যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিশ্বের সমর্থন চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

0
74
Print Friendly, PDF & Email

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে ব্যাপক গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনকারীদের বিচারে সমর্থন দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের জন্য এই বিচার প্রয়োজন। এই বিচারের সফল সমাপ্তি যুদ্ধের ক্ষত মুছে দিয়ে বাংলাদেশকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।’

নিউইয়র্কে শুক্রবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৮তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেয়ার সময় তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‌‌২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডা প্রণয়ন জাতিসংঘের প্রতিটি রাষ্ট্রের জন্য একটি কঠিন কাজ। একটি ন্যায়ভিত্তিক, সমৃদ্ধ ও টেকসই বিশ্ব গড়তে আমাদের ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদের সবার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে। কোনো ব্যক্তি বা জাতি পিছিয়ে থাকবে না। বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও উদার ১৬ কোটি মানুষ সামনে থেকে এসব প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেবে।’

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আমাদের জাতির ধর্ম অসাম্প্রদায়িক কাঠামো ধ্বংস করতে অতি সক্রিয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার মাধ্যমে তাদের এই ধ্বংসাত্মক তৎপরতার শুরু হয়। স্বাধীনতাবিরোধী এই চক্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতিকে হত্যা পরবর্তী ২১ বছর দেশের ইতিহাস পেছন দিকে ফেরানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ অসাম্প্রদায়িক শক্তির দৃঢ় প্রতিরোধের কারণে তারা ব্যর্থ হয়।’

তিনি বলেন, ‘এসব যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য সরকার ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় দুটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। এই বিচার কাজ পরিচালনায় সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মধ্য দিয়ে জাতি গ্লানিমুক্ত হয়ে দেশে শান্তি ও অগ্রগতি চিরস্থায়ী রূপ নেবে।’

এ উদ্যোগকে সর্বাত্মক সমর্থন দেয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাসী ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি একত্রে এক সন্ত্রাসী চক্র গড়ে তোলে। দেশের প্রধান বিরোধীদল বিএনপি স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি জামায়াতের সঙ্গে কোয়ালিশন করে ক্ষমতায় গিয়েছিল। এই চক্র তাকে বার বার হত্যার চেষ্টা করেছে।

প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে তারা তাকে হত্যার উদ্দেশে উপর্যুপরি ১৩টি গ্রেনেড হামলা চালায়। এতে ২৪ জন নেতা-কর্মী নিহত এবং পাঁচ শতাধিক আহত হয়। এ হামলায় অলৌকিকভাবে তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও দলের সিনিয়র ও নিবেদিত নারী নেত্রী আইভী রহমানসহ অনেক নিরাপরাধ মানুষ ও অসাম্প্রদায়িক নেতা নিহত হন। এসব ভয়াবহ সন্ত্রাসী ঘটনার প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং জঙ্গিবাদ বিরোধী ও অর্থপাচার বিরোধী আইন প্রণয়ন করেছে।

১৯৭১ থেকে দালালদের বিচারের আওতায় আনতে জাতি গভীর আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে উল্লেখ করেশেখ হাসিনা বলেন, ‘বহু ত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী তাদের এদেশীয় দালালদের সহযোগিতায় গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। স্বাধীনতা অর্জনে ত্রিশ লাখেরও অধিক মানুষ প্রাণ দিয়েছে এবং দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছে।’

তিনি বলেন, ‘নিত্যনতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের ফলে বিশ্বে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। এসব আবিষ্কার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে অবদানের পাশাপাশি দ্বন্দ্বও সৃষ্টি করছে, যা অনেক সময় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বের অরক্ষিত, বঞ্চিত ও পশ্চাৎপদ জাতি-গোষ্ঠী।

প্রধানমন্ত্রী আশা ব্যক্ত করে বলেন, এ বছরের প্রতিপাদ্য- ‘২০১৫-পরবর্তী এজেন্ডাঃ প্রস্তুতি গ্রহণ’ ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ নির্ধারণে সহায়তা করবে। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০০০ সালে ‘সহস্রাব্দ ঘোষণা’ গ্রহণের সময় বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তার উপস্থিতি, ২০১০ সালে এমডিজি অগ্রগতি পর্যালোচনায় উপস্থিতি এবং এবার এমডিজি থেকে ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডায় উত্তরণেও তার অংশগ্রহণে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, গত সাড়ে চার বছরে বাংলাদেশের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ৫ কোটি মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠে এসেছে। রপ্তানি আয় ২০০৬ সালের ১০ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ২৭ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। রেমিট্যান্স ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০০৬ সালের ৩২০০ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ৯ হাজার ৫৯ মেগাওয়াটে পৌঁছেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে এখন ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল’ এবং ‘দক্ষিণ এশিয়ার মান বাহক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ এমডিজি অ্যাওয়ার্ড, সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড, গ্লোবাল ডাইভারসিটি অ্যাওয়ার্ড এবং এফএও ফুড অ্যাওয়ার্ড ২০১৩ লাভ করেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৬তম অধিবেশনে আমার উত্থাপিত ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ‘জনগণের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন মডেল’-এ বর্ণিত নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে এই গৌরব অর্জন সম্ভব হয়েছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে তার ভিশনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ‘স্টেট অব আর্ট’ হিসেবে গ্রহণ করেছে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত ডিজিটাল সুবিধা-সমৃদ্ধ ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র থেকে গ্রামের জনগণ দুই শতাধিক সেবা নিতে পারছে। গ্রামাঞ্চলে স্থাপিত প্রায় ১৫ হাজার ৫শ’টি কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে উন্নত চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমেও গ্রামের নারীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারছে। এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য সেবাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া হয়েছে। দেশে ১০ কোটির বেশি মোবাইল সিম ব্যবহৃত হচ্ছে।’

শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব, তার এই বিশ্বাসের উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন এবং ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য শিক্ষাই প্রধান চালিকাশক্তি। নারীর ক্ষমতায়ন এবং জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের মাধ্যমেই কেবল প্রত্যাশিত অগ্রগতি সাধন সম্ভব। এজন্য নতুন শিক্ষানীতিতে মেয়েদের জন্য উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হয়েছে। দরিদ্র পরিবারের ১ কোটি ১৯ লাখ শিক্ষার্থী মাসিক উপবৃত্তি পাচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পাঠ্যবই দেয়া হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের অত্যাসন্ন চ্যালেঞ্জের প্রতি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আমাদের অনেক অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সমুদ্রের পানির স্তর বেড়ে যাওয়ার অভিঘাত মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সমুদ্রের পানির স্তর ১ মিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পানিতে তলিয়ে যাবে। এর ফলে প্রায় ৩ কোটি মানুষ বাস্তুহারা হবে এবং অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে, যা দেশে এবং দেশের বাইরে এক মানবিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি জলবায়ুজনিত অভিবাসীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চিতের লক্ষ্যে একটি আইনি কাঠামো তৈরির জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে দেয়া তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানো এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কর্মপরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে ‘জলবায়ু পরিবর্তন তহবিল’ -এ পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকারমূলক কৌশল গ্রহণের আহ্বান জানান ।

মহান ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার দিবস ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করায় ইউনেস্কোকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী একইভাবে জাতিসংঘের প্রতি ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার আহ্বান জানান।

তিনি জাতিসংঘের বাংলা ওয়েবসাইট ও একটি রেডিও অনুষ্ঠান চালু এবং ইউএনডিপি এশিয়া রিপোর্ট বাংলায় প্রকাশ করায় জাতিসংঘকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাকে জাতিসংঘের একটি অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করতে তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন ।

গত ২০০৯ সালে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার সময় থেকে তার সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা, টেকসই উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এসব লক্ষ্য অর্জনে নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা এবং দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার ও তথ্য কমিশনকে শক্তিশালী করা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিগত পৌনে পাঁচ বছরে জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচন, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের ৫ হাজার ৭৭৭টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মাধ্যমে ৬৩ হাজার ৯৯৫ জন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। কোথাও কোনো অভিযোগ ওঠেনি। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সক্ষম।

তিনি বলেন, এর আগে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে তার প্রধানমন্ত্রীত্বেরকালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম ব্যাপকভিত্তিক পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি এবং মানববিধ্বংসী মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তি অনুসমর্থন করে।

শেয়ার করুন