উচ্চ আদালতে সরকারের জয়জয়কার : ‘স্বাধীন’ বিচার বিভাগ, সফল অ্যাটর্নি জেনারেল

0
122
Print Friendly, PDF & Email

স্বাধীন আদালতে সরকারের একের পর এক বিজয় নিশান উড়ছেই। ক্ষমতা গ্রহণের পর গত পৌনে পাঁচ বছরে মহাজোট সরকার সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে সব গুরুত্বপূর্ণ মামলাতেই জয় পেয়েছে।
হংকংভিত্তিক খ্যাতানামা মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত এপ্রিলে এক বিবৃতিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করে বলেছিল, ‘অ্যাটর্নি জেনারেলের আচরণ দাসসুলভ। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হওয়া তো দূরের কথা, তিনি আইনি কোনো পদে থাকারই যোগ্য নন।’
তবে তাদের সেই মূল্যায়নকে মিথ্যা প্রমাণিত করে বাংলাদেশের ইতিহাসে মাহবুবে আলম নিজেকে সঙ্গত কারণেই শেখ হাসিনা সরকারের সবচেয়ে সফল অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দাবি করতে পারেন।
চারদলীয় জোট সরকারের আমলে অনেক মামলাতেই সরকারকে উচ্চ আদালতে পরাজিত হতে হয়েছিল। অ্যাটর্নি জেনারেল সেই পরাজয় মেনে নিয়ে বিষণ্ন মুখে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতেন। মুন সিনেমা হলের মালিকানা সংক্রান্ত একটি তুচ্ছ মামলায় বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক (পরে বিতর্কিত প্রধান বিচারপতি এবং বর্তমানে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান) এবং বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের (বর্তমানে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান) দ্বৈত বেঞ্চ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে দিলে তত্কালীন অ্যাটর্নি জেনারেল শুধু ‘হতবাক’ হয়েই দায়িত্ব সেরেছিলেন। সেই সরকারের আমলে মামলাটিকে তিনি আর আপিল বিভাগের শুনানিতেই তুলতে পারেননি।
তবে এখনকার অবস্থা একেবারেই ভিন্ন। জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে এবং রাজনৈতিকভাবে শেখ হাসিনা অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়লেও বিচার বিভাগ, আইন মন্ত্রণালয় এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের করিতকর্মা পদক্ষেপে মেয়াদের শেষ সময়ে এসেও দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ চালাচ্ছেন।
এ হিসেবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের পাশাপাশি আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ এবং আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম মহাজোট মন্ত্রিসভার সফলতম মানিকজোড়। তাদের সাফল্যের কাছে অন্যসব মন্ত্রী ম্লান হয়ে গেছেন।
আইন ও নিরাপত্তা বাহিনীকে দলীয়ভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে ভিন্নমত শায়েস্তা এবং বিরোধী দলকে নির্জীব করে ফেলার অনন্যসাধারণ দৃষ্টান্ত রেখেছে মহাজোট সরকার।
বতর্মান সরকার আলোচিত যেসব মামলায় জয়লাভ করে বিশেষভাবে লাভবান হয়েছে, তার তালিকা এবং সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেয়া হলো :
কাদের মোল্লার ফাঁসির আদেশ : নজিরবিহীন এক রায়ে গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিমকোর্ট দেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের রায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। বাংলাদেশে এই প্রথম সুপ্রিমকোর্ট সরাসরি কাউকে সর্বোচ্চ দণ্ড দিল। ফলে তার আর আপিল করার সুযোগ রইল না। সর্বোপরি তাকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে যুদ্ধাপরাধ আইন সংশোধন করে সেই আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে, যেটি আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এছাড়াও আইনটি সরকার কয়েক দফা সংশোধন করে সরকারের ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ারে পরিণত করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সংশোধিত আইনের ভূতাপেক্ষ প্রয়োগের মাধ্যমে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের কড়া সমালোচনা করেছে এবং বলেছে রায়ে ন্যায়বিচারের মানদণ্ড লঙ্ঘিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাম্বাসেডর এট লার্জ স্টিফেন জে র্যাপ আইন সংশোধনের বিষয়ে প্রবল আপত্তি তুলে ধরেছেন।
জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ : গত ১ আগস্ট হাইকোর্টের দ্বিধাবিভক্ত রায়ে নির্বাচন কমিশনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিচারপতি এম. মোয়াজ্জাম হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্টের তিন বিচারপতি সমন্বয়ে গঠিত বৃহত্তর বেঞ্চ গতকাল এ রায় দেয়। বেঞ্চের অপর দুই বিচারক হলেন বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি কাজী রেজাউল হক। তিন বিচারপতির মধ্যে অধিকাংশ (দু’জন) নির্বাচন কমিশনে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলের পক্ষে মত দেন। অপর জন ভিন্নমত দেন বলে আদালতের সংক্ষিপ্ত রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তিন বিচারপতির মধ্যে কোন বিচারক ভিন্নমত পোষণ করেন তা উল্লেখ করা হয়নি।
আদালতকে ব্যবহার করে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নিবন্ধন বাতিল হলো। তবে এর আগেও স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিবের একদলীয় স্বৈরশাসনের আমলেও এ দলটি নিষিদ্ধ ছিল। পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হলে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী রাজনীতির সুযোগ পায়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রিট খারিজ : প্রথম ও একমাত্র নোবেলজয়ী বাংলাদেশী বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আওয়ামী লীগ সরকার তার নিজের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির পদ থেকে সরিয়ে দেয় ২০১১ সালের শুরুর দিকে। অজুহাত তার বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে। এ নিয়ে দেশে এবং বিদেশে সরকারের তীব্র সমালোচনা হয়। ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেই তিনি উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। কিন্তু আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সুফল পাননি। প্রথমে হাইকোর্ট তার আবেদন খারিজ করে দেয়। হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেন। কিন্তু বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগও তার আবেদন খারিজ করে দেয়।
পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা : পুরান ঢাকার ওয়াইজঘাটের মুন সিনেমা হলের মালিকানা নিয়ে দায়ের করা একটি মামলায় বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ ২০০৫ সালে একটি রায় দেন। এতে সিনেমা হলের মালিকানা দাবির বাইরে গিয়ে বিচারপতি খায়রুল হক অপ্রাসঙ্গিকভাবে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেন। অথচ সংবিধানের এ ঐতিহাসিক সংশোধনীর মাধ্যমেই একদলীয় স্বৈরাচারী বাকশালী শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বৈধভাবে রাজনীতি করার এখতিয়ার ভোগ করে।
দীর্ঘদিন ধরে আপিল বিভাগে এ রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে আপিল নিষ্পত্তি করে। আপিল বিভাগ কিছু সংশোধনীসহ বিচারপতি খায়রুল হকের হাইকোর্টে দেয়া রায় বহাল রাখে। আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাওয়ার আগেই আইন মন্ত্রণালয় ২০১১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সংবিধান থেকে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করে সংবিধান পুনঃমুদ্রণ করে। খসড়া সংবিধান নামে পুনঃমুদ্রিত এ সংবিধানে ৯৯ অনুচ্ছেদে আমূল পরিবর্তন আনা হয়। মূলত এ পরিবর্তনের মাধ্যমেই সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিও বাতিলের পথ তৈরি করা হয়। এভাবে বিচারপতি খায়রুল হক দেশে একটি রাজনৈতিক সংঘাত অনিবার্য করার সুযোগ করে দিয়ে যান। এটাও ছিল একটি বিভক্ত রায়।

শেয়ার করুন