খোদার গোলামি ছেড়ে মসজিদ কমিটির গোলামি

0
274
Print Friendly, PDF & Email

ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্মানের দিক থেকে অতি সম্মানের পদ। ইসলামের প্রাথমিক যুগ অর্থাৎ রাসূলুল্লাহু (সা.) ও খোলাফায়ে রাশিদিনের যুগে ইমামের মর্যাদা ছিল অতি উচ্চে। যারা দেশের প্রধান ও শাসক হতেন তারাই মসজিদে ইমামতি করতেন। আবার নামাজের বাইরে মানুষকে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, যুদ্ধকৌশল, পারস্পরিক দায়িত্ব-কর্তব্য, বিচার-শান্তিশৃংখলা, সভ্যতা-সংস্কৃতিসহ মানবজীবনের নানা বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদান করতেন। তখন মসজিদ ছিল শিক্ষা-দীক্ষা, সমাজ ও দেশ পরিচালনার নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু। এ ধারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পরে দীর্ঘদিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ইতিহাস প্রমাণ করে, ৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে মিসরের সর্বশেষ আরব গভর্নর আনবাসা ইবনে ইসহাক মসজিদে জামিতে নামাজ পরিচালনাকারী সর্বশেষ আমির হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন (মাকরিজি : ৪/৮৩) দিনে দিনে অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। এখন রাষ্ট্র ও সমাজকে ধর্মজীবন থেকে আলাদা করে দেখা হয়। মনে করা হয় রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কোনই সম্পর্ক নেই। ফলে একজন রাষ্ট্রপ্রধান মসজিদে ইমামতি করবেন, জুমার খুতবা দেবেন এ বিষয়টা যেমন আজ আমরা কল্পনা করতে পারি না, ঠিক তেমনিভাবে একজন ইমাম রাষ্ট্রপ্রধান হবেন বা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজ তিনি করবেন এটাও ভাবতে পারি না। ইমামদের কর্মতৎপরতা সীমিত হয়ে পড়েছে চার দেয়ালের মাঝে। ইমাম অর্থ যে নেতা, তিনি নেতৃত্ব দেবেন রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের বিষয়ে তা আমরা একেবারেই ভুলে গেছি। মসজিদের বাইরে ইমামের বর্তমান যে ভূমিকা তা কেবল মিলাদ, ঝাড়ফুঁক বিয়ে পড়ানো, জানাজা নামাজ পরিচালনার মাঝে সীমিত। বর্তমানে আমরা ইমামতিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছি। আমরা মনে করি, একজন ইমাম নামাজ পড়িয়ে ঘরসংসার চালাবেন।

 এটা সম্পর্ণ ভুল ধারণা। ইমামতি হওয়া উচিত ঐচ্ছিক, জীবিকা উপার্জনের উপায় হিসেবে এটাকে গ্রহণ করা আদৌ উচিত নয়। এলাকাতে যিনি বেশি যোগ্য তিনি হবেন মসজিদের ইমাম। ইমামতির বেতন অতি সামান্য ও অনিয়মিত। চাকরিটাও অনিশ্চিত। অন্যান্য ক্ষেত্রে চাকরি পাওয়া যেমন কঠিন, চাকরি যাওয়াটাও তেমনি কঠিন। ইমামদের বেলায় ব্যাপারটা আলাদা। মসজিদ কর্তৃপক্ষ কেবল মুখ খুলে ‘না’ বললেই ইমাম সাহেবের চাকরি চলে যায়। এর চেয়ে অমানবিক আর কী হতে পারে। ইমাম হলেই আমরা ধরে নিই যে, তিনি যৎসামান্য বেতনে মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়াবেন আর দাওয়াত খেয়ে, টিউশনি করে, মিলাদ পড়িয়ে সংসার ব্যয় নির্বাহ করবেন। এ ধারণা চরম অমূলক ও অন্যায়। জীবন নির্বাহের জন্য অন্য কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করে কেবল মসজিদের যৎসামান্য বেতন-ভাতার ওপর ইমাম সাহেব নির্ভরশীল হওয়ার দরুন তিনি ইচ্ছা করলেও পারছেন না তার আÍসম্মান রক্ষা করতে। পারছেন না স্বাধীনভাবে বুক ফুলিয়ে সত্য কথাগুলো বলতে। ইমামের মর্যাদা যে আবার ঊর্ধ্বে, ইমাম যে আবার নেতা, এসব বেমালুম ভুলে গিয়ে তিনি হয়ে পড়ছেন মসজিদ কমিটির আজ্ঞাবহ। মান-মর্যাদা বিলিয়ে দিয়ে রত তিনি মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও মুসল্লিদের মনোরঞ্জনে। দুঃখ আর পরিতাপের বিষয় হলেও চিরসত্য, অনেক ক্ষেত্রে কিছু ইমামকে দেখা যায় খোদার গোলামির চেয়ে মসজিদ কর্তৃপক্ষের গোলামি প্রকাশে হয়ে পড়েন বেশি ব্যস্ত। এটা যে একজন আলেম ও ইমামের জন্য বড়ই লজ্জাকর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু তাই নয়, এ ধরনের ইমামের পেছনে নামাজ কতটুকু শুদ্ধ হবে, তা আলেমরা আশা করি ভেবে দেখবেন।

ইমামতি মহান দায়িত্ব। যে দায়িত্ব পালন করেছেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহু (সা.) নিজে, পালন করেছেন সাহাবা, খলিফা, আমির-ওমরারা, সে দায়িত্ব পালন করছে বর্তমানে আলেম সমাজ। কিন্তু যৎসামান্য বেতন-ভাতার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতিনিধি আলেম সমাজ হবে লাঞ্ছিত, ভূলুণ্ঠিত হবে ইমামতির মতো মহান পদের মর্যাদাÑ এটা আদৌ বাঞ্ছনীয় নয়। ঈদের দিন সবাই ঈদের আনন্দ-খুশি ভাগ করে নিতে থাকেন ব্যস্ত। কিন্তু ইমাম সাহেব ঘর-সংসার, বিবি-বাচ্চা রেখে পালন করেন ঈদের নামাজ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব। তাই তাকে সম্মান করা, তাকেও ঈদের আনন্দে শরিক করে নেয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। তবে এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যা হয় তাতে ইমামকে করা হয় হেয়প্রতিপন্ন, ইমামতির পদের মর্যাদাকে ছুড়ে ফেলা হয় মাটিতে। ঈদগাহ কমিটি ইমাম সাহেবের বকশিশের ব্যবস্থা নিজেরা ব্যক্তিগতভাবে না করে ঈদের দিন ঈদগাহে সব মানুষকে বসিয়ে রেখে ইমাম সাহেবের সামনেই তার নজরানার জন্য তাদের কাছে হাত পেতে কালেকশন করে। এটা বড়ই দৃষ্টিকটু, কষ্টদায়ক। বিষয়টি ভিক্ষাসদৃশ। পরিতাপের বিষয়, ঈদের নামাজ পরিচালনার মতো অতীব গুরুদায়িত্ব যিনি পালন করছেন তার সম্মানের ব্যাপারে বড়ই উদাসীন। ভিক্ষা না করে আমরা পারছি না তার প্রতি সম্মান দেখাতে। ইমামের উচিত ছিল এ খয়রাতি নজরানার প্রতি ভ্রƒক্ষেপ না করে ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কর্মের মাধ্যমে ঈদের খরচ নির্বাহ করা। তাহলে ইমামের সম্মান কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হতো। ইমামের পদের মর্যাদা ও আলেম সমাজের সম্মান প্রতিষ্ঠায় তাদেরই উদ্যোগী ও সচেষ্ট হতে হবে এবং জনসাধারণকে সচেতন করে তুলতে হবে। নি“োক্ত বিষয়গুলোর প্রতি ইমাম-খতিবেরা যদি সচেষ্ট হন তাহলে আমরা মনে করি কিছুটা হলেও তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।

ক. ইমামতি হওয়া উচিত ঐচ্ছিক। ইমামতির বেতন-ভাতার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে জীবন নির্বাহের জন্য হালাল ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্য কোন পেশা গ্রহণ করে সংসার চালানোর ব্যবস্থা করা বড় প্রয়োজন।
খ. দাওয়াত খাওয়া, টিউশনি, মিলাদ পড়া ও ঝাড়ফুঁক দিয়ে টাকা-পয়সা গ্রহণ করা ইমামের পদের জন্য বাঞ্ছনীয় নয়, তাই এগুলো অবশ্যই পরিত্যাগ করা উচিত।
গ. বাংলা ভাষায় গুছিয়ে প্রাঞ্জলভাবে কথা বলার দক্ষতা থাকা ইমামের জন্য জরুরি। জুমার দিন সমসাময়িক বিষয়ে দিকনির্দেশনামূলক বয়ান পেশ করতে হবে (এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ দেখা যায় পুরনো কিছু পুঁথি পড়ে শোনাতে, তাতে থাকে না কোন নির্দেশনা)।
ঘ. টাকা-পয়সা গ্রহণের ব্যাপারে তাকে থাকতে হবে খুবই সতর্ক। বিশেষ করে দান-খয়রাত গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
ঙ. ইমাম সাহেবের পোশাক হবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ব্যবহারে হবেন তিনি মার্জিত, ভদ্র ও শালীন।
চ. ইমামের কথা ও কাজ এক হতে হবে। সত্য বলায় থাকতে হবে সৎসাহস।
ছ. তিনি নিজের কাজ নিজে করবেন। যথাসম্ভব পরনির্ভরতা পরিহার করবেন।
জ. আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে আদর্শ রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের জন্য, আদর্শ ও নীতিবান মানুষ তৈরির জন্য ইমাম-খতিবেরা একান্তভাবে সচেষ্ট হবেন।
ঝ. আলোকিত সমাজ ও মানুষ গঠনের জন্য মসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষা, চিকিৎসাসহ প্রভৃতি গণমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে ইমাম-খতিবেরা মসজিদকে কর্মচঞ্চল করে তুলবেন।
এসব বিষয়ের প্রতি নজর দিয়ে ইমাম-খতিবেরা তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হবেন বলে আমরা আশাবাদী।

শেয়ার করুন