কাটাছেঁড়া গণতন্ত্রে আবেগি ভোটার

0
36
Print Friendly, PDF & Email

১৮৬৩ সালে ১৯ নভেম্বর পেনসিলভেনিয়ার গ্যাটিসবার্গে জন আব্রাহাম লিংকন এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। ৩ মিনিটে ২৬৫ শব্দ ব্যাবহার করে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেখান থেকে গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক ও কার্যকর সংজ্ঞা বের করেছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। ‘democracy is the government, of the people, by the people, for the people’. যার মানে দাড়াঁয়, গণতন্ত্র এমন সরকার ব্যাবস্থা, যেটি জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্যে।
 
কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে গণতন্ত্রের চর্চা করতে গিয়ে সেখানে বেশ কয়েকবার কাটাছেঁড়া হয়ে গেছে। আর গণতন্ত্রের জামা গায়ে দিয়ে নিজের ঘরে যেতে জনগণের নেত্রী আর দেশের নেত্রী সেটি নিয়ে এমন টানাটানি করেছেন যে, এখন ছিন্নভিন্ন অবস্থা। তাই ৪২ বছরেও বয়সে আর গড়নে বাড়েনি এখানকার গণতন্ত্র।
 
বাংলাদেশি আর বাঙালি নিয়ে দ্বন্দ্বে থাকা জাতির পূরণ হয়নি শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর চাহিদা। ৪২ বছর ধরেও শিক্ষার হার শতভাগে পৌছাতে পারেননি আমাদের অধিনায়কেরা। যে জনগণের জন্যে স্বাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেয়েছে, তারা শুধু জমি কেনার চেয়ে বেচাতেই বেশি এ স্বাক্ষর ব্যাবহার করে থাকে। এতেই সন্তুষ্ট নেত্রীরা।
 
কিন্তু নিম্ন শিক্ষিত আর অর্ধশিক্ষিত জনগণ দিয়ে সম্ভব হয়নি সাউথ আফ্রিকা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো ক্রিকেট টিম গঠন করা। যেখানে আবেগ নয়, যুক্তি দিয়ে চলে টিম। এমন রাষ্ট্রের প্রেক্ষিতে গণতন্ত্রের সংজ্ঞাও ভাবতে হচ্ছে নতুন করে। Democracy is the government, off the people, buy the people, fraud the people. যার মানে দাঁড়ায় গণতন্ত্র এমন সরকার ব্যাবস্থা, যা জনগণকে বন্ধ করে দেয়, জনণকে ক্রয় করে এবং জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে। গণতন্ত্রের মধ্য দিয়ে দেশের অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত ও আবেগি এ ভোটাররা যখন ব্যালটের মাধ্যমে সরকারে বসায় রাজনৈতিক দলগুলোকে, তখন রাষ্ট্রই প্রতারণা করে তাদের সঙ্গে।
 
অন্তত বছরের মধ্যবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়া দেশের ৫টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে গণতন্ত্রের যে বাতাশ বয়েছে সেটি তাই প্রমাণ করে।
 
২০১২ সালের অক্টোবরে ইউএনডিপি’র সবুজ বরিশাল প্রজেক্ট পরিদর্শন করতে গিয়েছিলাম। বরিশালের সাগরদি খালকে নিয়ে আধুনিক বরিশালকে প্রাচ্যের ভেনিস গড়ার স্বপ্ন দেখছিল স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। স্বপ্নতো দেখবেই, বরিশালের বেশ কিছু রাস্তা দেখেছিলাম, রাজধানী ঢাকার চেয়েও বেশি পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন আর সুন্দর। যাদের সঙ্গে সেবার কথা হয়েছিল, সবাই এ উন্নয়নের জন্যে কৃতিত্ব দিয়েছিলেন মেয়র হিরণকে।
 
এরপর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রথমবারের মতো ওই বিভাগীয় শহরে যাওয়া। অন্য যে কোন বিভাগীয় শহরের তুলনায় অনেক বেশি কোলাহল মুক্ত এ শহর। রাস্তাগুলো অনেক বেশি চওড়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রয়েছে। সেবা পুরোপুরি সন্তোষজনক না হলেও পদ্মার তীরেও ওয়াইফাই জোন রয়েছে। আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়েছিলেন এইচএম খায়রুজ্জান লিটন। এজন্য রাজশাহীর সাবেক মেয়রকেই কৃতিত্ব দেন নগরবাসী।
 
নগরের উন্নয়নে হীরণ আর লিটনের ভূমিকাকে শ্রদ্ধা জানালেও, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দুই ব্যাক্তির বিরুদ্ধেই ভোট দিয়ে এসেছে জনগণ।
 
রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করে গণতন্ত্রের বলি হয়েছেন লিটন। জাতীয় ইস্যুকে মূল ধরে এবং সরকারবিরোধী মনোভাব থেকে ভোটাররা বিএনপি প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে দিয়ে এসেছিলেন ভোট।
 
বরিশালেও বিজয়ী হন বিএনপি প্রার্থী আহসান হাবিব কামাল। এখানেও কাজ করে একই ইস্যু। নগরের উন্নয়নে হিরনের প্রশংসা করলেও ভোট পড়ে কামালের বাক্সে।
 
আবার রাজনৈতিক দল এবং দলীয় নেতার অন্ধ সমর্থন রয়েছে অঞ্চলভেদে ভোটারদের। এক্ষেত্রে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ অঞ্চলের ভোট যায় নৌকা মার্কায়, লক্ষ্মীপুর, ফেনীর কাছে সেরা ধানের শীষ আবার রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধার ব্যালট যায় লাঙ্গলে।
 
এসব এলাকার জনগণ উন্নয়ন বা অনুন্নয়নের চেয়ে বেশি ভাবেন দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের ওই দলের আজ্ঞাবহ হিসেবে প্রমাণ করতেই। এসব অঞ্চলে গণতন্ত্র অনেক সময়ই বাধা হয়ে দাঁড়ায় এলাকার উন্নয়নে।
 
অবশ্য জনগণের মধ্যে গণতন্ত্রের সুফল লাভের জন্যে যে চর্চা প্রয়োজন ছিল, তার জন্যে রাজনৈতিক দলগুলোকেই নেতৃত্ব দিতে হতো। রাষ্ট্র গঠনে আব্রাহাম লিংকম, লক, রুশো সবাই রাষ্ট্রে প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটি স্তরে গণতন্ত্র চর্চার কথা বলেছেন। গণতন্ত্রের গোড়ায় পানি দেয়না আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা। এর মানে নিজ রাজনৈতিক সংগঠনে গণতন্ত্র চর্চাকে নিজ আসন হারানোর জন্যে হুমকি মনে করেন তারা।
 
তবে দেশের ক্ষমতা নিতে গাছের আগায় পানি দেয়ার মতোই জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে গণতন্ত্র রক্ষার জন্যে আগুনের নদীতে ঝাপ দেন তারা। আগুন নদীতে এ খেলায় খেলায় স্বাধীনতার ৪২ বছর পারও করে ফেলেছে তারা।
 
প্রায় দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসনের অধীন থাকার পর, পাকিস্তান রাষ্ট্রে নির্যাতিত হয়েছে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এ জনগোষ্ঠী। ১৯৭১ সালে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র পেলেও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নয়। গত ৪২ বছরে ‍দুজন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করা হয়েছে এ রাষ্ট্রে, স্বৈরশাসনের মধ্য দিয়ে গেছে দীর্ঘ আট বছর। এরপর দুই দেশের ক্ষমতা নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের টানাহ্যাঁচড়ায় এক তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে চলছে দেশ। এই ৪২ বছরেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের গাড়িতে যেমন উড়েছে জাতীয় পতাকা, তেমনি স্বৈরশাসক আবারো এসেছে রাষ্ট্রক্ষমতায়।
 
দীর্ঘ এ রাজনৈতিক জঞ্জাল দেশের শিক্ষার হারকে পিছিয়ে রেখে, উন্নয়নকে করেছে বাধাগ্রস্ত। স্বল্পশিক্ষিত জাতি নিজেদের অধিকার সর্ম্পকে সচেতন হতে না পারলেও দুই দলের রাজনৈতিক চুলোচুলি নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে দু’ভাগে। পড়াশোনায় অনেকে শিক্ষিত হলেও আবার মানসিক দাসত্ব তাদের মুক্তি দেয়নি দু দলের মোহ থেকে। এই মোহে শিক্ষিত-অশিক্ষিত দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী যে সমর্থক তা অন্ধত্বেই রয়েছে। অনেক সময় দলীয় প্রধানের চেয়েও এসব অন্ধ সমর্থকের নাড়িতে বেশি টান লাগে দলের জন্যে মমতায়। যা দলের জন্যে হয়ে দাঁড়ায় কাল।
 
তাই গণতন্ত্রের পরিপূর্ণ সুফল ভোগ করতে এ দেশের জনগণকে পাড়ি দিতে হবে আরো অনেকটা পথ। সে পথে দলে গণতন্ত্রের চর্চা করেই জনগণকে পারদর্শী করে তুলতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই। দেশের শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে তৈরি করতে হবে সচেতন, যুক্তিবাদী ভোটার, যারা এনে দেবে গণতন্ত্রের সুবাতাস।

শেয়ার করুন