রুমে থাকত তখন ২০-২৫ জন বন্দীকে থাকতে হতো। আমাকে এই রুমে একা থাকতে হবে। রুমে প্রবেশ করে বুঝলাম আগে থেকেই কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে। রুমে চারটি লাইট এবং ছয়টি ফ্যান রয়েছে। সঙ্গে একটি কমোডওয়ালা টয়লেট, বামে গোসলখানা। রুমের এক কোনে একটি হাসপাতালের স্টিলখাট ও তোশক রয়েছে। সুবেদার সাহেব একটি বালিশ, বিছানার চাদর ও মশারির ব্যবস্থা করে বিদায় নিতে নিতে বললেন, আজ রাতটা একটু কষ্ট করুন। কাল সকালে কিছু লাগানোর ব্যবস্থা করা যাবে।আমার বেশ ক্ষুধা লাগছিল। অন্যদিকে রোজা রাখার জন্য সেহরিরও দরকার ছিল। আমি সুবেদার সাহেবকে বললাম, অন্যান্য বন্দীদের সঙ্গে পরিচিত হতে চাই। রাত তখন ১১টা পার হতে চলেছে। সব রুম লকআপ করা হয়ে গেছে। আমার কথা শুনে তিনি মুখ কালো করে ফেললেন। আমি আবদার করলাম, বন্দীদের সঙ্গে দেখা করা দরকার, একই সঙ্গে রাতের জন্য কিছু খাবার দরকার। আমাকে লকআপ খুলে তিন তলায় নিয়ে যাওয়া হলো। এই সেলের তিনজন বন্দী এবং তাদের সেবকরা সবাই তিন তলায় থাকেন। আমি কেবল একা দোতলায়। আমি লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে প্রথমেই গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের রুমে ঢুকলাম। তিনি তার বিছানার ওপর বসেছিলেন। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন এবং আসেন এমপি সাহেব বলে অভ্যর্থনা জানালেন। আমি বললাম, মামুন ভাই দ্যাখেন ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। গত চার বছর ধরে যাকে গালাগালি করে আসছি আজ তার সামনে আসতে হলো আসামি হয়ে। তিনি হেসে দিলেন এবং বললেন, ঠিক আছে। আমি সব জানি। কিন্তু এখন এগুলো নিয়ে আলোচনার সময় নয়। এখন আপনার জন্য দরকার কিছু খাদ্য এবং পানীয়।

জনাব মামুন তার একজন সেবককে দিলেন আমার রুমে থাকার জন্য এবং সঙ্গে রাতের ও ভোর রাতের জন্য কিছু খাবার। খাবার যাতে নষ্ট না হয়ে যায় সে জন্য তার একটি হট ক্যারিয়ার দিয়ে দিলেন। আমি তার এই উদারতা ও মহানুভবতায় বেশ আশ্চর্য হলাম। কৃতজ্ঞচিত্তে রুমে ফিরে এলাম। তারপর গোসল সেরে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমানোর আয়োজন করলাম। যে সেবকটি প্রদান করা হলো তার নাম হানিফ। ঢাকার ডেমরা অঞ্চলে বাড়ি। অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি। বয়স বছর ২৫ হবে। সাজা খাটছে গত প্রায় ৭ বছর যাবত। খুব সংক্ষেপে সেবক সম্পর্কে আমি তৎক্ষণাৎ অতটুকুই জানতে পারলাম। হানিফ বেশ অভিজ্ঞ। অভিজ্ঞ মানে নতুন ডিভিশনপ্রাপ্ত আসামিরা জেলখানায় এলে তাদের কি কি ধরনের প্রয়োজন হতে পারে কিংবা কি ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে তা তার মুখস্থ। সে সাধ্য মতো আমার প্রবোধ দিল এবং সুন্দর করে বিছানা করে মশারি টানিয়ে দিল। রুম যেহেতু তালাবদ্ধ করা হয়ে গিয়েছিল সেহেতু রুমের কোনো লাইট বা ফ্যান বন্ধ করার সুযোগ ছিল না। এখানে একটি বিষয় জানানো দরকার যে, জেলখানার কোনো সেলের মধ্যে কোনো বৈদ্যুতিক সুইচ থাকে না। এগুলো বাইরে রাখা হয়। সম্ভবত নিরাপত্তার জন্য।

আলোর মধ্যে আমি কখনো ঘুমাতে পারি না। এমনকি দিনের বেলায়ও আমাকে ঘুমাতে হলে রুমের পরিবেশ অন্ধকারময় হতে হয়। এ জন্য আমার ঘুমানোর রুমগুলোতে ভারী পর্দা লাগিয়ে ছিলাম। বাসা, অফিস, ফ্যাক্টরি কিংবা গ্রামের বাড়িতে আমার ঘুমানোর জায়গাগুলো আমি নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী প্রায়ই বিরক্ত হয়ে বলত, তোমার নবাবী দেখে আর বাঁচিনে। একদিন নবাবী ছুটবে এবং তখন বুঝবে ঠেলা কাকে বলে। স্ত্রীর কথা ফলে গেল ২০১৩ সালের ২৫ জুলাই বৃহস্পতিবার রাতে। উজ্জ্বল লাইটের আলোর মধ্যে আমি শুয়ে পড়লাম এবং ঘুমানোর জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা করতে লাগলাম। আমার মতো মহা ঘুমকাতুরে লোকের এত্তসব ঝক্কি-ঝামেলা, ক্লান্ত শরীর এবং কয়েক দিনের নির্ঘুম চোখের প্রতি ঘুমরাজ্যে একটুও দয়া হলো না। এভাবেই সেহরির সময় হয়ে গেল। আমি বিছানা থেকেই ওঠে হাতমুখ ধুয়ে সেহরি খাওয়ার চেষ্টা করলাম। ভাত, মুরগির মাংস, ডাল এবং সবজি- সবগুলোই হটপটে থাকার কারণে কুসুম কুসুম গরম ছিল। কিন্তু কিছুতেই মুখে রুচি হচ্ছিল না। আমি জানতাম যে কোনো বিরূপ পরিস্থিতিতে সর্বপ্রথম দরকার বেঁচে থাকার চেষ্টা করা। কাজেই প্রবল অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও জোর করে কিছু খাদ্য গলধঃকরণ করলাম।

সেহরির পর নামাজ পড়তে বসলাম। একটু দীর্ঘ সময় নিয়েই ইবাদত-বন্দেগি করলাম। অনেকে জেলখানাতে এসে একটু বেশি ধার্মিক হয়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। কারণ শৈশব থেকেই সব ফরজ এবং সাধ্য মতো নফল ইবাদত করার তালিম এবং অভ্যাস পারিবারিকভাবেই পেয়েছি। আর পেয়েছি মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা এবং কর্মে একটি মুসলমানিত্ব বজায় রাখার অন্তর্নিহিত তাগিদ। ফলে শত ব্যস্ততা, বিপদ-আপদ কিংবা বিরূপ পরিস্থিতিতে অনেক কিছু ত্যাগ করলেও আল্লাহ ও রাসূলকে আঁকড়ে রেখেছি আজীবন। ফলে জীবনের নানা পথপরিক্রমায় আমি কখনো অসুখী মানুষ ছিলাম না বা কখনো নিজেকে দীনহীন বা অসহায় মনে হয়নি। বরং কঠিন বিপদের মধ্যে বিজয়ের সুবাতাস বা সুঘ্রাণ অনুভব করেছি। এগুলো সবই আমার একান্ত ব্যক্তিগত মানসিক ব্যাপার। কখনো বাইরে জাহির করে দেবত্ব বা ওলিত্বের ভাব দেখানোর চেষ্টা করিনি। নামাজ পড়তে পড়তে সম্ভবত ভোর ৫টা বেজে গিয়েছিল। কারারক্ষীরা এসে রুমের তালা খুলে দিল। সেবক গিয়ে লাইট বন্ধ করে এলো। আর আমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে গেলাম। জীবনে এমন গভীর ঘুম কখনো ঘুমিয়েছি কিনা মনে নেই। কিন্তু সে দিন ঘুমিয়েছিলাম একনাগারে ভোর ৫টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত। সাধারণত আমার ঘুম খুব হালকা ধরনের। একটু টুকটাক শব্দ হলেই ঘুম ভেঙে যায়। আর ১-২ ঘণ্টা পর পর বাথরুমে যেতে হয়। কারণ আমি পানি একটু বেশি খাই। ফলে ৩-৪ ঘণ্টা বিরতিহীন ঘুম আমার জীবনে কখনো ধরা দেয়নি। আমি অঘোরে ঘুমাচ্ছিলাম। ঘুমের মধ্যে মানুষ নাকি অনবরত নানা রকম স্বপ্ন দেখে থাকে। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলে যাকে ইংরেজিতে বলে ঝড়ঁহফ ঝষববঢ়-মানুষ এসব স্বপ্ন মনে রাখতে পারে না। অন্যদিকে ঘুম ভালো না হলে মানুষ স্বপ্নের কথা দিব্যি বলে দিতে পারে। আমি আমার জেলজীবনের প্রথম নিদ্রায় হয়তো সহস স্বপ্ন দেখেছিলাম কিন্তু তার একটিও মনে করতে পারিনি।

আমি যখন অঘোরে ঘুমাচ্ছিলাম তখন এক কারারক্ষী এসে বাধ সাধল। তাকে পাঠানো হয়েছে আমাকে অফিসে ডেকে নেওয়ার জন্য। বেচারা অনেকক্ষণ আমার শিয়রে দাঁড়িয়ে ডাকাডাকি করে ব্যর্থ হয়। তারপর মনে হয় বিরক্ত হয়ে ধাক্কা মেরে ঘুম থেকে জাগায়। ধাক্কা খেয়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠার স্মৃতিও এক বিরল ঘটনা। আমার জীবনে কখনো এ রূপটি ঘটেনি। ভদ্রলোকের ধাক্কা খেয়ে আমি পাশ ফিরে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। লোকটি এবার ক্ষেপে গেল, সে আমাকে আবার ধাক্কা দিল। আমি এবার অবচেতন অবস্থা থেকে কিছুটা চেতনার জগতে ফিরলাম। সম্ভবত আমার কান সজাগ হলো। লোকটি বলল, উঠেন আপনার দেখা এসেছে। এটি আমার কাছে অপরিচিত শব্দ এবং ঘটনাও বটে। গত ৩০-৪০ বছরে আমাকে কেউ কখনো বলেনি- এই ঘুম থেকে উঠেন। কিংবা দেখা আসছে- এ ধরনের শব্দও শুনিনি। ফলে আমার মনে হতে লাগল আমি বোধ হয় স্বপ্ন দেখছি। আমি আয়েশ করে আবার পাশ ফিরলাম। কারারক্ষী মহোদয় বোধ হয় গত আধাঘণ্টা ধরে চেষ্টা করছিলেন। তিনি ধৈর্য হারিয়ে ফেললেন। আমার কোমরে বেশ জোরে ধাক্কা দিয়ে বললেন, উঠেন তো! নইলে আমি চলে যাব।

এবার আমি ধড়ফড় করে উঠে বসলাম। লাঠি হাতে কারারক্ষীকে দেখে মনে হলো সামনে আজরাইল দাঁড়িয়ে আছে। বোতল গ্রিন রঙের পোশাক পরা, কারারক্ষীটি ছিলেন বেশ লম্বাচোড়া এবং মোচওয়ালা। মাথায় একই রঙের টুপি, চোখে কালো সানগ্লাস এবং হাতে বড় বেতের লাঠি। মুখে স্পষ্ট বিরক্তি আর রাগের ছাপ। গভীর ঘুম থেকে তিড়িং করে লাফ মেরে খাটের ওপর বসে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কাঁপতে লাগলাম। আমি বাকরুদ্ধ হয়ে রইলাম প্রায় মিনিট খানেক এবং সম্ভবত প্রায় ৩০ সেকেন্ড আমার মস্তিষ্ক কাজ করছিল না। গত রাতে এক সুবেদার পদমর্যাদার কারারক্ষী আমাকে রুমে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল। দুজন কারারক্ষী সারা রাত আমাকে পাহারা দিয়েছে। কিন্তু তাদের পোশাকের রং বা বেশভূষার দিকে আমি একবারও তাকাইনি। আজ প্রকাশ্য দিবালোকে আমার বিছানার পাশে লাঠি হাতে কারারক্ষীকে দেখে আমি যারপরনাই ভীতসন্ত্রস্ত এবং হতবিহ্বল হয়ে পড়লাম।

সম্বিত ফিরে পাওয়ার পর আমি শান্তভাবে জিজ্ঞাসা করলাম-আপনি কে এবং এখানে কেন। কারারক্ষীটি বলল, আমি জেলার স্যারের অফিস থেকে এসেছি। আপনার দেখা এসেছে। আপনার জন্য মাত্র ৩০ মিনিট সময় বরাদ্দ। অথচ গত ৩০ মিনিট ধরে আমি আপনাকে ডাকছি। আপনার সেবকও রুমে নেই। ফলে আমাকেই ডাকতে হচ্ছিল এবং শেষমেশ আপনাকে ধাক্কা দিয়ে জাগাতে হলো। আমি বললাম, দেখা এসেছে- এই কথার অর্থ কি? সে বলল, হয়তো আপনার কোনো আত্দীয় সাক্ষাৎ করতে এসেছে। আমি খুশিতে আটখানা হয়ে পড়লাম। ওই অবস্থায় কারারক্ষীর সঙ্গে দিলাম দৌড়। আমার পরনে লুঙ্গি, গায়ে হাফহাতা গেঞ্জি এবং মাথা অবিন্যস্ত। অর্থাৎ যে পোশাকে আমি ঘুমিয়েছিলাম এবং যে অবস্থায় আমি ঘুম থেকে জাগ্রত হলাম ঠিক সেই অবস্থাতেই সাক্ষাৎ লাভের জন্য ছুটলাম। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর মনে হলো- আহা একটু বাথরুমে যাওয়া দরকার ছিল। একটু কুলি করে চোখেমুখে পানি দিয়ে মাথাটা অাঁচড়ালে ভালো হতো। পোশাকটাও পাল্টানো দরকার ছিল। যা হোক তখন আর ফেরা সম্ভব ছিল না। আমি দ্রুত এগোতে থাকলাম। আমি যখন সাক্ষাৎ লাভের জন্য দ্রুত পায়ে জেলগেটের অফিসের দিকে যাচ্ছিলাম তখন রাস্তায় শত শত সাধারণ বন্দীর সঙ্গে দেখা হলো। তারা বেশির ভাগই হয়তো আমাকে চিনত না বা চিনলেও পোশাক-আশাক কিংবা শ্রী দেখে এমপি গোলাম মাওলা রনিকে মেলাতে পারছিল না। তারা সবাই এক ধরনের ভয়মিশ্রিত করুণা নিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল এবং সম্ভবত আফসোস করছিল। আমি বন্দীদের এই আচরণের হেতু বুঝলাম না। তবে পরে বুঝেছিলাম। সাধারণত কোনো বন্দী জেলথানার কোনো নিয়ম ভঙ্গ করলে তাকে ওই অবস্থায় জেলারের কাছে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় শাস্তি দেওয়ার জন্য। শাস্তি মানে আচ্ছা মতো ধোলাই। আমাকেও যে ধোলাই দেওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এ কথা ভেবে বন্দীরা সব হা-হুতাশ করছিল।

জেলারের রুমে গেলাম। এই প্রথম ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচিত হলাম। নাম সুভাস। তিনি হাসিমুখে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। কিন্তু আমার পোশাক-আশাকের শ্রী এবং ঘুম ঘুম চোখ এবং উদাস মন দেখে বেশ আশ্চর্য হয়ে বললেন- কোনো সমস্যা। আমি উত্তরে বললাম না- না কোনো সমস্যা নেই; ঘুম থেকে জেগেই দৌড়ে এখানে এসেছি তো তাই…। তিনি হাসিমুখে বললেন- পাশের রুমে ভাবী-বাচ্চারা অপেক্ষা করছে। আমি সেই রুমের দিকে ছুটলাম। আমার স্ত্রী, কন্যা, দুই পুত্র, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু গনি, যে কিনা সরকারের এডিসি পদমর্যাদায় চাকরিরত এবং ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের শিক্ষক আমার প্রিয় ছোট বোন ফারহানা এসেছে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য। তাদের দেখে আমার চোখ জুড়িয়ে গেল এবং অন্তর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কিন্তু আমাকে দেখে তাদের চোখ অশ্রুসজল হয়ে পড়ল।

সাক্ষাতের রুমে ঢুকার পর আমরা প্রায় সবাই মিনিটখানেক বাকরুদ্ধ অবস্থায় রইলাম। কারও মুখে কোনো কথা নেই। এমনকি কারও দিকে কেউ তাকাতেও পারছিলাম না। বহু বছর ধরে আমরা একে অপরকে সবাই চিনে আসছিলাম পারিবারিক কিংবা নিবিড় বন্ধুত্বের বন্ধনে। তারা সবাই আমাকে দেখেছে সবসময় অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে কিংবা কাজে-অকাজে তাদের নানা উপদেশ বাণীতে জর্জরিত করতে। আজ আমাকে বন্দী অবস্থায় বিশেষত বিশ্রী পোশাকে দেখে নিশ্চয়ই মনে মনে অপ্রস্তুত হয়ে মুখের কথা হারিয়ে ফেলেছিল। আমিই প্রথম মুখ খুলে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম- কি এত দেরি করে দেখতে এলে কেন। সে বলল- খুব সকালেই তারা বের হয়েছিল আমার সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশে।

কিন্তু পূর্বের জানা তথ্য মতে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে উপস্থিত হয়ে জানতে পারি যে, রাতেই আমাকে ঢাকা থেকে কাশিমপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে। ফলে প্রাথমিকভাবে এ খবর শোনার পর যখন কারাফটকে বসে স্ত্রী-কন্যা, পুত্ররা কান্না শুরু করল তখন ২-১ জন কারারক্ষী দয়াপরবশ হয়ে তাদের সান্ত্বনা দিল এবং কাশিমপুর আসার পথ বাতলে দিল। পথ বাতলে দিল এ কারণে যে আমি বা আমার পরিবার বাংলাদেশের কোনো কারাগারে কোনো দিন আসামি কিংবা সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে যায়নি। ফলে নিয়মকানুন ও রাস্তাঘাট একেবারেই অচেনা এবং অজানা। আমিই আমার বিশাল পরিবারের চৌদ্দগোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা কারাগারে ঢুকে বংশের মুখ উজ্জ্বল করল।

বুধবার সকালে আমি বাসা থেকে বের হয়ে এসেছিলাম। বিকালে ডিবির হাতে গ্রেফতার হই। আবার সন্ধ্যার সময় স্ত্রী-পুত্র-সন্তানদের সঙ্গে দেখা হয় ডিবি অফিসে। মাঝে মাত্র একটি দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার আমরা কেউ কাউকে চাক্ষুস দেখিনি। আজ শুক্রবার আমাদের দেখা হলো কারাগেটে- অথচ মনে হচ্ছে আমাদের মাঝে বিশাল এক দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে এবং আমরা পরস্পর থেকে যোজন যোজন দূরে সরে গেছি। এর আগে আমি বহুবার পরিবার থেকে দূরে থেকেছি বা দুই মাসও হয়ে গেছে। কখনো বা বিদেশে গিয়েছি আবার কখনো বা নির্বাচনী এলাকায় গিয়েছি। আমার অনেকগুলো বদঅভ্যাসের মধ্যে একটি হলো দূরে কোথাও গিয়ে পরিবারের সঙ্গে টেলিফোনে কথা না বলা। এমনও হয়েছে আমি গেছি তো গেছি- এক মাস বা দুই মাসের মধ্যে একবারের জন্যও ফোন করিনি। আমার যুক্তি ছিল- দূরে থেকে আমি তো কোনো উপকার করতে পারব না। যদি বা কদাচিৎ কোনো সমস্যা হয়। অধিকন্তু সমস্যার কথা শুনে আমার স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হবে। আমার পরিবার আমার অন্যসব অত্যাচারের মতো এটাও মেনে নিয়েছিল। কিন্তু আজ মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে আমি নিজে পরিবারের সানি্নধ্য পাওয়ার জন্য কতটা পাগল বা উদভ্রান্ত হয়ে পড়েছি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।

আমি যতটা সম্ভব নিজেকে সংযত রেখে উপস্থিত পরিবারের সদস্যদের বোঝালাম জেলখানার ভেতরে আমার কোনো সমস্যা নেই। অধিকন্তু এমন সব আকর্ষণীয় বিষয় বর্ণনা করলাম যে জেলখানার ভেতরটা দেখতে তারা উৎসাহবোধ করল। আমার বন্ধু ও বোন ফারহানা আমাকে নানাভাবে সান্ত্বনা দিল- তারা বলল- ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক মাধ্যমগুলোতে আমাকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে এবং ১০০ ভাগ জনমত আমার পক্ষে। বিবিসির জরিপেও সবাই আমার পক্ষ বলছে। সে আদর্শিক বিষয়গুলো নিয়ে গত সাড়ে চার বছর আমি লেখনি, সভা, সমিতি, সেমিনার ও টেলিভিশন টকশোর মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে আসছিলাম তা জনগণ ভালোভাবেই জানে। তারা আমাকে আরও সান্ত্বনা দিয়ে বলল, আমি যখন বের হব তখন ইনশাআল্লাহ বীর পুরুষের মতোই বের হব। ভালো ভালো কথা শুনতে শুনতে আমার মন সত্যিই ভালো হয়ে গেল। এক ফাঁকে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম- দলের কোনো এমপি, মন্ত্রী কিংবা নেতা ফোন করেছিল কিনা। সে বলল- কেবল আবদুল মতিন খসরু ভাই ফোন করেছিলেন। অন্য কেউ ফোন তো করেনইনি বরং সে উল্টো ফোন করে তাদের কাছ থেকে যে ব্যবহার ও ভীরুতার পরিচয় পেয়েছে তা প্রকাশযোগ্য নয়।

আমরা প্রায় ঘণ্টাখানেক আলাপ করার পর বিদায় নিচ্ছিলাম। আমার স্ত্রী বলল- সব আইনজীবী বলছেন এটা কোনো মামলাই না। রবিবার জজকোর্টে আপিল করলেই জামিন হয়ে যাবে। আমাকে চিন্তা না করার পরামর্শ দিয়ে তারা বিদায় নিল আর আমিও খুশি মনে ডেরায় ফিরলাম। ইফতারির সময় গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, মীর কাসেম আলী এবং মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে দেখা হলো। আমরা ইফতারি করার পর মাগরিবের নামাজ একসঙ্গে পড়লাম। এরপর খানিকক্ষণ গল্প করতে বসলাম। মাহমুদুর রহমান বললেন- রনি তো রবিবারই ছাড়া পেয়ে যাবে। এটা তো কোনো মামলাই না। প্রত্যেকটি ধারা জামিনযোগ্য। কোনো নিম্ন আদালত সাধারণ মানুষকেও এই মামলায় জেল দেন না। হয় তো কোনো কারণে তোমার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। কিন্তু জজকোর্ট সঙ্গে সঙ্গে জামিন দিয়ে দেবেন। গিয়াসউদ্দিন আল মামুন এতক্ষণ কথা শুনছিলেন। এবার বললেন- আমার মনে হয় এমপি সাহেবের জামিন হবে না। যদি জামিনই দেবে তাহলে তাকে গ্রেফতার করা হতো না। এমপি সাহেবকে বেশ কিছুদিন অন্তত আগামী সংসদ অধিবেশনের পূর্ব পর্যন্ত থাকতে হবে। মাহমুদুর রহমান সাহেব দ্বিমত করলেন এবং দুজনের মধ্যে ছোটখাটো একটা বাহাস হয়ে গেল। আমি মনমরা হয়ে রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকলাম।

শেয়ার করুন