জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে অভিযোগ বাংলাদেশ পেছন দিকে হাঁটছে

0
51
Print Friendly, PDF & Email

বৈশ্বিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপকে পশ্চাদমুখী অভিহিত করে বলেছে, এগুলো মৌলিক মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী।

সাম্প্রতিক তথ্যপ্রযুক্তি আইনের সংশোধনী এবং মানবাধিকারকর্মী ও সমালোচকদের হয়রানির প্রসঙ্গ তুলে ধরে এ সমালোচনা করা হয়। যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালের কিছু কিছু বিষয়কেও তারা উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

জেনেভায় চলমান জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ২৪তম অধিবেশনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ত্রৈবার্ষিক সর্বজনীন পরিবীক্ষণের (ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ বা ইউপিআর) ফলাফল অনুমোদনের আলোচনায় গত শুক্রবার মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরা এসব সমালোচনা করেন। গত এপ্রিলে এ ইউপিআর অনুষ্ঠিত হয়, যাতে ১৯৬টি সুপারিশ উত্থাপিত হয় এবং বাংলাদেশ সেগুলোর মধ্যে ১৬৪টি সুপারিশ বাস্তবায়নে সম্মতি দেয়।

তবে সর্বজনীন পরিবীক্ষণ পদ্ধতি বা ইউপিআর প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রশংসাও করেন ডজন খানেক দেশের রাষ্ট্রদূত। এসব দেশ অবশ্য নিজেদের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনার সম্মুখীন। দেশগুলো হচ্ছে মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মরক্কো, নাইজেরিয়া, ওমান, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, রুমানিয়া, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা এবং ফিলিস্তিন। গত এপ্রিলে ইউপিআরে অংশ নিয়ে পাশ্চাত্যের যেসব দাতা দেশ বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির সমালোচনা করেছিল, সেসব দেশের কূটনীতিকদের কাউকেই শুক্রবারের আলোচনায় অংশ নিতে দেখা যায়নি।

বৈশ্বিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, জুবিলি ক্যাম্পেইন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যাকশন কানাডা ফর পপুলেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, ইন্টারন্যাশনাল লেসবিয়ান অ্যান্ড গে অ্যাসোসিয়েশন, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব হিউম্যান রাইটস লিগস, সেভ দ্য চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল, আফ্রিকান টেকনোলজিক্যাল ডেভেলপমেন্ট লিংক এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন।

জেনেভায় জাতিসংঘ দপ্তরে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আবদুল হান্নান আলোচনায় বলেন, সাড়ে চার বছরে বাংলাদেশ যেসব অগ্রগতি অর্জন করেছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সেগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি উৎসাহজনক। বিদ্যমান সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশ পাঁচটি সুপারিশ গ্রহণ করেনি বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে সুপারিশগুলো গ্রহণ করলেও ইন্টারনেটের বিভিন্ন সাইট বন্ধ করা এবং ব্লগারদের গ্রেপ্তার অব্যাহত রয়েছে। তথ্য আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে ভিন্নমত এবং সমালোচকদের আইন প্রয়োগের মাধ্যমে হয়রানির ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

জুবিলি ক্যাম্পেইন বলেছে, তথ্য আইনে কড়াকড়ির মাধ্যমে ব্লগার ও অন্যদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ভিন্নমত দমনে বিচারব্যবস্থাকে ব্যবহার করা উচিত নয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, দায়মুক্তির অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে কোনোই অগ্রগতি নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি ঘটনারও বিচার করা হয়নি।

আফ্রিকান টেকনোলজির প্রতিনিধি বাংলাদেশে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টিকে সমর্থন করেন। জামায়াতের নেতা আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের কথা উল্লেখ করে অন্যদেরও বিচারের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।

তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধি কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড অবিলম্বে মওকুফ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ আদালতে কারও ফাঁসির হুকুম দেওয়ার এটিই প্রথম ঘটনা, যাতে আপিলের সুযোগ নেই। অ্যামনেস্টির প্রতিনিধি ব্লগারদের মতপ্রকাশের অধিকারকে খর্ব করতে নতুন প্রণীত তথ্য আইনের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এর আগে ২ সেপ্টেম্বর আরেকটি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান এশিয়ান লিগাল রিসোর্সেস সেন্টার জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে পেশ করা লিখিত বিবৃতিতে অভিযোগ করে যে, বাংলাদেশ ইউপিআর প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করছে। মানবাধিকারবিষয়ক নীতি বা সনদগুলো বাস্তবায়নে বাধ্য করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কোনো কার্যকর হাতিয়ার না থাকায় বাংলাদেশ এ প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করছে।

রাষ্ট্রদূত আবদুল হান্নান সমাপনী বক্তব্যে বলেন, তাঁর সরকার মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। যুদ্ধাপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক মান অনুসৃত হচ্ছে এবং অভিযুক্তদের মানবাধিকার রক্ষা করা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের পর জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশ ইউপিআর ফলাফল অনুমোদিত হয়।

শেয়ার করুন