এরশাদের খোয়াব ও গণতন্ত্রের লজ্জা

0
129
Print Friendly, PDF & Email

নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে একদা পরিত্যক্ত এবং নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিতাড়িত সাবেক স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বকবকানি তত বাড়ছে। তিনি একবার বলেন, আমি সব সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধী। আবার বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিকল্প নেই। তাঁর কোন কথাটি ঠিক? এখানে স্মরণ করা যেতে পারে, নব্বইয়ে এই এরশাদকে বিতাড়িত করেই বাংলাদেশের মানুষ প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই সময়  চুরি ও দুর্নীতির অভিযোগে এরশাদ ছিলেন জেলখানায়। এ কারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রতি তাঁর উষ্মা থাকা অস্বাভাবিক নয়।  বাংলাদেশ বড় অদ্ভুত জায়গা। নব্বইয়ে জনগণ এরশাদ নামের যেই স্বৈরশাসককে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে হটিয়েছিল, সেই এরশাদ এখন আবার রাষ্ট্রপতি পদ পাওয়ার খোয়াব দেখছেন। আর পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ এখন হত্যা, ষড়যন্ত্রসহ ডজন খানেক মামলায় অভিযুক্ত হয়ে ইসলামাবাদে অন্তরীণ জীবন যাপন করছেন। আমাদের দুই মহান গণতান্ত্রিক নেত্রীর একজন স্বৈরাচারীর ব্যাপারে এবং আরেকজন যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে অন্ধ। গণতান্ত্রিক দলগুলোর দুর্বলতার সুযোগেই এখন সাবেক সামরিক স্বৈরাচার রাজনীতির মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আর নয় বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আত্মাহুতি দেওয়া নূর হোসেন, সেলিম, দেলোয়ার, তাজুল, বসুনিয়া, দিপালী সাহাসহ শত শত শহীদের আত্মা আর্তনাদ করছে। কী জবাব দেবেন নেতা-নেত্রীরা?

এরশাদ আরেকবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এমনকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ারও বাসনা প্রকাশ করেছেন তিনি। এ জন্য এরশাদ দুই দলের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখছেন। গতকাল প্রথম আলোতে শিশির ভট্টাচার্য্যের একটি কার্টুন ছাপা হয়েছে, যাতে দেখা যায়, তিনি বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন আর গোলাপ ফুল বাড়িয়ে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। এই দুঃসাহস তিনি কোথায় পেলেন? জোট-মহাজোটের ব্যাপারে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে এখন ত্রিমুখী ধারা। প্রথম ধারা চায়, মহাজোটের সঙ্গে থাকাটাই সমীচীন। কেননা খালেদা জিয়ার সঙ্গে গেলে আবারও এরশাদকে লাল দালানের ভাত খেতে হবে। দ্বিতীয় ধারা মনে করে, আগামী নির্বাচনে যেহেতু বিএনপির জয়ের সম্ভাবনা আছে, সেহেতু তার সঙ্গে জোট বাঁধলে বেশি সুবিধা আদায় করা যাবে। তৃতীয় ধারার মতে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে ইসলামি দলগুলোকে নিয়ে তৃতীয় শক্তি গড়ে তোলাই হবে উত্তম কাজ।

এরশাদ সব দরজাই খোলা রাখছেন। এ কারণে সকালে তিনি নসিহত করেন, আমরা মহাজোটে নেই। মহাজোটে থেকে সরকারের অপকর্মের ভাগীদার হবে না জাতীয় পার্টি। আবার সরকারের ধমক খেয়ে বিকেলেই সেই কথা ফিরিয়ে নিয়ে এরশাদ বলেন, মহাজোটের সঙ্গে আছি, থাকব। এরশাদ যতই বলেন, মহাজোটে গিয়ে কিছু পাননি। আসলে অনেক কিছু পেয়েছেন। ব্যাংক পেয়েছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য পেয়েছেন। মন্ত্রী-সাংসদ পেয়েছেন। নয় বছর অনেক দুষ্কর্ম করেও জেলখানার বাইরে আছেন। এটাই বা কম কিসে? মনে হচ্ছে, নির্বাচন পর্যন্ত এরশাদ জোট করা না-করা নিয়ে দুই প্রধান দলের সঙ্গেই দর-কষাকষি করতে থাকবেন। যেই দল বেশি সুবিধা দেবে, সেই দলের সঙ্গে জোট বাঁধবেন। এটি তেমন গুরুতর খবর নয়। গুরুতর খবর হলো, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বিতাড়িত ও জনমানুষের কাছে ধিক্কৃত এরশাদের আবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হতে চাওয়া। এরশাদ নাকি তাঁর দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে খোলাখুলি বলেছেন, এক দিনের জন্য হলেও তিনি রাষ্ট্রপতি পদে বসতে চান। পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে, ১৯৯৬ সালে যখন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ব্যর্থ হয় এবং বিএনপির আসনসংখ্যা ১১৩ তে দাঁড়ায়, তখন এরশাদই হন তুরুপের তাস। খালেদা জিয়ার এই বার্তা নিয়ে তাঁর কাছে রওশন এরশাদ জেলখানায় যান যে বিএনপিকে সমর্থন দিলে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করা হবে। দলের পাঁচজনকে মন্ত্রী করা হবে। কিন্তু তখন এরশাদের মনে পাঁচ বছর জেল খাটার কাঁচ ঘা। দ্বিতীয় কথা, এরশাদ সমর্থন দিলেও বিএনপি সরকার গঠন করতে পারবে, সেই নিশ্চয়তা ছিল না। এই অবস্থায় এরশাদ হাসিনার দিকেই ঝুঁকে পড়েন। অবশ্য তাঁর সেই সিদ্ধান্তও বেশি দিন টেকসই হয়নি। প্রথমে এরশাদকে নিয়েই গঠিত হয়েছিল চারদলীয় জোট।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখেও (বিএনপির একগুঁয়েমির জন্য যে নির্বাচনটি হতে পারেনি এবং দেশে এক-এগারোর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে) এরশাদের মনে আরেকবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনা জাগ্রত হয়। জাতীয় পার্টির দাবি, সেই সময় আওয়ামী লীগ ছয় মাসের জন্য তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে বসাতে রাজি হয়েছিল। কেননা আওয়ামী লীগ রাজি না হলে বিএনপি আরও বেশি সুবিধা দিয়ে তাদের জোটে নিয়ে যেত। পাঠক, আবারও স্মরণ করুন, সেই সময় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের এরশাদের বাসায় আতিথ্য গ্রহণের দৃশ্যটি। শেষ পর্যন্ত ২২ জানুয়ারি নির্বাচন না হওয়ায় শেখ হাসিনা এরশাদকে রাষ্ট্রপতি করার দায় থেকে রেহাই পান। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো, সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এত বেশি আসন পেল যে এরশাদ রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে আর দর-কষাকষি করতে পারেননি। তাই এবার এরশাদ নির্বাচনের আগেই লিখিত চুক্তি করে নিতে চাইছেন। জাতীয় পার্টির নেতারা বলছেন, যাঁরা তাঁদের জন্য ৭০টি আসন এবং এরশাদের জন্য রাষ্ট্রপতির পদটি ছেড়ে দেবেন, তাঁদের সঙ্গেই জোট বাঁধবেন তাঁরা। রাজনীতি-বিশেষজ্ঞদের কাছে, এরশাদের রাষ্ট্রপতি হওয়া একটি দিবাস্বপ্ন। মাস কয়েক আগে মোহাম্মদ আবদুল হামিদ পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। অতএব আগামী নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ জয়ী হলে রাষ্ট্রপতি পদে রদবদলের সম্ভাবনা নেই। আর যদি বিএনপি জয়ী হয়, তাহলেও বর্তমান রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাগবে। আগামী নির্বাচনে যেই দলই জয়ী হোক না কেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না বলেই আমরা  ধারণা করি। এবার ২০০১ ও ২০০৮-এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে না, বরং ১৯৯৬-এর পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা বেশি। সে ক্ষেত্রে এরশাদের আবার রাষ্ট্রপতি হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। কিন্তু তিনি যে রাষ্ট্রপতি হওয়ার খোয়াব দেখছেন, সেটিও জাতির জন্য কম লজ্জার নয়।

নির্বাচন সামনে রেখে দুই দলই এরশাদকে নিয়ে কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলছে। এই খেলা যত দিন বন্ধ না হবে, তত দিন দেশে সত্যিকার গণতন্ত্র আসবে না। যত দিন স্বৈরাচারী শাসকের দল ক্ষমতার নিয়ামক শক্তি হবে, তত দিন নূর হোসেনদের আত্মা আমাদের ক্ষমা করবে না।

শেয়ার করুন