জুড়ী সংরক্ষিত বনের দুই হাজার একর জমি জমি নিলেন ডিসি, চান আওয়ামী লীগ নেতা

0
52
Print Friendly, PDF & Email

সংরক্ষিত একটি বনের দুই হাজার একরের মতো জমি বর্তমান সরকারের শেষবেলায় বিধি ভেঙে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) নামে রেকর্ড করা হয়েছে। অনেক আগেই সরকারদলীয় এক নেতা তাঁর চা-বাগানের জন্য ডিসির কাছে একই জায়গায় সমপরিমাণ জমির বন্দোবস্ত চেয়েছিল।

ঘটনাটি ঘটেছে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় বন বিভাগের জুড়ী-১ রেঞ্জের আওতাধীন হাড়ারগজ সংরক্ষিত বনে। আড়াই বছর আগে এ জমি রেকর্ডের খসড়া নোটিশ পেয়েও বন বিভাগ কিছুই করেনি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, সে সময় রেঞ্জ দপ্তর তাঁদের কিছুই জানায়নি।

বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসানও মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘বিষয়টি আমি প্রথম জানলাম। খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

২০০১ সালে ভূমি রেকর্ড ও নকশাবিষয়ক নির্দেশাবলি অনুযায়ী, ১৯২৭ সালের বন আইনের (ফরেস্ট অ্যাক্ট) ২০ ধারা বলে সংরক্ষিত বন (রিজার্ভড) হিসেবে প্রকাশিত প্রজ্ঞাপনের অন্তর্ভুক্ত সব জমি বন বিভাগের নামে খতিয়ানভুক্ত হবে। বন বিভাগ প্রত্যর্পণ না করলে রিজার্ভড, প্রটেকটেড বা অ্যাকোয়ার্ড হিসেবে চিহ্নিত কোনো বনের জমি কারও নামে রেকর্ড করা যাবে না।

জুড়ী-১ রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শফি উদ্দিন বলছেন, যেসব জমি জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ড হয়েছে তা হাড়ারগজ সংরক্ষিত বনের গেজেটভুক্ত সীমানার ভেতর পড়েছে। এ জমি বন বিভাগ প্রত্যর্পণ করেনি এবং তা জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ড করা আইনসম্মত হয়নি।

ডিসির নামে যেভাবে: উপজেলা ভূমি জরিপ কার্যালয় বলছে, হাড়ারগজ সংরক্ষিত বনটি দীর্ঘদিন ধরে জরিপের বাইরে ছিল। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর ডিজিটাল পদ্ধতিতে বনটি জরিপের উদ্যোগ নিলে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দুই সদস্যের একটি নকশা প্রস্তুতকারী দল উপজেলা সেটেলমেন্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় জরিপ শুরু করে।

জরিপ শেষে গত ৪ আগস্ট হাড়ারগজ আর এফ (সংরক্ষিত বন) মৌজায় জেলা প্রশাসকের নামে দুই হাজার ১৭৪ দশমিক ৩৫ একর জমি রেকর্ড হয়।

একই মৌজায় বন বিভাগের নামে ১১ হাজার ৬৮ দশমিক ৮৯ একর জমি রেকর্ড হয়।

উপজেলার সহকারী ভূমি জরিপ কর্মকর্তা আবদুল হাই আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ২০১১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জরিপ আইনের ৩০ ধারায় এবং পরে ৩১ ধারায় বন বিভাগকে রেকর্ডের খসড়ার নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। বন বিভাগ ওই রেকর্ডের ব্যাপারে আপত্তি জানাতে এবং আপিল করতে পারত। বন বিভাগ নোটিশ দুটি গ্রহণ করা সত্ত্বেও কিছুই করেনি।

আজাদ আরও বলেন, সিলেটের আঞ্চলিক ভূমি জরিপ কার্যালয় থেকে বনের দুটি মৌজার চূড়ান্ত স্বত্বলিপি এসেছে। জরিপ আইনের ৩৩ বিধি অনুযায়ী এটি ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ নোটিশের একটি কপি বন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছেও পাঠানো হয়েছে।

তবে বর্তমান রেঞ্জ কর্মকর্তা শফি উদ্দিন বলছেন, ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট এই চূড়ান্ত নোটিশ পেয়ে তিনি হতবাক। ১৯ সেপ্টেম্বর তিনি এ বিষয়ে উপজেলা ভূমি জরিপ (সেটেলমেন্ট) কার্যালয়ে লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছেন।

বন বন্দোবস্তের আবেদন: শফি উদ্দিন অভিযোগ করেন, তাঁরা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, সংরক্ষিত বনের জমি বন্দোবস্ত নিতে প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে টাকাপয়সা খরচ করে চেষ্টা-তদবির চালাচ্ছে। এখন জমিটি জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ড হওয়ায় চক্রটি তা বন্দোবস্ত পেতে পারে। তবে তিনি এঁদের কারও নাম বলতে চাননি।

প্রথম আলোর অনুসন্ধান, চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের ভূমি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চা-চাষের জন্য হাড়ারগজ মৌজায় দুই হাজার ২০০ একর জমি বন্দোবস্ত পেতে বনের লাগোয়া সাগরনাল চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ২০০০ সালের দিকে জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদন করে। বাগানটির মালিক প্রতিষ্ঠান নিউ সাগরনাল টি কোম্পানির চেয়ারম্যান শামসুল হক ভূঁইয়া চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি।

চা-বাগানটির বর্তমান ব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন খান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক আগে বাগানের পক্ষ থেকে বন্দোবস্তের আবেদন করা হয়েছে বলে শুনেছি। এখন কী পর্যায়ে আছে জানি না।’ ভূমি কার্যালয় ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চা-সংক্রান্ত দপ্তরে (টি-সেল) খোঁজ করেও এ আবেদনের কোনো নথিপত্র পাওয়া যায়নি।

বন বিভাগের ভূমিকা: রেঞ্জ কর্মকর্তা শফি উদ্দিন বলছেন, তিনি এখানে আসার অনেক আগেই ডিসির নামে রেকর্ডের খসড়া নোটিশগুলো এসেছিল। তিনি বলেন, ‘তখনকার কর্মকর্তারা কেন চুপচাপ ছিলেন, সেটা বোধগম্য হচ্ছে না। ৩৩ ধারার নোটিশ পাওয়ার পর নথিপত্র ঘেঁটে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাইনি।’

৩০ ও ৩১ ধারার নোটিশ দুটি গ্রহণ করেছিলেন জুড়ী-১ রেঞ্জের এক সহযোগী কর্মকর্তা। নোটিশ দুটিতে তাঁর সিলসহ স্বাক্ষর দেখা যায়, তবে নামটি লেখা নেই। বন বিভাগ সূত্র বলছে, সে সময় রেঞ্জের সহযোগী কর্মকর্তা ছিলেন নাসির উদ্দিন। তিনি এখন রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে দাপ্তরিক প্রশিক্ষণে রয়েছেন। ওই সময় রেঞ্জ কর্মকর্তা ছিলেন আবদুস সাত্তার। অবৈধভাবে কাটা গাছ নিয়ে এক অভিযোগের জেরে তিনি এখন বাধ্যতামূলক ছুটিতে রয়েছেন। এ দুজনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে তাঁদের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবুল বাশার মিয়া মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, জুুড়ী-১ রেঞ্জের তৎকালীন কর্মকর্তারা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে খুবই অন্যায় করেছেন। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

শেয়ার করুন