বিচারও বটে… বুকে জড়িয়ে পিঠে ছুড়িকাঘাত!

0
213
Print Friendly, PDF & Email

ফেলানী হত্যা মামলার রায়ে অভিযুক্ত বিএসএফ হাবিলদার অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয়ার বিষয়টি শুধু ফেলানীর বাবা-মা বা তার পরিবারের কাছে নয়, গোটা বাংলাদেশের মানুষের কাছেই প্রহসন বলে বিবেচিত হচ্ছে। বৃহস্পতিবার ভারতের কুচবিহারের ১৮১ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের সদর দফতরে বিশেষ আদালত জেনারেল সিকিউরিটি কোর্ট এ রায় দেয়। হত্যাকারীর বিচারের মাধ্যমে সীমান্ত হত্যা বন্ধের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, এ রায়ে তা তিরোহিত হল। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানী ভারত থেকে বাবার সঙ্গে কুড়িগ্রামে আসার পথে অনন্তপুর সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হয় এবং কাঁটাতারের বেড়ায় দীর্ঘ ৫ ঘণ্টা তার লাশ ঝুলে থাকে। এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়, ভারতেও ব্যাপকভাবে আলোড়িত ও নিন্দিত হয়। তাই সবাই আশা করেছিল, ভারত যখন প্রথমবারের মতো এমন একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার করতে যাচ্ছে, তখন তা যথার্থই ন্যায়বিচার হবে। কিন্তু আদালত অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস দেয়ায় একে লোক দেখানো বিচার বলে মনে করছে মানুষ।
বস্তুত, এ রায়ের মাধ্যমে সীমান্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে এক অর্থে বৈধতাই দেয়া হল। কারণ বিএসএফ সদস্যরা এ ধরনের ঘটনা সংঘটনে আরও উৎসাহী হবে। এ রায়ের ব্যাপারে ভারতের মানবাধিকার সংগঠনগুলো কী ভূমিকা রাখে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। আমরা মনে করি, ফেলানী হত্যার ন্যায়বিচারের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো প্রয়োজন। শুধু ন্যায়বিচারের স্বার্থে নয়, সীমান্তে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধেও এটা প্রয়োজন। ভারত বারবার আশ্বাস দেয়া সত্ত্বেও এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এমনকি ফেলানী হত্যার বিচার চলাকালেও সীমান্ত এলাকা থেকে বাংলাদেশীদের ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আমাদের প্রশ্ন, বাংলাদেশ থেকে কেউ ভারতে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করলে তাকে সেদেশের আইন অনুযায়ী বিচার করা যেতে পারে, কিন্তু তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে কেন? এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে শোভা পায় না। আর ফেলানী কোনোভাবেই অনুপ্রবেশকারী ছিল না। সে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছিল। সে ছিল নিরস্ত্র। একজন নিরস্ত্র মানুষকে গুলি করে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সীমান্তে চোরাচালানের যেসব ঘটনা ঘটে থাকে, তার সঙ্গে দু’দেশের মানুষই জড়িত। বিএসএফের কিছু সদস্যও এ কাজে মদদ দেয় বলে অভিযোগ আছে। ভারত থেকে প্রচুর মাদকদ্রব্য বাংলাদেশে আসে। এ মাদক আমাদের যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। মাদক বহনকারী কেউ বিএসএফ কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়েছে- এমন কথা শোনা যায়নি। এসব বিষয়ের ন্যায়সঙ্গত সুরাহা হওয়া দরকার। নয়তো দু’দেশের জনগণের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস দূর হবে না। ফেলানী হত্যার ন্যায়বিচার না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিতভাবেই দু’দেশের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অভিযুক্ত ব্যক্তি বিএসএফের নিজস্ব আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি যদি সত্যিই নির্দোষ হয়ে থাকেন, তাহলে বিএসএফের অন্য কোনো সদস্য ফেলানী হত্যার জন্য দায়ী। তাকে বা তাদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব ভারত সরকারেরই। আমরা আশা করব, তারা প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করে বিচার করবে।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য। এ কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশ সব সময়ই চায় ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে। তবে ভারত এ ব্যাপারে কতটা আন্তরিক সেটিও বিবেচনার বিষয়। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে মানুষ হত্যা বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই এটিকে মৃত্যুপ্রাচীর বলে অভিহিত করছেন। গণমাধ্যমেও ভারতের দেয়া কাঁটাতারের বেড়াকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রক্ত ঝরানো বেড়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতার ৪২ বছর উদযাপন করেছে বাংলাদেশ। অথচ এখনও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিরীহ বাংলাদেশীদের লাশ পড়া বন্ধ হয়নি। ভারতের সহযোগিতায় অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ভারতের হাতেই বারবার লংঘিত হওয়ার ঘটনা ঘটছে, এটি দুর্ভাগ্যজনক। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক এখন অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো বলা হলেও ফেলানী হত্যার বিচারের রায়ের মধ্য দিয়ে তা অসার বলে প্রমাণিত হল। ভারত এ হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করলে তা সৎ প্রতিবেশীসুলভ আচরণ বলে বিবেচিত হবে।বিচারও বটে… বুকে জড়িয়ে পিঠে ছুড়িকাঘাত!

শেয়ার করুন