বিধি মানে না অধিকাংশ পোশাক কারখানা

0
107
Print Friendly, PDF & Email

পোশাকশিল্প নিয়ে মন্ত্রিসভা কমিটির প্রতিবেদনদেশের পোশাক কারখানাগুলোর ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা জানাল সরকার গঠিত বিশেষ মন্ত্রিসভা কমিটি। কমিটির পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের অধিকাংশ কারখানা ভবনই বিধি মেনে নির্মাণ করা নেই, বিধি মানা হলো কি না, তা দেখারও কেউ নেই এবং বৈদ্যুতিক লাইন পরীক্ষা করা নেই।সরকারের এই প্রতিবেদনে ‘নেই’-এর তালিকাটি আরও দীর্ঘ। যেমন: অধিকাংশ কারখানায় আগুন লাগলে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা নেই, বহির্গমন সিঁড়ি নেই, ভবনের পাশে পাকা জলাধার নেই, শ্রমিকদের জন্য নিয়োগপত্র নেই, তাঁদের ছুটি নেই, কারখানায় পার্টিসিপেশন কমিটি নেই, শ্রমিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই, বিশ্রামাগার নেই, ফ্লোরে চলাচলের অবস্থা নেই, কারখানায় বর্জ্য বিশোধনাগার নেই, সমস্যা হলে অভিযোগ করার জায়গা নেই।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, শ্রমিকদের মজুরি কম, শিল্প পুলিশের আচরণ শ্রমবান্ধব নয়, বরং তারা মালিকের স্বার্থরক্ষায় কাজ করে। সাভারে রানা প্লাজা ধস এবং যুক্তরাষ্ট্র অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য-সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করার পর বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে সভাপতি করে গত ৬ মে ‘তৈরি পোশাক শিল্পবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি’ নামে একটি কমিটি গঠন করে সরকার। কমিটির নির্দেশে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ঢাকার আশপাশের ২২৭টি তৈরি পোশাক কারখানা সরেজমিন পরিদর্শন করে ৪৬০ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। প্রতিবেদন তৈরি করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের একজন করে যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্য করে ১১টি দল কাজ করেছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তর, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, রাজউক এবং শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা ছিলেন দলগুলোর সদস্য।

বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবেদনটি তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জমা দিয়েছেন। এই প্রতিবেদনের যেকোনো বিষয় প্রকাশের দায়িত্ব মন্ত্রিসভার এবং মন্ত্রিসভা যথাসময়েই তা করবে। প্রতিবেদনে উঠে আসা অনেক ‘নেই’-এর কথা জানানো হলে পাটমন্ত্রী বলেন, সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

পোশাকমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মো. আতিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সমস্যা চিহ্নিত করাকে আমরা ইতিবাচকভাবেই দেখছি। এখন এগুলোকে দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া যাবে।’ বিজিএমইএর সভাপতি আরও বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যত পরিদর্শন হবে, ততই তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য ভালো হবে। তবে এটাও ঠিক, রাতারাতি কিছু বদলানো যাবে না।’

দীর্ঘ একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হলেও ঠিত কোন কোন কারখানায় কী ধরনের সমস্যা, তা সুনির্দিষ্ট করা নেই। কেবল বলা হয়েছে অধিকাংশ কারখানার কথা। এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, তৈরি পোশাক খাতের নানা সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার জন্যই উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এই কমিটি গঠিত হয়। এতে সুনির্দিষ্ট কিছু উঠে না এলে প্রতিবেদনের মান ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

প্রতিবেদনমতে, প্রায় সব কারখানায় শ্রমিকদের জন্য নিয়োগপত্র রয়েছে। কিন্তু এ নিয়োগপত্র শ্রমিকদের হাতে না দিয়ে রাখা হয় ফাইলে। নিবন্ধন ও হাজিরা বই সংরক্ষণ করা হয় না। শিশু শ্রমিক রয়েছে অনেক কারখানায়। কারখানাগুলো বিমা কর্মসূচির আওতায় নেই।

অধিকাংশ কারখানায় পার্টিসিপেশন কমিটি বিধিসম্মতভাবে গঠিত হয়নি। শ্রমিকেরা এর কার্যক্রম সম্পর্কে জানেনই না। বেশির ভাগ কারখানায় শ্রমিকদের কাজের অনুমোদিত সময়সূচি নেই। কারখানাগুলোর ভেতরের অবস্থা এমন ঘিঞ্জি যে এগুলোতে আলো-বাতাস ঢোকার উপায় নেই। কারখানাগুলোতে ছুটির বিধান পালিত হয় না। মজুরি অনিয়মিত ও দেরিতে পরিশোধ করা হয়।

কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিদর্শন করা কারখানাগুলোর বেশির ভাগেরই নকশা রাজউক বা পৌরসভা কর্তৃক অনুমোদিত নয়। আবার যেগুলোর নকশা অনুমোদিত, সেগুলোতে যথাযথভাবে যন্ত্রপাতি স্থাপিত হয়নি। যত যন্ত্রপাতি স্থাপন করা যায়, প্রকৃতপক্ষে স্থাপন করা হয়েছে তার চেয়েও বেশি। বেশির ভাগ কারখানায় মৃত্তিকা পরীক্ষা প্রতিবেদন (সয়েল টেস্ট) নেই; যা-ও আছে, সেগুলোর প্রতিবেদনের গুণগত মান দুর্বল। নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মিত হলো কি না, তা দেখার কেউ নেই। মালিকেরা নিজের মতো করে অপ্রয়োজনীয় নির্মাণকাজ করেন। অনেক কারখানায় সম্প্রসারিত ভবন নেই। কারখানার ভেতরে চলাচলের পথও অনেক সরু।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বেশির ভাগ কারখানায় ফায়ার ফাইটিং পাম্প নেই। তা না থাকলে ৪৫ হাজার লিটার পানি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন জলাধার (ট্যাংক) থাকার নিয়ম রয়েছে। কেউই তা অনুসরণ করে না। অনেক কারখানার ফায়ার লাইসেন্স নেই, কোনো কোনো কারখানার লাইসেন্স হালনাগাদ নেই।

বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুযায়ী কারখানাগুলোতে বহির্গমন সিঁড়ি নেই। যা আছে তা আবার শুধু ভেতর থেকে বাইরের দিকে খোলে এবং আগুন লাগলে বাইরের বাতাস ভেতরে ঢুকে ভেতরের আগুন ভেতরেই রাখে।

অধিকাংশ কারখানায় অনুমোদিত বিদ্যুৎ লোড থাকলেও ব্যবহূত বিদ্যুৎ লোডের তথ্য খুঁজে পায়নি কোনো তদন্ত দল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত দলকে শুধু বিল পরিশোধের কপি দেখানো হয়েছে। এতে তদন্ত দল কিছুই ধারণা করতে পারেনি।

বেশির ভাগ কারখানায় বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং নকশা নেই, ওয়্যারিং নিরাপদভাবে করা হয়নি, এমনকি মেইন সুইচ কারখানার ভেতরে, যা বিধিবহির্ভূত। বৈদ্যুতিক লাইন নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা হয় না। এ ছাড়া বেশির ভাগ কারখানায় গুদামঘরের (গোডাউন) সঙ্গে বিদ্যুৎ-সংযোগ, যা ঝুঁকিপূর্ণ। অধিকাংশ কারখানাতেই ভবনের ছাদে বজ্রনিরোধক দণ্ড নেই। কারখানাগুলোতে বৈদ্যুতিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো লোক নিয়োগ করা নেই।

সমস্যা সমাধানে কিছু সুপারিশও রয়েছে প্রতিবেদনে। এর মধ্যে অন্যতম সুপারিশ শিল্পপার্ক তৈরি। এতে আরও বলা হয়েছে, কারিগরি জ্ঞানবিহীন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ভবনের নকশা অনুমোদনের বর্তমান ব্যবস্থা বাতিল করা জরুরি। আবাসিক ভবনে কারখানা এবং মৃত্তিকা পরীক্ষা প্রতিবেদন ছাড়া কারখানা করতে দেওয়া যাবে না। গুদামঘরে বৈদ্যুতিক সংযোগ না থাকার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া কারখানার বার্ষিক মুনাফায় শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে বলে সুপারিশ করা হয়েছে।

শেয়ার করুন