আগামী নির্বাচনে ইলিয়াস আলী ইস্যু প্রভাব ফেলবে : কাদের মোল্লাকে আপিল রিভিউয়ের সুযোগ দেয়া উচিত

0
76
Print Friendly, PDF & Email

বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপ অনুষ্ঠানে প্যানেল সদস্য ও দর্শকরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী ইস্যু প্রভাব ফেলবে। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে সুপ্রিমকোর্ট মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর এই রায় রিভিউ করার সুযোগ দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা।
শনিবার রাতে নগরীর রিকাবীবাজার কাজী নজরুল ইসলাম অডিটোরিয়ামে বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপের ৪১তম পর্বে প্যানেল আলোচকরা ও উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা এমন অভিমত ব্যক্ত করেন।
বিবিসির এই সংলাপে এম ইলিয়াস আলী, যুদ্ধাপরাধ ইস্যু, দুর্নীতি ও পোশাক শিল্প নিয়ে আলোচনা করা হয়। আকবর হোসেনের উপস্থাপনায় সংলাপে প্যানেল আলোচক ছিলেন সিলেট-৫ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হাফিজ আহমদ মজুমদার, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মুকতাবিস-উন-নূর ও শাবিপ্রবির সহযোগী অধ্যাপক তাহমিনা ইসলাম।
বেশিরভাগ দর্শক মনে করেন, বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার ঘটনাটি আগামী জাতীয় নির্বাচনে সিলেট অঞ্চলে ক্ষমতাসীন সরকারি দলের রাজনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। এই দায়ভার কোনো অবস্থাতেই সরকার এড়াতে পারে না। তারা বলেছেন, যে বা যারাই ইলিয়াস আলীকে গুম করে থাকুক না কেন, তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের। এক্ষেত্রে সরকার যথেষ্ট আন্তরিক নয় বলেই দীর্ঘ ১৬ মাসেও নিখোঁজ রহস্যের কোনো ক্লু খুঁজে পায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সংলাপে অংশ নেয়া দেড় শতাধিক দর্শকদের মধ্যে কমপক্ষে ৭০ শতাংশ মনে করেন, এম ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ঘটনার প্রভাব পড়বে সিলেট অঞ্চলের রাজনীতিতে আর ১০ শতাংশ মনে করেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে এটি কোনো প্রভাব ফেলবে না।
ইলিয়াস আলীসহ গুম হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে সরকারের আন্তরিকতায় কি কোনো ঘাটতি আছে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে শাবির সহযোগী অধ্যাপক তাহমিনা ইসলাম বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার অভাব আছে বলব না, তবে সন্ধান তত্পরতা আরো জোরদার করা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে হাফিজ আহমদ মজুমদার বলেন, কারও গুম হওয়া আমরা প্রত্যাশা করি না। অনেককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, আবার অনেককে সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ১৬ মাস নয়, ১৬ বছর হয়েছে— গুম হওয়া ব্যক্তি উদ্ধার হননি এমনও অনেক ঘটনা রয়েছে। মুকতাবিস-উন-নূর বলেন, গুমের ঘটনায় যারাই জড়িত থাকুক না কেন দায়দায়িত্ব কিন্তু সরকারের। তিনি বলেন, সরকার বলছে, তারা ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের চেষ্টা করেছে। কিন্তু বাস্তবে কোনো সাফল্য নেই। একজন দর্শকের এক প্রশ্নের জবাবে সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ইলিয়াস গুমের ব্যাপারে দলীয় কোন্দলের প্রশ্নই আসে না। সরকারই তাকে গুম করেছে এবং তার সন্ধান সরকারকেই দিতে হবে।
এ সময় অনুষ্ঠানের সঞ্চালক তাত্ক্ষণিকভাবে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের হাত তুলে বিষয়টির ব্যাপারে অভিমত জানানোর আহ্বান করলে উপস্থিত ৭০ শতাংশই এ ঘটনা আগামী নির্বাচনে সরকারি দলের জন্য বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে অভিমত দেন।
যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে সুপ্রিমকোর্ট মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর এই রায় রিভিউ করার সুযোগ দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা। বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনে এই রায়ের ক্ষেত্রে রিভিউয়ের বিধান নেই। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানে প্রতিটি নাগরিকের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত কাদের মোল্লার আপিলের রায় রিভিউয়ের সুযোগ দেয়া না হলে বিচার প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং সংবিধানের মর্যাদাহানি হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে হাফিজ আহমদ মজুমদার এমপি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি কাদের মোল্লাকে আইনের শেষ সুযোগ দেয়া উচিত। সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সংবিধান অনুযায়ী কাদের মোল্লার রিভিউ করার সুযোগ রয়েছে। মুকতাবিস উন নূর একই অভিমত ব্যক্ত করে বলেন, রিভিউয়ের সুযোগ দেয়া না হলে তা হবে মানবাধিকার লঙ্ঘন।
একজন দর্শক ছাড়া বাকি সব দর্শকই বলেন, কাদের মোল্লাকে রিভিউয়ের সুযোগ দেয়া না হলে এই বিচার প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যাবে। একজন দর্শক মন্তব্য করেন, গণজাগরণ মঞ্চের চাপে সরকার আইন পরিবর্তন করায় কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় হয়েছে।
অনুষ্ঠানে আরেক অংশগ্রহণকারী প্রশ্ন রাখেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পকে ঘিরে কথিত দুর্নীতির অভিযোগে কানাডায় বাংলাদেশের সাবেক একজন প্রতিমন্ত্রীর অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়টি কি দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে কিনা—এর জবাবে হাফিজ আহমদ মজুমদার বলেন, পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতি নয়, ষড়যন্ত্র হয়েছে। ষড়যন্ত্রকে আমরা দুর্নীতি বলতে পারি না। তিনি বলেন, দুদক অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন স্বাধীন। ধীরে ধীরে এই সংস্থার উন্নতি হচ্ছে, স্বচ্ছতা আসছে। মুকতাবিস উন নূর বলেন, নামে স্বাধীন হলেও বাস্তবে দুদক স্বাধীন নয়। তারা কারো ইশারায় যেন কথা বলছে। তিনি বলেন, কানাডায় সাবেক প্রতিমন্ত্রীর অভিযুক্ত হওয়ার বিষয়টি দুদককে অবশ্যই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। একজন দর্শকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সম্প্রতি একটি সংস্থার জরিপে জানা যায়, বাংলাদেশের ৭৫ ভাগ সংসদ সদস্য দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। শুধু বর্তমান সরকার নয়, এর আগের প্রতিটি সরকারই দুদককে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করেছে। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, আগের চেয়ে দেশে এখন দুর্নীতি অনেক বেড়েছে। একজন দর্শক মন্তব্য করেন, পদ্মা সেতু নিয়ে অবশ্যই দুর্নীতি হয়েছে। যে সরকার ক্ষমতায় আসে সে সরকারের স্বার্থে কাজ করে দুদক। আসলে দুদককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া হয় না। তিনি বলেন, শুধু পদ্মা সেতু নয়, হলমার্ক কেলেঙ্কারি আর টাকার বস্তাসহ মন্ত্রী ধরা পড়ার পরও দুদক কিছুই করতে পারেনি।

শেয়ার করুন