অবৈধ আর্থিক কার্যক্রমে ৫২ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

0
67
Print Friendly, PDF & Email

৫২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে কোনো বৈধ কোষাধ্যক্ষ ছাড়াই। দেশে বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৭১টি। এর মধ্যে মাত্র ১৯টিতে সরকার নিযুক্ত কোষাধ্যক্ষ রয়েছে। শতকরা হিসাবে ২৭ ভাগেরও কম অর্থাৎ ৭৩ ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই কোষাধ্যক্ষ নেই। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক প্রশাসন বা আর্থিক কার্যক্রম চলছে অবৈধভাবে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক প্রশাসন ‘থমকে’ থাকার কথা। শুধু তাই নয়, মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৬টিতে ভিসি আর ৫৯টিতে প্রোভিসিও নেই।
অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী ভিসি, প্রোভিসি ও কোষাধ্যক্ষ ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না। সেই বিবেচনায়, দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবল আর্থিক কার্যক্রমই নয়, সাধারণ প্রশাসনও চলছে বেআইনিভাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে অলাভজনক ও সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানরূপে চলার কথা, কিন্তু কৌশলে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওজি) বা মালিক পক্ষ সেখানে শীর্ষ প্রশাসক বা নেতৃত্ব নিয়োগ না দিয়ে অনেকটা পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের মতো চালাচ্ছেন। মালিক পক্ষের খামখেয়ালিপনার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনেকাংশেই তাদের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রোভিসি ও কোষাধ্যক্ষ রয়েছেন, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার সংশ্লিষ্টদের অনেকেই স্বাধীনভাবে কাজ পর্যন্ত করতে পারছেন না। মালিক পক্ষ সেখানে পদে পদে বাধা দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। মালিক পক্ষের কারণে সম্প্রতি দেশসেরা নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক হাফিজ জিএ সিদ্দিকীকে পদ পর্যন্ত ছাড়তে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) এ ব্যাপারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা পর্যন্ত মৌখিকভাবে নালিশ করে যাচ্ছেন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. একে আজাদ চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিওজি’র মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিওজি এ ব্যাপারে একমত হতে পারে না। যে কারণে তারা প্রস্তাব পাঠাতে পারে না। তিনি বলেন, ঘটনা যেটাই হোক না কেন, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এই তিন কর্তাব্যক্তি না থাকলে তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বলে ধরা যায় না।
ইউজিসির সদস্য (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগ) অধ্যাপক ড. আতফুল হাই শিবলি বলেন, ভিসি ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় তো চলতেই পারে না। কেননা, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তার অনুপস্থিতিতে প্রোভিসি কাজ করবেন। বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, কোষাধ্যক্ষ ছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক কর্মকাণ্ড কীভাবে পরিচালনা করে। কোষাধ্যক্ষ ও বিওজির একজন সদস্যের যৌথ স্বাক্ষরে আর্থিক কার্যক্রম হওয়ার কথা। সেখানে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ করেনি। এ অবস্থায় অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে জমি কিনেছে বলে জানাচ্ছে। কিন্তু এই আর্থিক কার্যক্রমের স্বচ্ছতা তো প্রশ্নের সম্মুখীন হবে।
ভিসি, প্রোভিসি ও কোষাধ্যক্ষবিহীন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষাবিদ-ভিসি থাকলে তারা সাধারণত শিক্ষার মানের সঙ্গে আপস করেন না। সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল, পাঠক্রম কমিটি, অর্থ কমিটি, শৃংখলা কমিটি, শিক্ষক নিয়োগ কমিটি ইত্যাদিতে ভূমিকা রাখেন। নামমাত্র কোর্স ডিজাইন সম্পন্ন করে ও কোনোরকম পড়িয়ে ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভবপর হয় না। সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক ধরনের আবহ সৃষ্টি হয়। সার্টিফিকেট বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত হওয়া একশ্রেণীর বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের স্বার্থে আইনানুগ ভিসি রাখতে চায় না। কারণ চ্যান্সেলরের নিয়োগ করা ভিসিকে চাইলেই ইচ্ছামতো মালিক পক্ষ অপসারণ করতে পারে না। ওই প্রক্রিয়ায় অযোগ্য কাউকে ভিসি পদে ইচ্ছামতো মালিকদের পক্ষে নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয়। আর শিক্ষাবিদ-কোষাধ্যক্ষ থাকলে আইনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। ফলে জনগণের অর্থ লুটপাটের আশংকা অনেক ক্ষেত্রেই তিরোহিত হয়, যদিও সবাই এ ধরনের ভূমিকা রাখতে পারেন না। আর এজন্য পারিবারিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দিচ্ছেন না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠানে বৈধ কোষাধ্যক্ষ নেই, সেগুলোর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানেই বিওজি প্রতিনিধিরা আর্থিক হিসাব পরিচালনা করে থাকেন। এটা অবৈধ বলে জানিয়েছে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুসারে দেশের প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি। তিনিই নিজের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ভাইস চ্যান্সেলর’ (ভিসি) নিয়োগ দেন ৪ বছরের জন্য। এছাড়া তিনি নিয়োগ দিয়ে থাকেন প্রোভিসি এবং কোষাধ্যক্ষ। সেই অর্থে খোদ রাষ্ট্রপতিই যেন প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছেন। কিন্তু অতি মুনাফাখোর বিওজি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি রাখতে চান না!
আইন অনুযায়ী কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ১৫ বছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা সংবলিত কমপক্ষে এমএ পাস তিনজন শিক্ষকের নাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হয়। মন্ত্রণালয় তা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠায়। ওই তিনজনের মধ্য থেকে তিনি যাকে যোগ্য মনে করেন, তাকেই চার বছরের জন্য নিয়োগ দেন। আর বিওজির সুপারিশক্রমে মনোনীত ভিসিকে অপসারণ করার ক্ষমতা একমাত্র চ্যান্সেলরেরই। প্রোভিসির ক্ষেত্রেও এই একই অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার প্রয়োজন হয়।
প্রায় একই যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষাবিদকে কোষাধ্যক্ষ পদে নিয়োগ দিতে হয়। এ সম্পর্কে আইনে বলা হয়েছে, ‘কোষাধ্যক্ষ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলের সার্বিক তত্ত্বাবধান ও আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবেন এবং তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও শৃংখলা এবং হিসাবের জন্য দায়ী থাকবেন।’ এ অবস্থায় কোষাধ্যক্ষবিহীন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়েই ঘোরতর প্রশ্ন উঠেছে।
যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নেই : শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি থেকে জানা গেছে, বর্তমানে বৈধ ভিসি নেই যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সেগুলো হল- ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, প্রাইম ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, দি মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চট্টগ্রাম, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, ফার্স্ট ক্যাপিটাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, জেডএইচ সিকদার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ইউনিভার্সিটি, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয়, চিটাগং ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়, টাইমস ইউনিভার্সিটি এবং অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। এছাড়া ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. এম আলিমুল্লাহ মিয়া ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ভিসি মিসেস কারমেন জেড লা মাগনা যথাক্রমে ১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সাল থেকে কর্মরত আছেন। যদিও দ্বিতীয়জনের আইনে বিধিনিষেধ নেই, কিন্তু প্রথমজন বিওজি সদস্য হয়েও কিভাবে ভিসি পদেও থাকতে পারেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রোভিসি আছে যেখানে : ৭১টির মধ্যে যে ১২টিতে প্রোভিসি আছেন সেগুলো হচ্ছে- দি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, গণবিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ইউনাইডেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস, অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, হামদর্দ ইউনিভার্সিটি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি।
কোষাধ্যক্ষ আছে যে ১৯টিতে : ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি চট্টগ্রাম, আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, গ্রীন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, বাংলাদেশ ইসলামী ইউনিভার্সিটি, হামদর্দ ইউনিভার্সিটি।
ইউজিসির বক্তব্য : ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. একে আজাদ চৌধুরী বলেন, ভিসি নিয়োগ না করে একশ্রেণীর মালিক পক্ষ আসলে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। তিনি বলেন, এক্ষেত্রে অবশ্য ইউজিসির করণীয় তেমন কিছু নেই। কেননা ইউজিসির আইনি সীমাবদ্ধতাও অনেক বেশি। ইউজিসি কেবল সুপারিশ করতে পারে। আর ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক আতফুল হাই শিবলি বলেন, সরাসরি অ্যাকশন নেয়ার ক্ষমতা ইউজিসির কম। তাছাড়া নিয়োগের ক্ষমতাটা সরাসরি মন্ত্রণালয়ের। এক্ষেত্রে যদি ইউজিসি কোনো অ্যাকশন নেয়, সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষ সরাসরি মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে। সেখানে গিয়ে অনেকেই ছাড় পেয়ে থাকে। তিনি বলেন, বৈধ ভিসি নিয়োগ, স্থায়ী ক্যাম্পাস, শিক্ষার মান বজায় রাখাসহ আরও কিছু বিষয়ে আইন-কানুন সঠিকভাবে মেনে চলতে ইউজিসির পক্ষ থেকে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপ দেয়া হয়ে থাকে।

শেয়ার করুন